বরিশালে স্টেডিয়ামের নতুন রূপ, ক্রিকেটে পরিবর্তন দেখার অপেক্ষা
বরিশালে কবি জীবনানন্দ দাশ স্টেডিয়ামের আধুনিকায়নে ব্যয় হয়েছে ৬৫ কোটি টাকা। পাঁচ বছর ধরে চলা সংস্কারকাজে স্টেডিয়ামটি নতুন রূপ পেয়েছে। এবার সেখানে বড় পরিসরে ক্রিকেট আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। এর মাধ্যমে এ অঞ্চলের ক্রিকেটে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখার অপেক্ষায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
আগামী ১৫ ডিসেম্বর নগরের বান্দরোডের কীর্তনখোলা নদীর তীরে কবি জীবনানন্দ দাশ স্টেডিয়ামে শুরু হবে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) নতুন প্রতিযোগিতা ‘ডোমেস্টিক থ্রি বা ডি-থ্রি’র টি–টুয়েন্টি টুর্নামেন্ট।
ক্রিকেটার ও ক্রীড়া সংগঠকদের ভাষ্য, শুধু বড় ম্যাচ আয়োজন কিংবা আধুনিক অবকাঠামো দিয়ে বরিশালের ক্রিকেটের সংকট কাটবে না। এ জন্য প্রয়োজন নিয়মিত টুর্নামেন্ট আয়োজন, উপযুক্ত প্রশিক্ষণের সুযোগ, মাঠে অনুশীলন, স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় খেলোয়াড় নির্বাচন ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
নতুন চেয়ার, সংস্কার করা প্যাভিলিয়ন, মিডিয়া ভবন স্থাপন, হোস্টেল ও ফ্লাডলাইটে বদলে গেছে স্টেডিয়ামের চেহারা। তবে মাঠের এই পরিবর্তনে স্থানীয় ক্রিকেটে কী প্রভাব পড়ে, সেটাই এখন দেখতে চান খেলোয়াড় ও সংগঠকেরা।
বরিশাল বিভাগীয় ক্রিকেট দলের সাবেক ক্রিকেটার ও বর্তমানে স্থানীয় একটি ক্রিকেট একাডেমির কোচ এজাজ আল মাহমুদ প্রথম আলোকে বলেন, স্টেডিয়ামের চাকচিক্য আর জৌলুশ বাড়ালেই হবে না, স্থানীয় খেলোয়াড়দের সুযোগ তৈরি করতে হবে। প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় বিভাগ ক্রিকেট টুর্নামেন্ট নিয়মিত আয়োজন করতে হবে। তা না হলে ভালো খেলোয়াড় তৈরি হবে না।
স্টেডিয়ামের চাকচিক্য আর জৌলুশ বাড়ালেই হবে না, স্থানীয় খেলোয়াড়দের সুযোগ তৈরি করতে হবে।এজাজ আল মাহমুদ, সাবেক ক্রিকেটার, বরিশাল বিভাগীয় ক্রিকেট দল
১৯৬৬ সালে ২৯ দশমিক ১৫ একর জমিতে বরিশাল স্টেডিয়াম নামে এটি স্থাপিত হয়। ২০০৬ সালে স্টেডিয়ামটি সংস্কারের পর ২০০৮ সালে আবদুর রব সেরনিয়াবাত নামকরণ করা হয়। আর ২০২৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি নাম বদলে হয়েছে কবি জীবনানন্দ দাশ স্টেডিয়াম।
লক্ষ্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়ানো
বিসিবির সূচি অনুযায়ী, ১৫ ডিসেম্বর টি-টুয়েন্টি সংস্করণের মধ্য দিয়ে শুরু হবে ডি-থ্রি টুর্নামেন্ট। উদ্বোধনী পর্বের ম্যাচগুলো হবে বরিশালের কবি জীবনানন্দ দাশ স্টেডিয়াম ও ঢাকার মিরপুরে শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে।
ছয়টি করপোরেট প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতায় ছয়টি দল এই টুর্নামেন্টে অংশ নেবে। টুর্নামেন্টটির লক্ষ্য ঘরোয়া ক্রিকেটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়ানো এবং ক্রিকেটারদের তিন সংস্করণেই খেলার সুযোগ তৈরি করা। ছয়টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দল পরিচালনার চুক্তি করেছে বিসিবি। দলগুলো হলো ব্লুস্টার, ওয়ালটন গ্রুপ, সিটিজেনস ব্যাংক, একমি গ্রুপ, সেভেন রিংস সিমেন্ট ও ফরচুন গ্রুপ। প্রতিটি দল একজন করে আইকন ক্রিকেটার বেছে নিয়েছে। ওয়ালটনের আইকন মেহেদী হাসান মিরাজ, ফরচুন গ্রুপের তাওহিদ হৃদয়, একমি গ্রুপের মোসাদ্দেক হোসেন, সেভেন রিংস সিমেন্টের মুশফিকুর রহিম, ব্লুস্টারের নুরুল হাসান এবং সিটিজেনস ব্যাংকের মোহাম্মদ নাঈম শেখ।
বিসিবির পরিচালক ও বরিশাল বিভাগের খেলোয়াড় নির্বাচনের সমন্বয়কারী মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ছয়টি দলের এই আসরে বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন এলাকার ক্রিকেটারদের যুক্ত করার চেষ্টা চলছে। দীর্ঘদিন খেলোয়াড় তৈরি না হওয়া এবং মাঠের সংকটের কারণে বিভাগীয় দলের কাছ থেকে ভালো ফল আশা করা কঠিন। তবে বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের (বিকেএসপি) সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে খেলোয়াড়দের অনুশীলনের সুযোগ বাড়াতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করারও চেষ্টা চলছে।
আন্তর্জাতিক ভেন্যু হওয়ার সম্ভাবনা
আধুনিক স্টেডিয়ামটি বরিশালে বড় ক্রিকেট আয়োজনের সম্ভাবনা বাড়িয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক ম্যাচের ভেন্যু হিসেবে গড়ে তুলতে আরও কিছু অবকাঠামোগত সুবিধা প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। উন্নত আবাসন, নিয়মিত উড়োজাহাজ চলাচল এবং বড় টুর্নামেন্ট আয়োজনের উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে ক্রিকেটের ভিত্তিও শক্তিশালী করা দরকার।
বরিশাল বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার সদস্যসচিব আনোয়ারুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ঘরোয়া ক্রিকেট লিগ চালুর চেষ্টা চলছে। মাঠের সংকট কাটাতে স্টেডিয়ামটির ভেতরে থাকা একটি পরিত্যক্ত সুইমিংপুল সরিয়ে সেখানে আলাদা খেলার মাঠ তৈরির বিষয়েও আলোচনা হচ্ছে।
স্টেডিয়ামটির সংস্কারকাজ শুরু হয়েছিল ২০২১ সালে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা শেষ হয়নি। প্রথম দফায় কাজের মেয়াদ বাড়িয়ে করা হয় ২০২৬ সালের জুন মাস পর্যন্ত। কিন্তু নানা জটিলতার কারণে সেই সময়ও কাজ শেষ হয়নি। এখনো বাকি আছে ৫ শতাংশ কাজ।
সংস্কারকাজ এখনো ৫ শতাংশ বাকি
স্টেডিয়ামটির সংস্কারকাজ শুরু হয়েছিল ২০২১ সালে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা শেষ হয়নি। প্রথম দফায় কাজের মেয়াদ বাড়িয়ে করা হয় ২০২৬ সালের জুন মাস পর্যন্ত। কিন্তু নানা জটিলতার কারণে সেই সময়ও কাজ শেষ হয়নি। এখনো বাকি আছে ৫ শতাংশ কাজ। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এম এস কোহিনুর এন্টারপ্রাইজের সহকারী প্রকৌশলী মো. রায়হান গাজী বলেন, প্রায় ৯৫ শতাংশ সংস্কারকাজ শেষ হয়েছে। যতটুকু কাজ বাকি আছে, তা ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে শেষ হবে বলে আশা করছেন।
গত ৩০ অক্টোবর কবি জীবনানন্দ দাশ স্টেডিয়াম ঘুরে দেখা যায়, গ্যালারিতে নতুন চেয়ার বসানো হয়েছে। সংস্কার করা হয়েছে প্যাভিলিয়ন ও মিডিয়া ভবন। নির্মাণ করা হয়েছে তিনতলা হোস্টেল। ফ্লাডলাইটও সচল রয়েছে।
বরিশাল বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থা সূত্র জানায়, নতুন চেয়ার বসানোর পর স্টেডিয়ামে দর্শক ধারণক্ষমতা হয়েছে ১৯ হাজার। আগে অবশ্য কোনো চেয়ার ছিল না, শুধু গ্যালারি ছিল। তখন ধারণক্ষমতা ছিল ৩৫ হাজার।
নতুন প্রতিভা উঠে আসার পথ সীমিত
স্টেডিয়াম সংস্কারকাজ শেষ হতে দীর্ঘ সময় লাগায় অসন্তোষ আছে ক্রীড়া সংগঠকদের মধ্যে। এত অর্থ ব্যয়ে আধুনিক স্টেডিয়াম তৈরি হলেও এর সঙ্গে স্থানীয় ক্রিকেটের নিয়মিত চর্চার সুযোগ কতটা তৈরি হচ্ছে, এ নিয়ে প্রশ্নও তুলেছেন কেউ কেউ।
বরিশাল ফরমার ক্রিকেটার্স ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মীর হাসান মোরশেদ বলেন, অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি খেলোয়াড় বাছাই ও দল পরিচালনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে নতুন প্রতিভা উঠে আসার পথ তৈরি হবে না। খেলোয়াড় নির্বাচনের পাশাপাশি কোচ ও ম্যানেজার নিয়োগের ক্ষেত্রেও বিসিবির গঠনতন্ত্র যথাযথভাবে অনুসরণ করা জরুরি।
স্থানীয় ক্রিকেটারদের বেশি সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি দলের সুযোগ-সুবিধাও বাড়াতে হবে মনে করেন জেলা ক্রিকেট দলের সাবেক খেলোয়াড় জহিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, বরিশালে নিয়মিত ক্রিকেট চর্চার জন্য আলাদা মাঠ নেই। মূল স্টেডিয়াম ক্রিকেট বোর্ডের অধীনে থাকায় সেখানে ঘরোয়া লিগ আয়োজনের সুযোগও সীমিত।
স্থানীয় ক্রীড়া সংগঠকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমানে যে স্টেডিয়াম আধুনিকায়ন করা হয়েছে, তাতে স্থানীয় সীমিত কিছু খেলোয়াড় খেলার সুযোগ পাবেন। সবচেয়ে বড় ব্যাপার, একই মাঠে ক্রিকেট ও ফুটবল দুটি খেলাই হবে। সম্প্রতি বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার নতুন কমিটি এসে একটি ক্রিকেট টুর্নামেন্ট ভালোভাবে শেষ করেছে। এর ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে হবে। কিন্তু এর আগে এক যুগেও বরিশাল বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার আয়োজনে ফুটবল কিংবা ক্রিকেট লিগ হয়নি।
বরিশাল জেলা ক্রিকেট দলের খেলোয়াড় মাইনুল ইসলাম অভিযোগ করেন, প্রায় ১০ বছর ধরে এ অঞ্চলে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নতুন ক্রিকেটার তৈরি হয়নি। খেলোয়াড় নির্বাচনে পক্ষপাতের কারণে যোগ্য খেলোয়াড়েরা সুযোগ হারাচ্ছেন।
পক্ষপাতের অভিযোগের বিষয়ে আনোয়ারুল হক প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা নতুন কমিটি দায়িত্ব পেয়েছেন। আগে যা হয়েছে, তা এখন পুনরাবৃত্তির সুযোগ নেই। সামনে যা হবে, স্বচ্ছতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে হবে। ক্রীড়াঙ্গনে শৃঙ্খলা ও বিকাশের লক্ষ্যে তাঁরা কাজ করছেন।