ভোটের বার্তায় দিন শুরু, আছে সংশয়ও

চট্টগ্রাম–১৫ (সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া) আসনে নির্বাচন ঘিরে গ্রাম থেকে হাটবাজার—সবখানেই আলোচনার কেন্দ্র নির্বাচন। বিএনপির ধানের শীষের নাজমুল মোস্তফা আমিন ও জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লার শাহজাহান চৌধুরীর মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে মনে করছেন ভোটাররা। মাঠে আছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাতপাখার শরীফুল আলম চৌধুরীও। ভোট নিয়ে আগ্রহের পাশাপাশি ভোটের দিন নিরাপত্তা ও পরিবেশ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে সংশয় আছে।

নিজের দোকানে নাশতা তৈরি করতে করতে ভোটের আলাপ শোনেন হোটেল মালিক মোস্তাক আহমদ। অনেকেই নির্বাচন নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করলেও তাঁর মতে ভোট ঠিক সময়েই হবে। গতকাল সকালে চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার আমিরাবাদ মাস্টারহাট গ্রামেছবি: প্রথম আলো

মাঘ মাস বিদায় নিতে চলেছে। সকালের কুয়াশা ভেদ করে সূর্যের আলো ফুটতেই কর্মব্যস্ততা শুরু হয়েছে। সকাল গড়িয়ে যেতেই গ্রামের অলিগলি ও হাটবাজারে ছোট ছোট প্রচারের মিছিল। চায়ের দোকানে ভোটের আলাপ। চট্টগ্রাম–১৫ (সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া) আসনের অন্তর্গত গ্রামীণ জনপদগুলোয় এখন ভোটের বার্তা নিয়েই দিন শুরু হয়।

সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া উপজেলা মিলিয়ে এই আসনে এবার সংসদ সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিএনপি মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী নাজমুল মোস্তফা আমিন, জামায়াতে ইসলামী মনোনীত দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী শাহজাহান চৌধুরী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী শরীফুল আলম চৌধুরী। তিন প্রার্থী মাঠে থাকলেও ভোটাররা মনে করছেন, মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীর মধ্যে।

গতকাল শনিবার সকাল ৯টার দিকে লোহাগাড়া উপজেলার আমিরাবাদ ইউনিয়নের মাস্টারহাট এলাকায় একটি বড় চায়ের দোকানে ঢুকতেই ভোটের আলাপ কানে আসে। গরম দুধ–চা, পরোটা ও শিঙাড়া খেতে খেতে কোন টেবিলে কী আলোচনা চলছিল, তা স্পষ্টভাবে বোঝা যায় না। ভেসে বেড়ানো নানা শব্দই বলে দেয়, নির্বাচনই প্রধান আলোচনার বিষয়।

একটি টেবিল ঘিরে বসা সাত–আট স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে আলাপ হয় ভোট নিয়ে। তাঁরা সবাই ভোটার। কে কাকে ভোট দেবেন, এর মধ্যেই তা ঠিক করে ফেলেছেন। আলাপ চলছিল কার পছন্দের প্রার্থী এগিয়ে, তা নিয়ে। এ নিয়ে তর্কও চলছিল।
দোকানটির মালিক মোস্তাক আহমদ (৫৫)। তেলের কড়াইয়ে পরোটা ভাজতে ভাজতে খদ্দেরদের ভোটের আলোচনা নীরবে উপভোগ করছিলেন তিনি। ভোট নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সবশেষ ২০০৮ সালে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়েছিলাম। পরের তিনটি নির্বাচনে ভোট দিতে পারিনি। এবার ভোট দেব। ভোটের আমেজও আছে। পছন্দের প্রার্থীও আছেন।’

জমির আগাছা পরিষ্কার করছিলেন শামসুন্নাহার বেগম(৫০)। ভোটের দিন পরিবেশ শান্তিপূর্ণ থাকলে তিনি ভোট দিতে যাবেন
ছবি: প্রথম আলো

মোস্তাক আহমদ আরও বলেন, ‘অনেক কাস্টমার এখনো নির্বাচন হবে কি না, সেটা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন। তবে অনেকে অনেক কথা বললেও আমি মনে করি, নির্বাচন ঘোষিত তারিখেই হবে।’

ভোট নিয়ে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে সংশয়ও রয়েছে। ভোটারদের কথায়ও তা স্পষ্ট হয়। মাস্টারহাট থেকে দুই কিলোমিটার পশ্চিমে গেলেই মঙ্গলনগর বণিকপাড়া এলাকা। সড়কের পাশে রোদে খড় শুকাচ্ছিলেন টুম্পা ধর (৩৮) নামের এক গৃহিণী। ভোট নিয়ে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। তাঁর আশঙ্কা ভোটের দিনের পরিবেশ নিয়ে। তিনি বলেন, ‘ভোটকেন্দ্রে গন্ডগোল হওয়ার আশঙ্কা আছে। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা দেবে বলেছে। কেন্দ্রে ঝামেলা না হলে ভোট দিতে যাব।’

মঙ্গলনগর থেকে আরও এক কিলোমিটার উত্তরে গেলেই সাতকানিয়া–লোহাগাড়া সীমান্তবর্তী টঙ্কাবতীর মুখ এলাকা। হাঁটুসমান পানিতে হেঁটে নদী পার হচ্ছিলেন স্থানীয় পল্লিচিকিৎসক অজিত নন্দী (৪৯)। হতাশার সুরে তিনি বলেন, ‘দেশে আমরা নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে আছি। উন্নয়ন হোক আর না হোক, আমরা শান্তি চাই। নিরাপত্তা চাই। আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্ষম, এমন প্রার্থীকেই আমরা ভোট দেব।’
চট্টগ্রাম–১৫ আসনে জামায়াতের বর্তমান প্রার্থী শাহজাহান চৌধুরী ১৯৯১ ও ২০০১ সালে দুই দফা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। অন্যদিকে স্বাধীনতার পর বিএনপি প্রার্থী হিসেবে প্রয়াত মোস্তাক আহামদ চৌধুরী এবং সবশেষ ১৯৯৬ সালে কর্নেল (অব.) অলি আহমদ (বীরবিক্রম) এই আসনে জয়লাভ করেন। ২০০৮ সালে বিএনপি–জামায়াত জোটের প্রার্থী হিসেবে জামায়াতের নায়েবে আমির শামসুল ইসলাম জয়ী হন। ফলে ঐতিহাসিকভাবেই আসনটি বিএনপি ও জামায়াতের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত।

২৫ বছর পর এ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী পেয়ে উজ্জীবিত বিএনপির নেতা–কর্মীরা। অপর দিকে জামায়াতের প্রার্থী শাহজাহান চৌধুরী এ আসনের অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ। স্থানীয় লোকজন মনে করছেন, এবার হেভিওয়েট এই দুই প্রার্থীর হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সংখ্যালঘু ও আওয়ামী লীগের ভোট ব্যবধান গড়ে দিতে পারে। তরুণ ভোটাররাও প্রভাবক হয়ে উঠছেন। এ ছাড়া মূল প্রতিদ্বন্দ্বী দুই প্রার্থীর বাড়ি দুই উপজেলায়। সে ক্ষেত্রে আঞ্চলিকতার প্রভাবও পড়তে পারে।

আমিরাবাদ স্টেশনের তরুণ ব্যবসায়ী আবদুল্লাহ শরীফ (৩০)। ভোট নিয়ে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভোটার হয়েছি ১১ বছর আগে। তবে এখনো ভোট দিতে পারিনি। সবকিছু ঠিক থাকলে জীবনের প্রথম ভোট দেব যে প্রার্থীর চিন্তাভাবনা তরুণদের সঙ্গে মিল রয়েছে। যিনি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবেন।’

উত্তর আমিরাবাদে খেতের আগাছা পরিষ্কার করছিলেন শামসুন্নাহার বেগম (৫০)। তিনি বলেন, ‘২০১৪ সালে ভোট দিতে যাইনি। ২০১৮ সালে মারামারি হয়েছিল। ভোট দিতে গিয়ে ফিরে এসেছি। ২০২৪ সালে আর যাইনি। ভোট দিলেও আমাদের কোনো পরিবর্তন হয় না। রাস্তাঘাটের অবস্থাও খারাপ। আমাদের দুর্ভোগ রয়ে যায়। তবু পরিবর্তনের আশায় ভোট দেব।’

নির্মাণ শ্রমিক আবদুল মান্নানের প্রত্যাশা নির্বাচিত সরকার নিম্ন আয়ের মানুষদের কথা ভাববে। তাদের জীবনমানের উন্নতি করবে। গতকাল সকালে আমিরাবাদ ইউনিয়নের বাঁশখালিয়া পাড়া এলাকায়
ছবি: প্রথম আলো

পাশেই কথা হয় আরেক কৃষক হাফেজ আহমদের (৬০) সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমরা কষ্ট করে ফসল ফলাই। সারের অনেক দাম। কিন্তু বাজারে অনেক সময় ন্যায্য মূল্য পাই না। ভবিষ্যৎ সরকার কৃষকদের কথা ভাববেন, সেটাই প্রত্যাশা।’

একই গ্রামের বাঁশখালিয়া পাড়া এলাকায় কথা হয় নির্মাণশ্রমিক আবদুল মান্নানের সঙ্গে। বস্তায় বালু ভরতে ভরতে তিনি বলেন, ‘দিনে ৫০০ টাকা আয় আমার। সেটা দিয়ে পাঁচ সদস্যের পরিবার চালাতে হিমশিম খেতে হয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম যে হারে বাড়ে, আমাদের আয় সেভাবে বাড়ে না। নির্বাচিত সরকার কি আমাদের কথা ভাববে?’

উপজেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, আসনটিতে মোট ভোটার ৫ লাখ ৬ হাজার ৫৯। ২০টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা নিয়ে বিস্তৃত এই আসনে ভোটকেন্দ্র রয়েছে ১৫৭টি। ডিজিটাল প্রচারণা, ভিডিও বার্তা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে প্রার্থীরা ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন।

তবে ভোটাররা জানিয়েছেন, স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও সাতকানিয়া–লোহাগাড়া উন্নয়নের দিক থেকে অনেক পিছিয়ে। রাস্তাঘাটসহ অবকাঠামোগত খাত চরম অবহেলিত। জনগুরুত্বপূর্ণ চাহিদাগুলোকে যিনি অগ্রাধিকার দেবেন, তাঁকেই শেষ মুহূর্তে বেছে নেবেন তাঁরা।