ঝরনা দেখতে এসে বৃষ্টিতে দুর্গম পাহাড়ে আটকা, চার বন্ধুর রুদ্ধশ্বাস ৯ দিন

কলেজের ছুটিতে ঢাকা থেকে বান্দরবানের নাফাখুম ও অমিয়াখুম ঝরনা দেখতে গিয়ে টানা ভারী বৃষ্টিতে দুর্গম পাহাড়ে ৯ দিন আটকা পড়েন চার বন্ধু—আবু হুরায়রা, মারুফ উদ্দিন, তামিম রায়হান ও মাহাদি আল মাহবুব। ৪ জুলাই অমিয়াখুমে যাওয়ার পথে থুইসাপাড়ায় বৃষ্টিতে ফেরার পথ ডুবে গেলে তাঁরা স্থানীয় এক পাহাড়ি পরিবারের জুমঘরে আশ্রয় নেন। কে জানত সেখানেই থাকতে হবে টানা সাত দিন। এরপর বিজিবির সহায়তায় দুর্গম ফিরতি পথে কাটে আরও দুই দিন। রুদ্ধশ্বাস এই ৯ দিনের গল্প বলেছেন চার বন্ধুর একজন।

বৃষ্টিতে দুর্গম পাহাড়ে আটকে পড়া চার বন্ধু। পেছনের জুমঘরটিতে এক সপ্তাহ কেটেছে তাঁদের। বান্দরবানের থানচির দুর্গম থুইসাপাড়ায়ছবি: আটকে পড়া তরুণ আবু হুরাইরারর কাছ থেকে পাওয়া।

বিপৎসংকুল, দুর্গম পাহাড়ি ট্রেইল ধরে ঝরনা দেখতে যাচ্ছিলেন চার তরুণ। ঘন জঙ্গলে ঢাকা পথ। যাওয়ার পথটাও পিচ্ছিল। এর মধ্যে হঠাৎ শুরু হয় ভারী বৃষ্টি। এমন বৃষ্টিতে ওই পথে যাওয়া অসম্ভব। ফিরে যাবেন—সেই উপায়ও নেই। ভারী বৃষ্টিতে চোখের সামনেই ডুবে গেল ফিরে যাওয়ার পথটাও। এ অবস্থায় সঙ্গী পাহাড়ি গাইড একটা উপায় বের করলেন। পাশের পাড়ায় তাঁর এক আত্মীয়ের বাড়ি আছে। সেখানে আপাতত আশ্রয় নেওয়া যেতে পারে। গাইডের কথামতো চার তরুণ সেখানে আশ্রয় নিলেন। মুঠোফোনের নেটওয়ার্কবিহীন সেই দুর্গম এলাকা থেকে খুব দ্রুত লোকালয়ে ফিরে বাড়ির পথ ধরবেন বলে ভেবেছিলেন তাঁরা। কিন্তু কে জানত, বৃষ্টি ক্রমাগত এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলতে থাকবে আর দুর্গম পাহাড়ে তাঁরা চার বন্ধু আটকা পড়ে যাবেন।

পাহাড়ে আটকে পড়া চার তরুণ আবু হুরায়রা (১৮), মারুফ উদ্দিন (১৯), তামিম রায়হান (১৯) ও মাহাদি আল মাহবুব (১৮) কলেজের ছুটিতে ঢাকা থেকে বেড়াতে এসেছিলেন বান্দরবানের থানচি উপজেলার নাফাখুম ও অমিয়াখুম ঝরনায়। নাফাখুম দেখে আরও গহিনে অমিয়াখুম দেখতে যাওয়ার পথে আটকা পড়েন তাঁরা। দ্রুত ফেরার কথা থাকলেওে সে যাত্রায় ৯ দিন পাহাড়ে আটকে থাকতে হয় তাঁদের। এর মধ্যে একটি জুমঘরেই কাটাতে হয় সাত দিন। মুঠোফোন নেটওয়ার্ক না থাকায় বেঁচে আছেন—এ খবরও প্রথম দিকে পরিবারকে জানাতে পারেননি। তবে পাহাড়ি লোকজনের আতিথেয়তার ঘাটতি ছিল না এতটুকু।

রুদ্ধশ্বাস সেই ৯ দিন কেমন কেটেছে, সেই বিবরণ প্রথম আলোর কাছে তুলে ধরেন চার তরুণের একজন আবু হুরায়রা। হুরায়রা ও তাঁর তিন বন্ধু ঢাকার সেন্ট গ্রেগরি স্কুল অ্যান্ড কলেজে একসঙ্গে পড়েছেন। তবে এখন পড়ছেন ভিন্ন ভিন্ন কলেজে। হুরায়রা ও মারুফ সেন্ট গ্রেগরি স্কুল অ্যান্ড কলেজেই রয়ে গেছেন আর তামিম নটর ডেম এবং মাহাদি উদয়ন সরকারি কলেজে পড়ছেন। চার বন্ধু ২ জুলাই বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় জলপ্রপাত নাফাখুমের উদ্দেশে রওনা দেন। এর অবস্থান বান্দরবান সদর থেকে ১১৮ কিলোমিটার দূরে। এই পর্যটনকেন্দ্রে যেতে প্রথমে নদীপথ, পরে কয়েক ঘণ্টা দুর্গম পাহাড়ি পথ হেঁটে পাড়ি দিতে হয়। বর্ষাকালে পথটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। পাহাড়ি ঢলে চলার পথ পিচ্ছিল হয়ে যায়। ট্যুর গাইডের সহায়তায় ৩ জুলাই দুপুরে তাঁরা সেখানে পৌঁছান। এরপর ৪ জুলাই বৃষ্টি শুরু হলে তাঁরা আটকা পড়েন। দীর্ঘ ৯ দিন আটকা থাকার পর ১৩ জুলাই তাঁরা ঢাকায় পৌঁছান।

‘স্থানীয় বাসিন্দা আর বিজিবি সদস্যদের আন্তরিকতা ও সহযোগিতা না থাকলে আমরা হয়তো আজ নিরাপদে ফিরতে পারতাম না। আমাদের চার বন্ধুর স্মৃতিতে বান্দরবানের এই ৯টি দিন চিরকাল থেকে যাবে।’
আবু হুরায়রা, শিক্ষার্থী, সেন্ট গ্রেগরি স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ঢাকা

বৃষ্টিতে জুমঘরে

চার বন্ধু ৩ জুলাই নাফাখুম ঘুরে থানচিতে ফিরে আসেন। সেখানে একটি রিসোর্টে রাত কাটান। পরিকল্পনা অনুযায়ী পরদিন ৪ জুলাই সকালে স্থানীয় গাইড শিমন খিয়াংকে সঙ্গে নিয়ে রওনা দেন অমিয়াখুম জলপ্রপাতের উদ্দেশে। এর অবস্থান নাফাখুম থেকে আরও গহিনে। সেখান থেকে অন্তত আড়াই ঘণ্টা পাহাড়ি পথ হেঁটে আমিয়াখুমে যেতে হয়।

তবে সেখানে আর তাঁরা পৌঁছাতে পারেননি। ওই দিন বিকেলেই শুরু হয় টানা অতিভারী বর্ষণ। এ কারণে পথে থুইসাপাড়ায় এলাকায় তাঁরা আটকা পড়েন। ওই পাড়ায় ট্যুর গাইড শিমনের পরিচিত এক পাহাড়ি পরিবারে আশ্রয় নেন তাঁরা। রাতটা সেখানেই কাটান। পরদিন বৃষ্টি থামবে আশা করেছিলেন। তবে উল্টো বৃষ্টি আরও বেড়ে যায়। পাহাড়ি ঢলে ডুবে যায় আশপাশের এলাকা। আমিয়াখুমে যাওয়ার পরিকল্পনা বাতিল করতে হয় তাঁদের। কিন্তু ফেরারও কোনো উপায় নেই। কারণ, তাঁদের ফেরার পথও পানির নিচে ততক্ষণে তলিয়ে গেছে। চারদিক থেকে একরকম বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন চার তরুণ। থুইসাপাড়ার বাঁশের মাচাংয়ের ঘরেই থাকতে হয় তাঁদের। বিদ্যুৎ, মোবাইল নেটওয়ার্ক—এসব না থাকায় প্রথমবারের মতো অনুভব করেন, তাঁরা একেবারেই বিচ্ছিন্ন। আর সময়ও যেন অনেক মন্থর হয়ে পড়েছে।

আটকে থাকা দিনগুলোতে তাই একেবারেই ভিন্ন অভিজ্ঞতা হয়েছিল তাঁদের। একদিকে অনিশ্চিয়তা, অন্যদিকে নীরব আর বন্য পাহাড়ি প্রান্তর দেখার বিস্ময়বোধ। খুব কাছ থেকে দেখা হয় পাহাড়ি সহজ-সরল জনগোষ্ঠীর সংগ্রামমুখর জীবন। এ সময় পাহাড়ি লোকজনের যে আতিথেয়তা পেয়েছেন, তা ভুলতে পারবেন না তাঁরা। তবে বাইরে কী ঘটছে, তা জানার কোনো উপায় ছিল না। ৭ জুলাই গাইডের কাছ থেকে বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধস ও বন্যার খবর শোনার পর তাঁদের উদ্বেগ আরও বাড়তে থাকে।

দুর্গম পাহাড়ি পাড়াটিতে ছিল না কোনো মুঠোফোনের নেটওয়ার্ক। বান্দরবানের থানচির দুর্গম থুইসাপাড়ায়
ছবি: আটকে পড়া তরুণ আবু হুরাইরারর কাছ থেকে পাওয়া।

আমরা বেঁচে আছি

আটকে থাকার এক পর্যায়ে চারজন জানতে পারেন, কাছের জিন্নাপাড়া এলাকায় একটি ব্যক্তিগত স্টারলিংক ইন্টারনেট সংযোগ রয়েছে। ৬ ও ৮ জুলাই হুরায়রা ও মাহাদি দুই দফায় সেখানে যান। সেখান থেকেই তাঁরা পরিবারের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য যোগাযোগ করেন। হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে কল দিয়ে শুধু জানান, ‘আমরা বেঁচে আছি, থুইসাপাড়ায় আটকে পড়েছি।’

প্রায় পাঁচ দিন আটকে থাকার পর ট্যুর গাইডের মাধ্যমে জানতে পারেন, থুইসাপাড়াতেই বিজিবির ক্যাম্প রয়েছে। গাইডের পরামর্শে ৯ জুলাই সকাল আটটায় আবু হুরায়রা ও মাহাদি আল মাহবুব সেখানে যান। পরে তাঁরা বিজিবি ক্যাম্পে গিয়ে পরিস্থিতি জানান। বৃষ্টি বেশি থাকায় বিজিবি সদস্যরা তাঁদের নিরাপদ স্থানে অবস্থান করার পরামর্শ দেন। পরদিন আবার ক্যাম্পে গেলে তাঁদের পরিচয় যাচাই করা হয়। বিজিবি সদস্যরা তাঁদের আশ্বস্ত করা হয়, পরিস্থিতি অনুকূলে এলে উদ্ধার অভিযান চালানো হবে। এতে চার বন্ধু কিছুটা স্বস্তি ফিরে পান।

তবে শঙ্কা তখনো কাটেনি। এর মধ্যেই নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়। পাশের একটি ১৪ সদস্যের পর্যটক দল ফেরার পথে নিখোঁজ হওয়ার খবর তখন থুইসাপাড়ায় ছড়িয়ে পড়ে। পরে বিজিবির মাধ্যমে জানতে পারেন, দলটি নিরাপদে থানচিতে পৌঁছেছে।

আটকে পড়া চার বন্ধু ঢাকার বাসিন্দা। সবাই থাকেন পুরান ঢাকায়। কলেজের ছুটিতে বান্দরবান বেড়াতে এসেছিলেন তাঁরা
ছবি: আটকে পড়া তরুণ আবু হুরাইরারর কাছ থেকে পাওয়া।

টানা বৈরী আবহাওয়ার কারণে শুরুতে উদ্ধার অভিযান সম্ভব হয়নি। চার বন্ধুর কেউই সাঁতার জানতেন না, পাহাড়ে চলাচলেরও অভিজ্ঞতা ছিল না। অবশেষে ১১ জুলাই আবহাওয়া কিছুটা অনুকূলে এলে ১০ সদস্যের বিজিবি দল উদ্ধার অভিযান শুরু করে।

মূল পথ পানির নিচে থাকায় বিকল্প দুর্গম পথে এগোতে হয় উদ্ধারকারী দলকে। ভূমিধস, খাড়া পাহাড়ি ঢাল ও উত্তাল নদী পার হতে হয়েছে তাঁদের। কোথাও হাত ধরে, কোথাও বিজিবির সদস্যদের সহায়তায়, আবার কোথাও জঙ্গল কেটে নতুন পথ তৈরি করে এগিয়ে যেতে হয়। প্রথম দিনের অভিযান শেষে একটি পাহাড়ি পাড়ায় রাত কাটানোর পর ১২ জুলাই আবার যাত্রা শুরু হয়। সারা দিন দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে তাঁরা থানচির সাকা হাফং-সংলগ্ন এলাকায় পৌঁছান। সেখান থেকে বিজিবির গাড়িতে থানচিতে ফেরেন। পথে দীর্ঘ ৯ দিন পর আবার মোবাইল নেটওয়ার্ক পান তাঁরা।

১৩ জুলাই বিজিবির নির্দেশনা অনুযায়ী আলীকদম ও চকরিয়া হয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন চার বন্ধু। তাঁরা জানান, স্থানীয় গাইড থুইসাপাড়ার বাসিন্দা হওয়ায় খাবারের সংকটে পড়তে হয়নি তাঁদের। স্থানীয় পরিবারের দেওয়া ভাত, ডাল ও পাহাড়ি খাবারেই কেটেছে তাঁদের দিন। পাহাড়ি পাড়ার কেউ তাঁদের থেকে থাকা ও খাওয়ার টাকা নেননি।

চার বন্ধুর সবাই এখন সুস্থ রয়েছেন। তবে এখনো মানসিকভাবে তাঁরা স্বাভাবিক হতে পারেননি। তাই চার বন্ধুর তিনজনকেই পরিবার থেকে এসব বিষয় নিয়ে কারও সঙ্গে কথা না বলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। জানতে চাইলে আবু হুরায়রা প্রথম আলোকে বলেন, ‘শুরুতে এটি ছিল সাধারণ এক ভ্রমণ। কিন্তু টানা বৃষ্টি আর যোগাযোগহীনতা ওটাকে জীবনের অন্যতম ভয়াবহ অভিজ্ঞতায় রূপ দিয়েছিল। তবে স্থানীয় বাসিন্দা আর বিজিবি সদস্যদের আন্তরিকতা ও সহযোগিতা না থাকলে আমরা হয়তো আজ নিরাপদে ফিরতে পারতাম না। আমাদের চার বন্ধুর স্মৃতিতে বান্দরবানের এই ৯টি দিন চিরকাল থেকে যাবে।’

বিজিবি, গাইড ও স্থানীয়দের সহায়তায় খরস্রোতা ঝরনা দিয়ে পার করানো হচ্ছে তরুণদের
ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

থানচি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কানন সরকার প্রথম আলোকে বলেন, ‘থানচিতে আসা চার পর্যটকের তথ্য থানায় নিবন্ধিত ছিল। টানা বৃষ্টিতে সাঙ্গু নদীর স্রোত তীব্র ছিল। এ কারণে তাঁরা ফেরত আসতে পারছিলেন না। আর সব সময় পুলিশের পক্ষে সেখানে যাওয়াও সম্ভব হয় না। ওই এলাকায় বিজিবির একাধিক ক্যাম্প থাকায় উদ্ধারকাজে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিজিবি ও উপজেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে ধাপে ধাপে তাঁদের উদ্ধার করে নিরাপদে থানচিতে আনা হয়।’

থানচি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ আবদুল্লাহ-আল-ফয়সাল প্রথম আলোকে বলেন, বৃষ্টির কারণে এখানে নদীর পানি বেড়ে প্রবল স্রোতের সৃষ্টি হয়েছিল। এ কারণে চার পর্যটককে তাৎক্ষণিকভাবে সরিয়ে আনা যায়নি। পরে জেলা প্রশাসন ও মন্ত্রীর নির্দেশনায় উপজেলা প্রশাসন ও ৩৮ বিজিবির সমন্বয়ে তাঁদের উদ্ধার করা হয়।

মোহাম্মদ আবদুল্লাহ-আল-ফয়সাল বলেন, ‘উদ্ধার অভিযানে ৩৮ বিজিবির পাশাপাশি স্থানীয় গাইড শিমন খিয়াং ও কয়েকজন পাড়াবাসীর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে গাইড শিমন ঝুঁকিপূর্ণ স্থান পার করানো, নতুন পথ খুঁজে বের করা এবং চার পর্যটককে নিরাপদে এগিয়ে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, বিজিবি ও স্থানীয়দের সমন্বিত প্রচেষ্টায় উদ্ধার অভিযান সফলভাবে সম্পন্ন হয়।’