অভিযুক্ত শেখ জাকারিয়া খানজাহান আলী থানা আওয়ামী লীগের সহপ্রচার সম্পাদক ছিলেন। হামলার পর তাঁকে ওই পদ থেকে বহিষ্কার করে থানা আওয়ামী লীগ। ছোট ভাই জাফরিন খুলনা মহানগর ছাত্রলীগের সহসভাপতি ছিলেন। অন্য একটি ঘটনায় তাঁকে আগেই দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। মেজ ভাই মিল্টন একটি অস্ত্র মামলায় জেল খেটেছেন কয়েক বছর।

এলাকাবাসী বলেন, ঘটনার দিন সন্ধ্যায় ওই এলাকায় থাকা জাকারিয়ার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে মুজিবর রহমান শেখ নামের একজনকে অস্ত্রসহ আটক করে পুলিশ। এলাকাবাসীর সঙ্গে দীর্ঘদিনের বিরোধের জের ধরে মুজিবর রহমানকে ডেকে নিয়ে অস্ত্র দিয়ে পুলিশে ধরিয়ে দেওয়া হয়। এ কারণে এলাকাবাসীর মধ্যে ক্ষোভের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। পরে রাত ৮টার দিকে এলাকাবাসী দল বেঁধে জাকারিয়াদের বাড়িতে যাওয়ার উদ্যোগ নিলে গেটের কাছে যেতেই গুলি ছোড়েন জাকারিয়া ও তাঁর ভাইয়েরা। দীর্ঘদিন ধরে জাকারিয়া ও তাঁর ভাইদের অত্যাচারে ক্ষুব্ধ ছিলেন এলাকাবাসী। ঘটনার পর তিন ভাইয়ের বাড়ি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়।

তিন ছেলেমেয়ে ও শাশুড়ি নিয়ে কী কষ্টে যে সংসার চলছে, তা বলে বোঝাতে পারব না। এলাকাবাসীর দয়ায় কোনোরকমে বেঁচে আছি
গুলিতে নিহত গোলাম রসুলের স্ত্রী নাছিমা বেগম

গত বৃহস্পতিবার বিকেলে ওই গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, তিন ভাইয়ের বাড়ি শূন্য পড়ে আছে। শুধু অবকাঠামো আছে, দরজা-জানালা কিছুই নেই। ঘরের মধ্যে পোড়া দাগ, নেই কোনো আসবাব। এলাকাবাসী বলেন, ঘটনার পর তিনটি বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছিলেন বিক্ষুব্ধ গ্রামবাসী। সেই থেকে ওই বাড়িগুলো সেভাবেই পড়ে আছে।

স্থানীয় চা–দোকানি আফসার শেখের সঙ্গে কথা হয়। তাঁর বয়স ৭০ পেরিয়েছে। ঘটনার সময় একটি গুলি তাঁর পিঠ দিয়ে ঢুকে বুক দিয়ে বেরিয়ে যায়। তিনি বেঁচে যাবেন এমন আশা কেউ করেননি। ক্ষতস্থান দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘নিয়মিত ওষুধ খেতে হয়। আর তা না হলে ক্ষতস্থানে যন্ত্রণা করে। এখন আর আগের মতো ভালোভাবে কাজ করতে পারি না।’

মশিয়ালী গ্রামে গুলিতে তিনজন নিহত হওয়ার পর চলতি বছরের ২৯ জানুয়ারি প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে আসেন জাকারিয়া, জাফরিনসহ ওই মামলার আসামিরা। ওই দিন খুলনা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে তাঁরা নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন। নিজেদের মধ্যে বোমা হামলা ও গোলাগুলি করতে গিয়ে গোলাম রসুল, নজরুল ইসলাম ও সাইফুল ইসলাম মারা গেছেন বলে দাবি করেন তাঁরা।

রাত জেগে পাহারা

চলতি বছরের শুরুর দিকে জামিনে ছাড়া পান শেখ জাকারিয়াসহ তিন ভাই। এরপর তাঁরা আর বাড়িতে ফেরেননি। তবে গ্রামের আশপাশে বিভিন্ন আত্মীয়ের বাড়িতে তাঁরা থাকেন। মাঝেমধ্যে লোকজন নিয়ে রাতে গ্রামের মধ্যে মহড়া দেন। এতে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এলাকাবাসী। তাঁরা মনে করছেন, ওই খুনের পর মামলাসহ বিভিন্ন ইস্যুতে যাঁরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন, তাঁদের যেকোনো সময় ক্ষতি করতে পারেন ওই তিন ভাই। এ জন্য লোকজন নিয়ে রাতে গ্রামে প্রবেশের চেষ্টা করছেন। তাঁদের হাত থেকে বাঁচতে প্রায় তিন মাস ধরে নিয়মিত গভীর রাত পর্যন্ত পাহারা দিচ্ছেন গ্রামবাসী।

অসহায় গোলাম রসুলের পরিবার

জাকারিয়া ভাইদের ছোড়া গুলিতে নিহত গোলাম রসুল ছিলেন দিনমজুর। তাঁর তিন ছেলেমেয়ে। ঘটনার সময় ছোট মেয়েটির বয়স ছিল ১৩ মাস। এখন ওই মেয়ের বয়স তিন বছরের কিছু বেশি। একমাত্র ছেলে নাহিদ শেখ নবম শ্রেণিতে পড়ছে। আর মেজ মেয়ে সাথী খাতুন ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী। গোলাম রসুল মারা যাওয়ার পর পরিবারটি খুব অসহায় হয়ে পড়ে। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে দেওয়া ভিজিডি কার্ড ও বিভিন্ন জায়গা থেকে চেয়েচিন্তে চলছে পরিবারটি। ছেলেমেয়ের পড়াশোনাও বন্ধ হওয়ার উপক্রম।

গোলাম রসুলের স্ত্রী নাছিমা বেগম প্রথম আলোকে বলেন, ‘যাদের জন্য গোলাম রসুল মারা গেল, তারা এখনো বুক ফুলিয়ে বেড়াচ্ছে। মানুষকে মামলা, হুমকি দিয়ে যাচ্ছে কিন্তু তাদের কিছুই হচ্ছে না। আমরা বিচার চেয়ে পাচ্ছি না। সরকার আমাদের প্রতি সহানুভূতি দেখালে আসামিরা এভাবে ঘুরে বেড়াতে পারত না।’ তিনি বলেন, ‘তিন ছেলেমেয়ে ও শাশুড়ি নিয়ে কী কষ্টে যে সংসার চলছে, তা বলে বোঝাতে পারব না। এলাকাবাসীর দয়ায় কোনোরকমে বেঁচে আছি।’

মামলার বাদী যখন আসামি

গুলিতে মারা যাওয়া তিনজনের মধ্যে সবার ছোট ছিল সাইফুল ইসলাম। একটি টেকনিক্যাল কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিলেন তিনি। ঘটনার দিন তাঁর বুকে গুলি লাগে। তাঁকে নিয়ে হাসপাতালে ছিলেন তাঁর বাবা সাইদুল ইসলাম। ছেলে মারা যাওয়ার পর তিনিই থানায় মামলা করেছিলেন।

জাকারিয়াদের চাচাতো ভাই জিহাদ শেখকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় ১৭ জনকে আসামি করে আদালতে মামলা করেছিলেন জিহাদের বাবা। ওই মামলায় আসামি করা হয় সাইদুল ইসলামকে। মামলাটির তদন্ত করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। চার আসামিকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। বর্তমানে তাঁরা জামিনে আছেন।

সাইদুল ইসলামের একটি মুদিদোকান আছে মশিয়ালী গ্রামের পাশে ইস্টার্ন জুট মিল গেট বাজারে। প্রায় চার মাস আগে সেখান থেকে পুলিশ তাঁকে ধরে নিয়ে যায়। পরে অবশ্য ছেড়ে দিয়েছিল। বর্তমানে দোকানটি বন্ধ রেখেছেন তিনি।

সাইদুল ইসলামের স্ত্রী হীরা বেগম বলেন, জাকারিয়া ও তাঁর দুই ভাই ওই বাজারে ঘোরাফেরা করেন। তাঁদের মুদিদোকানের পাশে বসে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখান। এসব কারণে দোকানে যেতে পারছেন না সাইদুল।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন