পৌর ভবনের ছাদে সবুজের উদ্যান, পেল জাতীয় পুরস্কার

শেরপুর পৌরসভা কার্যালয়ের ছাদবাগান ঘুরে বিভিন্ন ফুল-ফল ও ভেষজ গাছ দেখছেন পৌর প্রশাসক আরিফা সি‌দ্দিকা। সম্প্রতি তোলাপ্রথম আলো

সিঁড়ি বেয়ে তিনতলা পেরিয়ে পৌরসভা কার্যালয়ের চতুর্থ তলার ছাদে উঠতেই চোখে পড়ে লাল-সবুজের নান্দনিক এক বাগান। চারদিকে বাহারি ফুলের সমারোহ। কোথাও সারি সারি জলপাই, সফেদা, কতবেল, আম ও জামগাছ। কোথাও পিটুনিয়া, পীতরাজসহ নানা প্রজাতির ফুল। আছে ঔষধি ও সবজি গাছের পাশাপাশি দেশীয় বিলুপ্তপ্রায় ও বিরল প্রজাতির গাছও।

গাছগুলো কোনোটি ড্রামে, কোনোটি টবে, আবার কোনোটি ঝুলন্ত পাত্রে বেড়ে উঠেছে। প্রতিটি গাছের পাশে লাগানো আছে এর বৈজ্ঞানিক নামের ফলক। পুরো বাগানটি ঘুরে দেখলে মনে হবে, এটি কোনো পৌর ভবনের ছাদ নয়; বরং ছোট পরিসরে গড়ে ওঠা একটি উদ্ভিদ উদ্যান।

এটি শেরপুর পৌরসভার কার্যালয়ের ছাদবাগানের দৃশ্য। নানা প্রজাতির গাছের সমাহার, পরিকল্পিত বিন্যাস ও নিয়মিত পরিচর্যার স্বীকৃতি হিসেবে এবার বাগানটি জাতীয় পর্যায়ে পুরস্কার পেয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে বাগানটি তৃতীয় হয়েছে।

শেরপুর পৌরসভার ছাদবাগানটি এবার জাতীয় পুরস্কার পেয়েছে। ৯ আগস্ট রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে পুরস্কার ও সম্মাননা গ্রহণ করেন আরিফা সিদ্দিকা
ছবি: শেরপুর পৌরসভার সৌজন্যে

বিশ্ব পরিবেশ দিবস ও পরিবেশ মেলা ২০২৬ এবং জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান ও বৃক্ষমেলা ২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ছাদবাগানটি জাতীয় পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত হয়।

৯ আগস্ট রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে এক অনুষ্ঠানে শেরপুর জেলা স্থানীয় সরকারের উপপরিচালক ও পৌরসভার প্রশাসক আরিফা সিদ্দিকা ওই পুরস্কার গ্রহণ করেন।

৪ হাজার ৮৮০ বর্গফুটে বাগান

পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালের দিকে ভবনের ছাদে ছোট পরিসরে বাগান করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০২৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর শেরপুর জেলা স্থানীয় সরকারের উপপরিচালক আরিফা সিদ্দিকা পৌরসভার প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নেন। সে সময় প্রায় ৬ হাজার ১০০ বর্গফুটের ছাদে স্বল্প পরিসরের একটি বাগান ছিল। তাঁর উদ্যোগে বাগানটির পরিধি ও বৈচিত্র্য বাড়ানোর কাজ শুরু হয়। পরে পৌরসভার সহকারী কর আদায়কারী মো. সারোয়ার জাহানের তত্ত্বাবধানে প্রায় ৪ হাজার ৮৮০ বর্গফুট জায়গাজুড়ে গাছগুলোকে বিজ্ঞানভিত্তিকভাবে বিন্যাস করে নতুনভাবে বাগানটি সাজানো হয়।

শেরপুর পৌরসভার কার্যালয়ের ছাদবাগান। সম্প্রতি তোলা
ছবি: প্রথম আলো

বর্তমানে বাগানে ১০ প্রজাতির বনজ, ২০ প্রজাতির ফলদ, ১৮ প্রজাতির ভেষজ, প্রায় ২০০ প্রজাতির ফুল ও শোভাবর্ধনকারী গাছ রয়েছে। এ ছাড়া ৯ প্রজাতির দেশীয় বিলুপ্তপ্রায় গাছ, ১০ প্রজাতির অর্কিড, ৭ প্রজাতির বিরল প্রজাতির গাছ ও ১৮ প্রজাতির সবজি ও অন্যান্য গাছ রয়েছে।

ফুল-ফল-সবজি-ভেষজের আলাদা কর্নার

সম্প্রতি পৌরসভা ভবনের ছাদবাগানে গিয়ে দেখা যায়, বাগানের চারপাশ খোলা। নিচ থেকে উঠে আসা একটি আমগাছের ডালপালা ছাদবাগানের সঙ্গে মিশে গেছে। এতে বাগানটির সৌন্দর্য আরও বেড়েছে।

বাগানের গাছগুলো এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে প্রতিটি গাছ প্রয়োজন অনুযায়ী আলো-বাতাস ও পানি পায়। পুরো বাগানটি ফুল, ফল, সবজি ও ভেষজ—এমন বিভিন্ন কর্নারে ভাগ করা হয়েছে।

কোনো গাছে ঝুলছে কলার কাঁদি, কোথাও আম, আমড়া ও লটকন। ফুটে আছে নানা রঙের ফুল। ছাদের এক পাশে তৈরি করা চৌবাচ্চার পানিতে ফুটছে দুই ধরনের শাপলা ও পদ্ম। পাশেই ঝুলন্ত টবে শোভা পাচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির অর্কিড।

শুধু সৌন্দর্য বাড়ানো নয়, গাছের পরিচয় জানাতেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাগানের প্রায় প্রতিটি গাছের পাশে বৈজ্ঞানিক নামসহ পরিচিতি ফলক রয়েছে। ফলে দর্শনার্থীরা গাছ দেখার পাশাপাশি এর পরিচয়ও জানতে পারছেন।

সম্প্রতি ছাদবাগানটি পরিদর্শন করেন শেরপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক মো. মামুনুর রশিদ পলাশ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, শুধু টাকা খরচ করলেই বাগান করা যায় না। এর জন্য রুচিশীল মানসিকতা, পরিকল্পনা ও নিয়মিত পরিচর্যা প্রয়োজন। জাতীয় পর্যায়ে শেরপুর পৌরসভার ছাদবাগান নির্বাচিত হওয়া আনন্দের বিষয়। এখানে ফুল, ফল, ঔষধি ও বিভিন্ন প্রজাতির গাছ সুন্দরভাবে সাজানো হয়েছে। যে কেউ বাগানটি দেখলে মুগ্ধ হবেন। ইচ্ছা ও চেষ্টা থাকলে ভালো যেকোনো উদ্যোগে সফলতা আসে—এই ছাদবাগান তার উদাহরণ।

নান্দনিক ও পর্যটনবান্ধব করার উদ্যোগ

শেরপুর পৌরসভা কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে গড়ে ওঠা এই ছাদবাগান শুধু একটি ভবনের সৌন্দর্য বাড়াচ্ছে না; নগর এলাকায় সীমিত জায়গায় কীভাবে পরিকল্পিতভাবে সবুজায়ন করা যায়, তারও একটি উদাহরণ তৈরি করেছে।

সীমান্তবর্তী জেলা শেরপুরকে নান্দনিক ও পর্যটনবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলতে নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের মধ্যে পৌরসভা কার্যালয়ের ছাদবাগানটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ‘পর্যটনের আনন্দে, তুলসীমালার সুগন্ধে’—এই ব্র্যান্ডিংয়ের সঙ্গে পরিবেশবান্ধব নগর ভাবনার সমন্বয় ঘটিয়ে এমন উদ্যোগ আরও বাড়ানো গেলে শহরের সৌন্দর্য যেমন বাড়বে, তেমনি নাগরিকদের মধ্যেও ছাদবাগান ও সবুজায়নের প্রতি আগ্রহ তৈরি হবে।


‘ছোট পরিসর থেকে জাতীয় স্বীকৃতি’

পৌরসভার প্রশাসক আরিফা সিদ্দিকা প্রথম আলোকে বলেন, পাঁচ-ছয় বছর আগে ছোট পরিসরে বাগানটি করা হয়েছিল। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর সেখানে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ যুক্ত করে বাগানটিকে বিজ্ঞানভিত্তিকভাবে সাজানোর উদ্যোগ নেন।

তিনি আরও বলেন, ‘পৌরসভার সবার আন্তরিক প্রচেষ্টায় বাগানটি সুন্দরভাবে সাজাতে পেরেছি। বাগানটি করতে পেরে এমনিতেই ভালো লেগেছে। এর সঙ্গে জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃতি পাওয়ায় আনন্দটা আরও বেড়ে গেছে।’