সিলেট নগরের আম্বরখানা এলাকায় প্রতিদিনই বসে বৃন্দস্বরের আড্ডা
ছবি: প্রথম আলো

চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে নানা বিষয়ে আড্ডাবাজরা কথা বলতে থাকেন। কেউবা নড়াইলের হারেজ ফকির নামের এক বাউলের আশ্রম ভাঙচুরের প্রসঙ্গটি উত্থাপন করেন। কেউবা আবার সমসাময়িক রাজনীতি নিয়ে নিজের অভিমত জানান। কিছুক্ষণ এ আলাপের পর শুরু হয় সিলেটের সাহিত্য, সংস্কৃতি, রাজনীতি নিয়ে গল্প-আড্ডা।

গত শুক্রবার রাতে এমন জমজমাট আড্ডার দেখা মেলে সিলেট নগরের আম্বরখানা এলাকার নবীবা কমপ্লেক্সের একটি কক্ষে। ‘বৃন্দস্বর’ নামের একটি সংগঠন গড়ে সিলেটের একদল সাহিত্য, সংস্কৃতিকর্মী প্রতিদিন এখানে বিকেল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত আড্ডায় সরব থাকে। চায়ের সঙ্গে বিস্কুট ভিজিয়ে আড্ডাবাজরা নানা বিষয়ে তর্কবিতর্কে মেতে ওঠেন। গড়ে প্রতিদিনই ১৫ থেকে ২০ জন আড্ডাবাজ মানুষ এখানে যোগ দেন।

আড্ডায় অংশ নেওয়া কয়েকজন বলেন, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও বিশিষ্ট গীতিকার শামসুল আলম সেলিমের ভাড়া নেওয়া একটি কক্ষেই বৃন্দস্বর যাত্রা শুরু করে। নিছক আড্ডা দেওয়ার উদ্দেশ্যে ২০১৩ সালের ৬ নভেম্বর এ সংগঠনের যাত্রা শুরু। সংগঠনের নামকরণ করেন খতিবুর রহমান জামাল নামের এক আড্ডাপ্রিয় ব্যক্তি। বৃন্দস্বরে আড্ডায় অংশগ্রহণকারী অনেকের রচিত বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে জন্মদিন উদ্‌যাপন, দর্শনীয় স্থানে ভ্রমণসহ অনেক কিছুই সংগঠনটি নিয়মিত করে আসছে। মাঝেমধ্যে ভোজনপর্বেরও ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে।

বৃন্দস্বরের উল্লেখযোগ্য এক আড্ডাবাজ কবি আবিদ ফায়সাল। তাঁর ‘কথারা বাদাম ভাঙে’ শীর্ষক একটি গদ্যের বই ২০২১ সালের ২১ ডিসেম্বর প্রকাশ করেছে প্রকাশনা সংস্থা নাগরী। এতে আবিদ লিখেছেন, ‘বৃন্দস্বর আড্ডা পৃথক মহিমা পায় এর ব্যতিক্রমধর্মী প্রকাশনার জন্য। এক ফর্মার পুস্তিকা বের করার তাগিদ দেন নৃপেন্দ্রলাল দাশ।’ তিনি তাঁর বইয়ে আরও লিখেন, ‘২০১৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত ১২টি কবিতার, গানের, পদ্যের ও পুঁথির বই বের হয়েছে বৃন্দস্বর থেকে।’

শুক্রবার রাতে বৃন্দস্বরে গিয়ে দেখা গেল, শামসুল আলম সেলিম ছাড়াও সিলেটের সাহিত্য ও সংস্কৃতিকর্মীরা আড্ডা দিচ্ছেন। তাঁদের মধ্যে কবি মোহাম্মদ হোসাইন, কণ্ঠশিল্পী শামীম আহমদ, ইতালিপ্রবাসী কবি আশরাফ জানু, ভ্রমণলেখক খতিবুর রহমান জামাল, গোলাম হামিদ বাবুল, গীতিকার শহীদ চৌধুরী প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা জানান, সিলেটের বিশিষ্টজনদের মধ্যে নৃপেন্দ্রলাল দাশ, এ কে শেরাম, আবুল ফতেহ ফাত্তাহ, এনায়েত হাসান মানিক, পুলিন রায় প্রমুখ এখানে নিয়মিত আসেন। এ ছাড়া সিলেটে দেশ-বিদেশের গুণীজনেরা এলে একটু সময়ের জন্য হলেও বৃন্দস্বরের আড্ডায় যোগ দেওয়ার চেষ্টা করেন।

কবি মোহাম্মদ হোসাইন বলেন, সারা দিনের ক্লান্তি শেষে বৃন্দস্বরের আড্ডা যেন নিশ্বাস নেওয়ার এক অসাধারণ অনুষঙ্গ। আড্ডায় বৃন্দস্বরের ‘গোষ্ঠীপতি’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া শামসুল আলম সেলিম বলেন, বৃন্দস্বর মূলত প্রগতিশীল কবি, লেখকদের মুক্ত আড্ডার স্থান। বৃন্দস্বরের কোনো সাংগঠনিক কাঠামো নেই, সংবিধানও নেই। কোনো অনুষ্ঠান আয়োজনে উপস্থিত জ্যেষ্ঠদের মধ্য থেকে একজনকে সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়। সবাই মিলে নির্মল আড্ডা দেওয়ার মানসিকতা থেকেই এ সংগঠনের যাত্রা।