প্রসবের পর মায়ের মৃত্যু, স্বামী লাপাত্তা, নবজাতককে দত্তক নিতে হাসপাতালে ভিড়

নবজাতকটিকে দত্তক নিতে এসে বসে আছেন এক নারী। মঙ্গলবার দুপুরে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেছবি: প্রথম আলো

সন্তানসম্ভবা এক নারী একাই এসে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। পরে সন্তান প্রসবের সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তাঁর মৃত্যু হয়। এ সময় সঙ্গে কোনো অভিভাবক না থাকায় নবজাতককে বেওয়ারিশ হিসেবে লোকজন দত্তক নেওয়ার জন্য হাসপাতালে ভিড় করছেন।

আজ মঙ্গলবার দুপুরে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ২৬ নম্বর ওয়ার্ডে এক নারীকে নবজাতকের খালা সেজে বাচ্চার পাশে বসে থাকতে দেখা গেছে। তিনি তাঁর বোনের জন্য ওই নবজাতককে দত্তক নেওয়ার চেষ্টা করছেন। খবর পেয়ে মারা যাওয়া নারীর ভাই বাচ্চাটিকে নিতে এসে আইনি জটিলতায় পড়েছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নবজাতকের বাবার নাম রিপন আলী। তাঁর বাড়ি নওগাঁর মান্দা উপজেলার পরানপুর ইউনিয়নের সোনাপুর বালুবাজার গ্রামে। তিনি একটি হোটেলে পরিচারকের কাজ করেন। তাঁর স্ত্রী সন্তানসম্ভবা তাহমিনা বেগম (২৫) গত রোববার একাই মান্দা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হয়েছিলেন।

হাসপাতালের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মোহা. আনোয়ারুল ইসলাম জানান, রোববার তাহমিনা বেগম নামের ওই প্রসূতি হাসপাতালে বাচ্চা প্রসব করেন। তাঁর সঙ্গে কেউ ছিলেন না। বাচ্চা প্রসবের পর তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। রক্তক্ষরণ বন্ধ হচ্ছিল না। তখন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানোর জন্য পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু ওই মা ও নবজাতককে রাজশাহীতে নিয়ে যাওয়ার মতো কোনো অভিভাবক পাওয়া যায়নি। বাধ্য হয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কর্তৃপক্ষ মান্দা থানার পুলিশের সহযোগিতায় অ্যাম্বুলেন্সে রাজশাহীতে পাঠানোর ব্যবস্থা করে।

মান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কে এম মাসুদ রানা বলেন, ওই রাতে রোগীর সঙ্গে যাওয়ার মতো কেউ ছিল না। সমাজসেবা অধিদপ্তরে যোগাযোগ করে কাউকে পাননি তিনি। ওই নারী একাই এসে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। বাড়ির যে ফোন নম্বর দিয়েছিলেন, সেটাও ভুল ছিল। তাই তাঁরা পুলিশি হেফাজতে মা ও নবজাতককে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তির জন্য পাঠান। পরে পরিবারে খবর পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। পরিবারের সদস্যরা গিয়ে লাশ নিয়ে এসেছেন।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, দুই পুলিশ সদস্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ২৬ নম্বর ওয়ার্ডে গিয়ে বাচ্চাকে ভর্তি করেন। আর হাসপাতালে নেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে মায়ের মৃত্যু হয়। তাঁকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজের মর্গে রাখা হয়। খবর পেয়ে গতকাল সোমবার মৃত তাহমিনা বেগমের ভাতিজা রেজওয়ান, ফুফাতো ভাই মাহমুদ ও ভাবি দেলজান হাসপাতালে এসে লাশ গ্রহণ করেন।

এদিকে ২৬ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তির সময় নবজাতকের কোনো অভিভাবক না থাকার কারণে বেওয়ারিশ হিসেবে খবর ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন জায়গা থেকে লোকজন বাচ্চাটিকে দত্তক নেওয়ার জন্য হাসপাতালের ওই ওয়ার্ডে ভিড় করছেন। আজ দুপুর পৌনে ১২টার দিকে হাসপাতালের ওই ওয়ার্ডে দেখা যায়, অভিভাবক সেজে নবজাতকের পাশে বসে আছেন আয়েশা নামের এক নারী। তিনি বলছেন, বাচ্চাকে দত্তক নেওয়ার জন্য তাঁরা আবেদন করেছেন। বাচ্চাটিকে তাঁর বোনের জন্য নেবেন। সেই হিসেবে তিনি বাচ্চার খালা হবেন।

এরই মধ্যে ওই নবজাতককে নিতে হাসপাতালে এসেছেন মারা যাওয়া তাহমিনার ভাতিজা রেজওয়ান। তিনিই আগের দিন লাশ নিতে এসেছিলেন। প্রথম আলোকে রেজওয়ান জানান, তাঁরা লাশ গ্রহণ করেছেন। পরিচয় দিয়ে গেছেন। লাশ দাফন করে বাচ্চা নিতে এসে দেখছেন, অনেকেই বাচ্চাকে বেওয়ারিশ ভেবে দত্তক নিতে এসেছেন। তিনি বলেন, তাঁদের লাশ গ্রহণের সব কাগজপত্র আছে। এগুলো দিয়ে পরিচালকের কাছে আবেদন করেছেন। বাচ্চার বাবার বিষয়ে জানতে চাইলে রেজওয়ান বলেন, সে গরিব মানুষ, হয়তো খরচের ব্যবস্থা নেই। সে ভয়েই পালাতে পারে। গরিব মানুষ হিসেবে বিবেচনা করে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ করা হয়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে হাসপাতালের মুখপাত্র শঙ্কর কে বিশ্বাস আজ বেলা দেড়টার দিকে প্রথম আলোকে বলেন, বৈধ অভিভাবক এসে থাকলে আইনিপ্রক্রিয়া অনুসরণ করে তাঁদের কাছে বাচ্চা হস্তান্তর করতে হবে। বিষয়টি নগরের রাজপাড়া থানায় অবহিত করা হয়েছে। এ জন্য সময় লাগতে পারে। তবে যত দ্রুত সম্ভব বাচ্চাটি হস্তান্তরের চেষ্টা করা হবে।