হাজার কোটি টাকার তাজা মাছ যাচ্ছে সারা দেশে

বর্তমানে প্রতিদিন দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নাটোর জেলা থেকে অন্তত ৫০০ ট্রাক তাজা মাছ বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হচ্ছে। 

তাজা মাছ পরিবহনের প্রস্তুতি চলছে। গত শুক্রবার বিকেলে নাটোরের সিংড়া উপজেলা সদরের মাছের আড়তেছবি: প্রথম আলো

দুই যুগ আগেও এ দেশের মানুষ ফরমালিনের কারণে বাজার থেকে মাছ কিনতে ভয় পেতেন। এই রাসায়নিক প্রতিরোধে প্রশাসনকে তৎপর থাকতে হতো। তবে পরিস্থিতি এখন বদলেছে। ভোক্তারা এখন বাজারে গিয়ে পুকুরের তাজা মাছ কিনতে পারছেন। সারা দেশের বাজারে এই তাজা মাছ সরবরাহে বড় ভূমিকা রাখছেন নাটোরের মাছ ব্যবসায়ীরা। এখান থেকে প্রতিদিন অন্তত ৫০০ মেট্রিক টন জীবন্ত মাছ সরাসরি দেশের বিভিন্ন বাজারে যাচ্ছে। বছরে এর পরিমাণ দাঁড়ায় লাখ ৮২ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন। গড়ে ৪০০ টাকা কেজি হিসাবে এসব মাছের মূল্য দাঁড়ায় ৭ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। 

মাছ উৎপাদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, দেশে মাছ উৎপাদনে এগিয়ে থাকা নাটোর জেলায় পুকুরের ছড়াছড়ি। আছে চলনবিল, হালতি বিলসহ অজস্র খাল-বিল। জেলা মৎস্য বিভাগের হিসাবে, নাটোরে প্রতিবছর এক লাখ মেট্রিক টনের মতো মাছ উৎপাদিত হয়। তবে বাস্তবে এর পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ। মাছের এই উৎপাদন স্থানীয় চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি। 

চাহিদার অতিরিক্ত এসব মাছ ১৯৯৮ সালে যমুনা সেতু উদ্বোধনের আগপর্যন্ত ফরমালিন ব্যবহার করে ও বরফজাত করে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হতো। এতে ব্যবসায়ীরা দাম কম পেতেন, অনেক মাছ পচে নষ্ট হতো। ২০০০ সাল থেকে এ পরিস্থিতি বদলাতে থাকে। মাছ ব্যবসায়ীরা পুকুর থেকে মাছ ধরে পানিভর্তি ট্রাকে করে সরাসরি ঢাকার বাজারে নিয়ে যেতে শুরু করেন। মাত্র ৪–৫ ঘণ্টার মধ্যে জীবন্ত মাছ চলে যাচ্ছে ভোক্তার ব্যাগে। অল্প সময়ে শহরের ক্রেতাদের কাছে তাজা মাছের চাহিদা বহুগুণ বেড়ে যায়। মাছ সরবরাহকারীর সংখ্যাও বাড়তে থাকে। ঢাকা ছাড়াও গাজীপুর, চট্টগ্রাম, সিলেট, নোয়াখালীতে তাজা মাছের বাজার সম্প্রসারিত হয়। 

বর্তমানে প্রতিদিন দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নাটোর জেলা থেকে অন্তত ৫০০ ট্রাক তাজা মাছ বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হচ্ছে। প্রতি ট্রাকে গড়ে এক টন করে মাছ নিয়ে যাওয়া হয়। 

কীভাবে তাজা মাছ পরিবহন করা হয়

জীবন্ত মাছ পরিবহনের জন্য ছোট ট্রাকের পেছনের অংশকে ‘মোবাইল ফিশ ট্যাংক’-এ পরিণত করা হয়। খরচ কমাতে অনেকে ধাতব ট্যাংকের পরিবর্তে শক্ত পলিথিন ব্যবহার করেন। ট্যাংকের সামনের ওপরের অংশে বসানো হয় পানি ওঠানোর শ্যালো ইঞ্জিনচালিত পাম্প। এই পাম্প দিয়ে ট্যাংকে থাকা পানি তুলে আবার ট্যাংকেই ফেলা হয়, যেন বাতাসের অক্সিজেন প্রতিনিয়ত পানিতে মিশতে পারে। এরপর পুরো ট্যাংক জাল দিয়ে মোড়ানো হয়, যেন মাছ লাফিয়ে বাইরে না পড়তে পারে। সর্বশেষ পুকুর থেকে মাছ ধরে সরাসরি ওই ট্যাংকে সংরক্ষণ করা হয়। 

দূরত্বভেদে মাঝেমধ্যে পানি বদলানো হয়। কেউ কেউ অধিক সুরক্ষার জন্য ট্যাংকের পানিতে অক্সিজেন ব্যাগ ও স্যালাইন ব্যবহার করেন। চলন্ত ট্রাকের ঝাঁকুনিতে সৃষ্টি হওয়া পানির ঢেউ ও পাম্পের পানির প্রবাহ মাছকে তাজা রাখতে সহায়তা করে। ফলে পুকুর থেকে মাছ অনায়াসে দূরের গন্তব্যে জীবন্ত অবস্থায় পৌঁছে যায়। 

মাছচাষি, ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের সুবিধা

আগে মাছচাষিরা পুকুর থেকে মাছ ধরে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বাজারের আড়তে বিক্রি করতে যেতেন। এখন ব্যবসায়ীরা ট্রাক নিয়ে সরাসরি পুকুরে আসেন জীবন্ত মাছ কেনার জন্য। এতে চাষিদের পরিবহন ব্যয় কমেছে, মাছ নষ্ট হওয়ার হারও কমেছে। ব্যবসায়ীরা তাজা মাছ নিয়ে নির্বিঘ্নে দেশের যেকোনো বাজারে যেতে পারছেন। বাজার যাচাই করে ন্যায্যমূল্যে মাছ বিক্রি করতে পারছেন। স্থানান্তরের প্রয়োজনে বিপুলসংখ্যক পরিবহন ও পরিবহনশ্রমিকের কাজের সুযোগ হচ্ছে। ভোক্তারা টাটকা মাছ খাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। ফরমালিনসহ ক্ষতিকর রাসায়নিকের প্রভাব থেকে রক্ষা পাচ্ছেন। পচা বা নষ্ট মাছ খাওয়া লাগছে না। 

নাটোর সদর উপজেলার প্রবীণ মাছচাষি গোলাম নবী। তিনি ১৯৮১ সাল থেকে মাছ চাষ করছেন। তাঁর ভাষ্য, আগে নাটোরের উদ্বৃত্ত মাছ ঢাকাসহ বাইরের জেলায় পাঠানো ছিল দুঃসাধ্য। যমুনা সেতু হওয়ার পর দূরের জেলাগুলোর সঙ্গে নাটোরের দূরত্ব কমে আসে। এর কয়েক বছর পর থেকে তাঁদের মধ্যে জীবন্ত মাছ বাজারজাত করার ধারণা জন্মে। পরিবহন খরচ ও সময় কমে আসায় জেলার ২৫ হাজার মাছচাষির মধ্যে অন্তত এক হাজার চাষি এই পদ্ধতিতে মাছ বাজারজাত করতে শুরু করেন। 

গোলাম নবী আরও বলেন, বর্তমানে প্রতিদিন অন্তত ৫০০ ট্রাক তাজা মাছ গাজীপুর, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, সিলেট, নোয়াখালীসহ বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়। এই পদ্ধতিতে মাছ বাজারজাত করে তাঁরা অনেক বেশি লাভবান হচ্ছেন। তবে তিনি একটা অসুবিধার কথাও বলেন। তাঁর অভিযোগ, সড়কে সক্রিয় একটি দুর্বৃত্ত চক্র কখনো কখনো ট্রাক থেকে মাছ লুট করে নিচ্ছে। পুলিশি হয়রানিও আছে। 

জেলার গুরুদাসপুর, সদর ও সিংড়া উপজেলা থেকে সবচেয়ে বেশি মাছ বাজারজাত হয়। গুরুদাসপুরের মহারাজপুরের মাছ ব্যবসায়ী জাকির হোসেন বলেন, শহরের বাজারে তাজা মাছ পৌঁছানোর কারণে মাছ কেনাবেচা বেড়েছে। শত শত মানুষের কর্মসংস্থান বেড়েছে। 

সদর উপজেলার অরুণ কুমার ঘোষ আশির দশক থেকে মাছ চাষ করেন। তিনি বলেন, তাজা মাছ বাজারজাতকরণ নাটোরের অর্থনীতিকে চাঙা করতে ভূমিকা রাখছে। তবে মাছের খাদ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি তাঁদের দুশ্চিন্তায় ফেলেছে। 

নাটোর সদর ও লালপুর উপজেলায় দীর্ঘদিন জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করছেন নাজিম উদ্দিন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, তাজা মাছ বাজারজাত করার ধারণাটা প্রথমে নাটোরের চাষিদের কাছ থেকেই আসে। প্রথমে সীমিত আকারে হলেও এখন প্রতিদিন অন্তত ৫০০ ট্রাক তাজা মাছ বিভিন্ন জেলায় যাচ্ছে। তবে নাটোরের পাশাপাশি এখন নওগাঁ ও রাজশাহী জেলা থেকেও তাজা মাছ অন্যত্র যাচ্ছে। 

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ওমর আলী বলেন, জীবন্ত মাছ বাজারজাত করার কর্মকাণ্ড এ অঞ্চলের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছে। ভোক্তাদের ফরমালিনমুক্ত মাছ উপহার দিচ্ছে। এটা সবার জন্যই ইতিবাচক।