যশোরে বিচারকের বিরুদ্ধে নালিশি দরখাস্ত, বাদীকে তুলে নেওয়ার অভিযোগ পুলিশের বিরুদ্ধে

যশোর যুগ্ম জেলা ও দায়রা আদালতছবি: সংগৃহীত

যশোর যুগ্ম জেলা ও দায়রা আদালতের এক বিচারকের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ তুলে নালিশি দরখাস্ত দাখিল করা শরিফুল আলম (৬২) নামের এক ব্যবসায়ীকে পুলিশের তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। আজ সোমবার দুপুরে আদালত চত্বরে এ ঘটনা ঘটে।

ব্যবসায়ী শরিফুল আলম মেসার্স এস আলম ট্রেডার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী। তিনি যশোর শহরের কাজীপাড়া এলাকার আবদুল আজিজ সড়কের বাসিন্দা। আইনজীবীরা বলেন, যশোর যুগ্ম জেলা ও দায়রা আদালতের বিচারক জজ রাশেদুর রহমানের বিরুদ্ধে মাহমুদা খানমের আদালতে দরখাস্ত দাখিল করেন শরিফুল আলম। পরে আদালত চত্বর থেকে তাঁকে পুলিশ আটক করে নিয়ে যায়।

বিষয়টি নিশ্চিত করে যশোর আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবদুল গফুর বলেন, ‘যশোর আদালতের বিচারক রাশেদুর রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অসদাচারণের অভিযোগ তুলে ব্যবসায়ী শরিফুল আলম আদালতের জেলা ও দায়রা জজের কাছে নালিশি আবেদন করেন। রাশেদুর রহমান এতে ক্ষুব্ধ হয়ে পুলিশ দিয়ে শরিফুল আলমকে আটক করান, যা নজিরবিহীন।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মেসার্স এস আলম নামের প্রতিষ্ঠানের মালিক শরিফুল আলমের বিরুদ্ধে ব্যবসাসংক্রান্ত ঋণের বিষয়ে শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসি যশোর শাখা চেক জালিয়াতির একটি মামলা করে। মামলাটি যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ প্রথম আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, আইনবহির্ভূত বিভিন্ন আদেশ প্রদান, আইনজীবীদের সঙ্গে অসদাচরণ এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে গত ৪ মার্চ যশোর জেলা আইনজীবী সমিতি ভারপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ এবং যুগ্ম জেলা জজ রাশেদুর রহমানের আদালত বর্জনের ঘোষণা দেয়। এর পর থেকে আইনজীবীদের অনুপস্থিতিতেই সংশ্লিষ্ট আদালতের বিচারিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়। বাদী শরিফুল আলমের বিরুদ্ধে মামলাটি আদালতে বিচারাধীন ছিল। ৩০ মার্চ ওই ব্যবসায়ী আইনজীবীদের কর্মবিরতি চলাকালে সশরীর আদালতে উপস্থিত হয়ে সময়ের আবেদন জানান।

নালিশি অভিযোগে বলা হয়, বিচারক রাশেদুর রহমান সেই আবেদন নামঞ্জুর করে বাদীর বক্তব্য একতরফাভাবে গ্রহণ করেন এবং আইনবহির্ভূতভাবে সাক্ষ্যগ্রহণ সমাপ্ত করে যুক্তিতর্কের দিন ধার্য করেন। বিচারক ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে যথাযথ দায়িত্ব পালন না করে দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়েছেন। এ বিষয়ে বাদী সংশ্লিষ্ট থানা ও দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ দিলেও তা গৃহীত না হওয়ায় তিনি আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন।

শরিফুল আলমের নালিশি দরখাস্তের বিষয়ে জানতে চাইলে আইনজীবী দেবাশীষ দাস বলেন, অর্থঋণের একটি মামলায় যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ রাশেদুর রহমান বিবাদী ব্যবসায়ী শরিফুল আলমের বিরুদ্ধে একতরফা আদেশ দিয়েছেন। ওই আদেশের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ হয়ে শরিফুল আলম যশোর জেলা ও দায়রা জজ আদালতের কাছে নালিশি দরখাস্ত করেন। কিন্তু আদালতের জেলা ও দায়রা জজ মাহমুদা খানম নালিশি দরখাস্ত আমলে নেননি। তিনি উন্মুক্ত এজলাসে আইনজীবীদের উদ্দেশে বলেন, যুগ্ম জেলা জজ রাশেদুর রহমানকে ডেকে এ বিষয়ে জানতে চাইবেন। তাঁকে যেন আর যশোর আদালতে না রাখা হয়, সে বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলবেন।

জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবদুল গফুর বলেন, ‘এই নালিশি দরখাস্ত দাখিলের পর আমার ব্যক্তিগত গাড়িতে করে ব্যবসায়ী শরিফুল আলমকে নিরাপদে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছিল। তখন দুপুরের দিকে একটি মোটরসাইকেলে দুজন পুলিশ সদস্য গাড়িটির গতি রোধ করে আদালতের সামনে থেকে শরিফুল আলমকে তুলে নিয়ে যান।’

এ বিষয়ে ব্যবসায়ী শরিফুল আলমের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

আটকের বিষয়টি পুলিশ অস্বীকার করেছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে যশোরের পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিষয়টি শুনেছি। অপরাধসংক্রান্ত বৈঠকে থাকায় এ বিষয়ে যথাযথ খোঁজখবর নিতে পারিনি।’

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবুল বাশার প্রথম আলোকে বলেন, ‘যশোর জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবদুল গফুর সাহেব এমন অভিযোগ করলেও বাস্তবে পুলিশ এমন কাউকে আটক করেনি। এ বিষয়ে আমরা ব্যবসায়ী শরিফুল আলমের বাড়িতে পুলিশ সদস্য পাঠিয়ে খোঁজখবর নেওয়ার চেষ্টা করছি।’