মৌখিক পরীক্ষায় নম্বর বাড়ানোর প্রস্তাবের প্রতিবাদে তিন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ

সরকারি চাকরিতে মৌখিক পরীক্ষায় নম্বর বাড়ানোর প্রস্তাবের প্রতিবাদে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের মানববন্ধন। বুধবার বিশ্ববিদ্যালয়ের গোল চত্বরেছবি: প্রথম আলো

সরকারি চাকরির ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারী নিয়োগের মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বাড়ানোর প্রস্তাবের প্রতিবাদে কুমিল্লা, রাজশাহী ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেছেন শিক্ষার্থীরা।

আজ বুধবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে মানববন্ধন এবং গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ও রাতে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল করেন।

মানববন্ধন ও মিছিল-পরবর্তী সমাবেশে সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি ইসলামী ছাত্রশিবির, জাতীয় ছাত্রশক্তিসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতা-কর্মীরা বক্তব্য দেন। এসব কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীরা ‘ভিক্ষা লাগলে ভিক্ষা নে, মেধাবীদের মুক্তি দে’, ‘ভাইভা কোটার বিরুদ্ধে, ডাইরেক্ট অ্যাকশন’, ‘মামা-খালুর সুপারিশ, চলবে না চলবে না’, ‘কণ্ঠে আবার লাগা জোর, ভাইভা প্রথার কবর খোঁড়’, ‘ভাইভার নামে দলীয়করণ, বন্ধ কর, করতে হবে’ ইত্যাদি স্লোগান দেন।

আরও পড়ুন

সম্প্রতি ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারী নিয়োগের মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বাড়ানোর পাশাপাশি লিখিত পরীক্ষায় পাস নম্বর কমিয়ে বিধিমালা পরিবর্তনের নানা খবর এসেছে। এ নিয়ে গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেন, কোনো বিশেষ উদ্দেশ্যে বা বৈষম্য সৃষ্টির জন্য নয়; বরং দক্ষ-যোগ্য প্রশাসনিক জনবল নিশ্চিত করতেই সরকারি চাকরিতে (১১ থেকে ২০মত গ্রেডে কর্মচারী নিয়োগে) মৌখিক পরীক্ষার নম্বরে পরিবর্তন এনেছে সরকার।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়

মৌখিক পরীক্ষায় নম্বর বাড়ানোর প্রস্তাবের প্রতিবাদে আজ বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কুমিল্লার বিশ্ববিদ্যালয়ের গোল চত্বরে মানববন্ধন করেন বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি ছাত্রসংগঠনের নেতারাও অংশ নেন।

মানববন্ধনে আইন বিভাগের শিক্ষার্থী বায়েজিদ হোসেন বলেন, ‘সরকারি চাকরিতে বৈষম্য ও দলীয়করণের মাধ্যমে ভাইভার নামে কোটা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। আমরা দেখতে পাচ্ছি, বর্তমান সরকার ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটাচ্ছে। যে জুলাই অভ্যুত্থান শুরু হয়েছিল কোটা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে, সেই বৈষম্যের পথেই আবার দেশকে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। এসব বন্ধ না হলে আমরা কঠোর আন্দোলনে যেতে বাধ্য হব।’

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের মানববন্ধন। বুধবার বিশ্ববিদ্যালয়ের গোল চত্বরে
ছবি: প্রথম আলো

জাতীয় ছাত্রশক্তির বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সদস্যসচিব সৈয়দা নাজিফা নাফিল বলেন, তাঁরা সব সময় মেধার ভিত্তিতে সরকারি চাকরিতে নিয়োগের দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্তু মৌখিক পরীক্ষায় নম্বর বাড়ানোর প্রস্তাবের মাধ্যমে নতুন করে বৈষম্য তৈরির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

শাখা ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের পর আবার বৈষম্যের পথ বেছে নেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ভাইভায় নম্বর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত থেকে সরকারকে সরে আসতে হবে। তা না হলে এই প্রতিবাদ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়বে। সরকারি চাকরিতে মেধার যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে।’

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

একই ঘটনার প্রতিবাদে গতকাল সন্ধ্যা সোয়া সাতটার দিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে থেকে মিছিল বের করেন শিক্ষার্থীরা। মিছিলটি ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে একই স্থানে ফিরে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে মিলিত হয়।

সমাবেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘কোটার বিরুদ্ধে আন্দোলনের পর ‎এবার ভাইভা নামের কোটা আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ছাত্রবিরোধী সিদ্ধান্ত নিয়ে শেখ হাসিনা এই দেশে টিকতে পারেনি। ছাত্রসমাজ এই সিদ্ধান্ত মেনে নেবে না। শিক্ষার্থীবান্ধব কোনো সিদ্ধান্ত না এলে আমরা কঠিন কর্মসূচিতে যাব।’

মৌখিক পরীক্ষায় নম্বর বাড়ানোর প্রস্তাবের প্রতিবাদে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ মিছিল। গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার–সংলগ্ন সড়কে
ছবি: প্রথম আলো

মৌখিক পরীক্ষায় বেশি নম্বর থাকলে দক্ষ জনশক্তি মূল্যায়ন পাবে না বলে মনে করেন আসাদুজ্জামান নূর নামের এক শিক্ষার্থী। তিনি প্রজ্ঞাপন হওয়ার আগেই সরকারকে এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার আহ্বান জানান।

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

এদিকে গতকাল রাত ১০টার দিকে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের জিয়া মোড় থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন শিক্ষার্থীরা। ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে তাঁরা প্রধান ফটকে গিয়ে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করেন। এতে ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের সভাপতি ইসমাইল হোসেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা মুবাশশির আমিন, শাখা ছাত্রশক্তির সদস্যসচিব ইফতেহার উদ্দিন, শাখা ছাত্রশিবিরের ছাত্র অধিকার সম্পাদক নাহিদ হাসান, শাখা ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী মো. সবুজ, শিক্ষার্থী রফিক আল হাসান প্রমুখ বক্তব্য দেন।

নিয়োগ পরীক্ষায় মৌখিক অংশে নম্বর বাড়ানোর প্রস্তাবের প্রতিবাদে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ। মঙ্গলবার রাতে ক্যাম্পাসে
ছবি: প্রথম আলো

সমাবেশে শিক্ষার্থী রফিক আল হাসান বলেন, ভাইভার নম্বর বাড়ানোর প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে মেধাবীরা বঞ্চিত হবেন। এতে দুর্নীতি বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে। চাকরিতে ১১ থেকে ২০তম গ্রেডে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিরা মাঠপর্যায়ে কাজ করেন। সেখানে দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা নিয়োগ পেলে দেশের বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে। সরকারের উচিত এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা।

স্বজনপ্রীতির উদ্দেশ্যেই সরকার এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন শাখা ছাত্রশক্তির সদস্যসচিব ইফতেহার উদ্দিন। অন্যদিকে শাখা ছাত্রশিবিরের ছাত্র অধিকার সম্পাদক নাহিদ হাসান বলেন, ‘ভাইভার নম্বর বৃদ্ধির উদ্দেশ্য দলীয় ক্যাডারদের চাকরি দেওয়া। যারা দীর্ঘদিনেও অনার্স শেষ করতে পারেনি এবং যারা ভাইভা বোর্ডে টাকা নিয়ে উপস্থিত হবে, তাদের চাকরি দেওয়ার জন্যই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার না হলে ক্যাম্পাসে গণ-আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।’

[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন নিজস্ব প্রতিবেদক, কুষ্টিয়া এবং প্রতিনিধি, কুমিল্লা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়)