বরিশালে যাত্রা শুরু করল ঐতিহ্যবাহী বিলাসবহুল নৌতরি ‘কুইন অব উলানিয়া’

বরিশালের নদীভিত্তিক পর্যটনের জন্য উদ্বোধন করা হয়েছে কাঠের তৈরি ঐতিহ্যবাহী বিলাসবহুল নৌতরি ‘কুইন অব উলানিয়া’। গত শুক্রবারছবি: প্রথম আলো

কীর্তনখোলা নদীর বুকে যাত্রা শুরু করল ঐতিহ্যবাহী কাঠের বিলাসবহুল নৌতরি ‘কুইন অব উলানিয়া’। বরিশালের নদীভিত্তিক পর্যটনে নতুনমাত্রা যোগ করার পাশাপাশি নদীকেন্দ্রিক ঐতিহ্যকে নতুনভাবে তুলে ধরাই এই উদ্যোগের লক্ষ্য।

প্রথমবারের মতো বরিশালের নদীভিত্তিক পর্যটনের জন্য উদ্বোধন করা হয়েছে কাঠের তৈরি ঐতিহ্যবাহী বিলাসবহুল নৌতরি কুইন অব উলানিয়া। কীর্তনখোলা নদীর বুক চিরে যাত্রা শুরু করা এই নৌযান শুধু একটি পর্যটন তরিই নয়; সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, এটি নদীকেন্দ্রিক সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, স্বাস্থ্যসেবা ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে নতুনভাবে ভাবারও একটি উদ্যোগ।

গত শুক্রবার বিকেলে কীর্তনখোলা নদীতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে কুইন অব উলানিয়ার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার। উদ্বোধনের পর তিনি অতিথিদের নিয়ে নৌযানে করে কীর্তনখোলা নদীতে ভ্রমণ করেন। নদীর দুই তীরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ শেষে নৌযানটি আবার বরিশাল নদীবন্দরে ফিরে আসে।

এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, নদী ও সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে দক্ষিণাঞ্চলে পর্যটনের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। সরকার পর্যটনকে আরও জনপ্রিয় করতে ‘একটি গ্রাম, একটি পণ্য’ কর্মসূচির আদলে ‘সাংস্কৃতিক গ্রাম’ গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছে। বরিশাল ও ঝালকাঠির মৃৎশিল্প, পাটিশিল্প এবং স্থানীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করে একটি প্রকল্প ইতিমধ্যে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকে (এডিবি) পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া ঝালকাঠির ভাসমান পেয়ারাবাগান, বরিশাল ও ভোলার নদ-নদী এবং দক্ষিণাঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ঘিরে আন্তর্জাতিক মানের নদীভিত্তিক পর্যটন গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। বেসরকারি উদ্যোগে নির্মিত কুইন অব উলানিয়া একটি সময়োপযোগী ও ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। এ ধরনের আরও বিনিয়োগ এগিয়ে আসবে এবং বরিশাল নদীভিত্তিক পর্যটনের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠবে।

কুইন অব উলানিয়ার উদ্যোক্তা সৈয়দ রাজিউর রহমান চৌধুরী জানান, নৌযানটির ইতিহাসও বেশ ব্যতিক্রমী। তিনি বলেন, ‘২০২৫ সালের ২৭ জুন কুষ্টিয়া থেকে ঐতিহ্যবাহী কাঠের নৌকাটি সংগ্রহ করা হয়। পরে প্রায় এক বছর ধরে সংস্কার ও আধুনিকায়নের মাধ্যমে ২০২৬ সালের ১৪ এপ্রিল এটিকে চলাচলের উপযোগী করা হয়। আমরা ঐতিহ্য ধরে রাখতেই নৌযানটির অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জা ও আসবাবে কাঠ, বাঁশ ও দেশীয় উপকরণের ব্যবহার করেছি। এটাকে শুধু একটি পর্যটন ভ্রমণতরি বলব না, বরং আমাদের নদীকেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতীক।’

সৈয়দ রাজিউর রহমান জানান, পর্যটনের পাশাপাশি দুর্গম চরাঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ারও লক্ষ্য রয়েছে তাঁদের। ভবিষ্যতে এই নৌযান ব্যবহার করে ফ্রি মেডিক্যাল ক্যাম্প, চক্ষু চিকিৎসা (আই ক্যাম্প), কিডনি স্বাস্থ্যসেবাসহ বিভিন্ন মানবিক কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে।

দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তীর্ণ নদী, চর, দ্বীপ, ভাসমান কৃষি, মৎস্যসম্পদ ও লোকজ সংস্কৃতি বহুদিন ধরেই পর্যটন বিশেষজ্ঞদের আগ্রহের কেন্দ্র। কিন্তু প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও বিনিয়োগের অভাবে এ সম্ভাবনার বড় অংশ এখনো কাজে লাগানো যায়নি।

পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, কুইন অব উলানিয়ার মতো উদ্যোগ সফল হলে বরিশাল, ভোলা, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, বরগুনা ও পটুয়াখালী ঘিরে নদীপথে নতুন পর্যটন রুট গড়ে উঠতে পারে। এতে কর্মসংস্থান বাড়বে। পাশাপাশি স্থানীয় হস্তশিল্প, লোকসংস্কৃতি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারাও উপকৃত হবেন।