ব্রহ্মপুত্র নদের বুকে জেগে ওঠা চর। গ্রামীণ আবহে সাজিয়ে করা হয়েছে বৈশাখের আয়োজন। এ আয়োজনের মধ্য দিয়ে প্রায় সাত বছর আগে খনন শুরু হওয়া ব্রহ্মপুত্র নদের রুগ্ণদশাকে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়। কবিতা, গান ও কথায় জানানো হয় প্রতিবাদ ও ব্রহ্মপুত্রকে বাঁচানোর আকুতি।
ময়মনসিংহ নগরের কাচারিঘাটের কাছাকাছি এলাকায় আজ মঙ্গলবার বৈশাখের ব্যতিক্রমী আয়োজন করা হয়। পরম্পরা নামের একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন এ আয়োজন করে। এর আগে ২০২৩ সালে ‘মৃতের চিৎকার’ শিরোনামে ব্রহ্মপুত্র নদকে বাঁচাতে ব্যতিক্রমী আয়োজন করেছিল সংগঠনটি।
জেগে ওঠা চরটির তিন দিকে পানি। সেখানে পুঁতে রাখা বাঁশে কাগজের চরকি লাগানো হয়। সুতায় রঙিন কাগজ লাগিয়ে সাজানো হয়। পানিতে পুঁতে দেওয়া তালপাতায় সামনে লেখা ‘বৈশাখ মাসে তার হাঁটুজল থাকে’। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতাকে উপজীব্য করে আয়োজন হয় অনুষ্ঠানের। অনুষ্ঠানস্থলে ককসিট দিয়ে একটি গরু তৈরি করে সেটি হাঁটুজলে স্থাপন করা হয়। এর মধ্য দিয়ে ব্রহ্মপুত্রের দুরবস্থা তুলে ধরা হয়।
ব্রহ্মপুত্রের জেলে আজিজুল হকের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে মঙ্গলবার দুপুর ১২টার দিকে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। আজিজুল হক বলেন, ‘আমাদের আগের ব্রহ্মপুত্র আর নেই। এই নদের কী পরিমাণ মাছ পাওয়া যেত আর এখন সারা দিন জাল ফেলেও মাছ মেলে হাতে গোনা। আমরা আগের ব্রহ্মপুত্র ফেরত চাই।’
পরম্পরার সভাপতি শামীম আশরাফ বলেন, ‘পয়লা বৈশাখ আমরা নানাভাবে পালন করি। কিন্তু ময়মনসিংহের মানুষের জন্য ব্রহ্মপুত্র হচ্ছে প্রাণকেন্দ্র। এই প্রাণকেন্দ্র ছেড়ে আমরা যখন পাড়ে ঘুরি, তখন ব্রহ্মপুত্রের ভেতরে যে ব্যথা আছে, তা অনুভবে আনি না বা অনুভবে আনলেও কি-বা করার থাকে? দীর্ঘ সময় ধরে খননকাজ চললেও কাজের কাজ হচ্ছে না। বরং ব্রহ্মপুত্রের মাঝখানে চর জেগে উঠছে আরও বেশি। তাই ব্রহ্মপুত্রের বুকের চরেই আমরা বৈশাখী উৎসব পালন করি।’
বৈশাখের এ আয়োজনে কবিতা আবৃত্তি, গান ও কলাপাতায় পান্তা খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয় জেগে ওঠা চরেই। অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া আন্দোলনকর্মী মমিনুর রহমান বলেন, ‘দেশে দুর্নীতি করতে করতে সবকিছু খেয়ে ফেলছে, বাকি শুধু নদী। এটাও প্রায় শেষ পর্যায়ে। নদী যেন বাঁচে, সে জন্যই বৈশাখী আয়োজনের ভেতর দিয়ে আমাদের প্রতিবাদ।’
অনুষ্ঠানে কবিতা পড়েন কবি শরৎ সেলিম। আরও বক্তব্য দেন লেখক সীমান্ত জসিম, কবি ফাহিম ফারুক প্রমুখ।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ২ হাজার ৭৬৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ব্রহ্মপুত্র নদের খননকাজ করছে। গাইবান্ধা, জামালপুর, ময়মনসিংহ, শেরপুর ও কিশোরগঞ্জ—এই পাঁচ জেলায় নদের ২২৭ কিলোমিটার অংশ খনন করার কথা। ২০১৯ সালের জুন থেকে শুরু হওয়া এ প্রকল্প ২০২৪ সালে জুনে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কাজ শেষ না হওয়ায় সময় প্রথম দফায় সময় বাড়ানো হয়েছে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত।
বিআইডব্লিউটিএর নির্বাহী প্রকৌশলী মহসিন মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, ইতিমধ্যে প্রকল্পটির ৪৬ শতাংশ কাজ হয়েছে। কিন্তু খননের সুফল মিলছে না ব্রহ্মপুত্র-যমুনার উৎসমুখ গাইবান্ধা ও জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ এলাকায় প্রায় ৪০ কিলোমিটার এলাকা খনন না করতে পারায়। উৎসমুখ খনন করতে না পারলে কোনো সুফল আসবে না ব্রহ্মপুত্রে।