লোডশেডিংয়ে কারখানার উৎপাদন ব্যাহত, গরমে অতিষ্ঠ জনজীবন

নারায়ণগঞ্জে প্রতিদিন পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের কারণে কলকারখানায় উৎপাদনে প্রভাব পড়ছে। রোববার দুপুরে নারায়ণগঞ্জের পঞ্চবটি বিসিক শিল্প নগরীর একটি কারখানায়ছবি: প্রথম আলো

নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার কেওঢালা এলাকার ডাইং কারখানা ‘টোটাল ফ্যাশন লিমিটেড’। কারখানাটিতে গতকাল শনিবার দুপুর থেকে আজ রোববার দুপুর পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎ ছিল না। লোডশেডিংয়ের কারণে কারখানার উৎপাদন কমে গেছে। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী উৎপাদন করতে না পারায় লোকসানের মুখে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

কারখানাটির প্রশাসনিক কর্মকর্তা কবিরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, লোডশেডিংয়ের কারণে কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। লোডশেডিং মোকাবিলায় চাহিদামতো ডিজেলও পাওয়া যাচ্ছে না। বিদ্যুৎ ও গ্যাস–সংকটের কারণে কারখানার উৎপাদন ১০ টন থেকে কমে দুই টনে দাঁড়িয়েছে।

নারায়ণগঞ্জের পাঁচটি উপজেলার মধ্যে বন্দর, সোনারগাঁ, আড়াইহাজার ও রূপগঞ্জে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে নারায়ণগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ ও নারায়ণগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২। নারায়ণগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর প্রতিদিন ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা হলেও ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কম পাওয়া যাচ্ছে। অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর ২০০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে মিলছে ১৪০ মেগাওয়াট। চাহিদামতো বিদ্যুৎ না পাওয়ায় ঘাটতি মোকাবিলায় লোডশেডিং দেওয়া হচ্ছে।

নারায়ণগঞ্জের মতো গাজীপুরে পল্লী বিদ্যুতের আওতাধীন এলাকায় তীব্র লোডশেডিং দেখা দিয়েছে। শহরের বাইরের এলাকায় দিনে-রাতে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। লোডশেডিংয়ের মধ্যে প্রচণ্ড গরমে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে জনজীবন।

নারায়ণগঞ্জ: একবার গেলে ‘দুই ঘণ্টা লোডশেডিং’

চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় নারায়ণগঞ্জে পল্লী বিদ্যুতের আওতাধীন এলাকাগুলোতে একবার বিদ্যুৎ চলে গেলে এক থেকে দুই ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। কোথাও কোথাও লোডশেডিংয়ের পরিমাণ আরও বেশি। এতে শিল্প উৎপাদনের পাশাপাশি বোরো মৌসুমে কৃষিজমিতে সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

বন্দরের মালিবাগ এলাকার বাশার পেপারস লিমিটেড কারখানায় প্রতিদিন ১৫ টন কার্টনের কাগজ তৈরি করা হয়। কিন্তু লোডশেডিংয়ের কারণে তাদের উৎপাদন কমে কমে ৮ থেকে ৯ টনে নেমে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক গোলাম মোস্তফা প্রথম আলোকে বলেন, প্রতিদিন ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। একবার বিদ্যুৎ চলে গেলে এক থেকে দুই ঘণ্টা লোডশেডিং থাকছে। এতে তাঁদের উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে। জেনারেটর চালিয়ে উৎপাদন চালু রাখা সম্ভব হলেও ডিজেল–সংকটে সেটাও সম্ভব হচ্ছে না।

জানতে চাইলে নারায়ণগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর জ্যেষ্ঠ মহাব্যবস্থাপক শেখ মোহাম্মদ আলী প্রথম আলোকে বলেন, প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ লোডশেডিং দেওয়া হচ্ছে। চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ না থাকায় ঘাটতি মোকাবিলায় লোডশেডিং দিতে হচ্ছে।

এদিকে নারায়ণগঞ্জের পঞ্চবটী বিসিক শিল্পনগরীতেও লোডশেডিংয়ের কারণে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে বলে ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছেন। এলাকাটি ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি) নারায়ণগঞ্জের আওতাধীন। তবে প্রতিষ্ঠানটির তথ্যমতে, নারায়ণগঞ্জে তাদের প্রতিদিন বিদ্যুতের চাহিদা ৫০৯ মেগাওয়াট। তারা চাহিদার পুরোটাই সরবরাহ করছে।

বাংলাদেশ নিটিং ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সেলিম সারোয়ার প্রথম আলোকে বলেন, লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুৎ না থাকলে জেনারেটর ও গাড়ির মালামাল পরিবহনে পাম্পগুলোতে ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না।

ডিপিডিসির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী কামাল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, চাহিদামতো বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। কোথাও লোডশেডিং নেই। তাঁর দাবি, রক্ষণাবেক্ষণ ও কারিগরি সমস্যার কারণে কিছু ক্ষেত্রে সাময়িকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকতে পারে, সেটা লোডশেডিং নয়।

নারায়ণগঞ্জের বন্দরে লোডশেডিংয়ের কারখানায় ডাইং কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। রোববার দুপুরে একটি কারখানায়
ছবি: প্রথম আলো

গাজীপুর: ‘গড়ে ৭ ঘণ্টা লোডশেডিং’

গাজীপুর মহানগরের কুনিয়া গাছা সড়কের আম্মাজান হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টের মালিক আজিজুল হক। তিনি বলেন, কয়েক দিন ধরে তাপমাত্রার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে লোডশেডিং। প্রতিদিন ভোরে হোটেল খোলেন এবং বন্ধ করেন রাত ১১টায়। এ সময়ের মধ্যে অন্তত ছয় থেকে সাতবার বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করে।

শহরের পাশে লক্ষ্মীপুরা এলাকার গৃহিণী সখিনা বেগম বলেন, শনিবার সন্ধ্যার পর ছেলেকে নিয়ে পড়ার টেবিলে বসতেই বিদ্যুৎ চলে যায়। ফ্যান বন্ধ হয়ে গেলে গরমে টিকে থাকা কঠিন হয়ে যায়। প্রায় সোয়া এক ঘণ্টা পর বিদ্যুৎ এলেও কিছুক্ষণ পর আবার চলে যায়। এভাবে রাতভর কয়েক দফা বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করেছে। এতে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।

গাজীপুর শহর এলাকায় তুলনামূলকভাবে লোডশেডিং কম হলেও শহরের বাইরে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর আওতাধীন এলাকায় দিনে-রাতে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এই সমিতি গাজীপুর শহর ছাড়াও কালিয়াকৈর, শ্রীপুর, কালীগঞ্জ ও কাপাসিয়া উপজেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করে।

পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি সূত্রে জানা গেছে, গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর মোট বিদ্যুতের চাহিদা ৪৮৪ মেগাওয়াট, যেখানে সরবরাহ মিলছে ৩১২ মেগাওয়াট। ঘাটতি ১৭২ মেগাওয়াট বাধ্য হয়ে লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। অন্যদিকে সমিতি-২-এর আওতাধীন এলাকায় চাহিদা ১৪০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে লোডশেডিং হচ্ছে ৫০ মেগাওয়াট। ময়মনসিংহ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর আওতাধীন শ্রীপুর ও মাওনা অঞ্চলে ১৫০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ মেগাওয়াট। অন্যদিকে ঢাকা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর অধীন কালিয়াকৈর উপজেলায় চাহিদা ২০০ মেগাওয়াট, বিপরীতে পাওয়া যাচ্ছে ১২০ মেগাওয়াট। চার শতাধিক শিল্পকারখানা থাকা এ এলাকায় প্রতিদিন ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা লোডশেডিং থাকছে।

কাপাসিয়ার ঘাগটিয়া ইউনিয়নের খিরাটি গ্রামের কৃষক আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘গরম বাড়ার লগে লগে বিদ্যুতের অবস্থা আরও খারাপ হইয়া গেছে। শনিবার দুপুর ১২টার পর থেইকা টানা দুই থেকে তিন ঘণ্টা কারেন্ট নাই। এরপর একটু আসলেও বিকাল চারটা থেইকা আবার সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত কারেন্ট নাই। ১২ ঘণ্টার মইধ্যে ৭-৮ ঘণ্টাও ঠিকমতো কারেন্ট পাই নাই। কারেন্টের লাইগা ঠিকমতো খেতে পানি দিতে পারতাছি না।’

আজ জাতীয় সংসদে গাজীপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য মু. সালাহউদ্দিন আইউবী বলেন, কাপাসিয়ায় ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে, হাসপাতালে রোগীরা ভোগান্তিতে পড়ছেন এবং সেচব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। দ্রুত সমস্যার সমাধান না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।

গাজীপুরে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান পল্লী বিদ্যুতের মহাব্যবস্থাপক মো. আবুল বাশার আজাদ প্রথম আলোকে বলেন, গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন এলাকায় বিদ্যুতের চাহিদা ৪৮৪ মেগাওয়াটের, চরিত্রানুযায়ী বিদ্যুৎ না পাওয়ায় লোডশেডিং একটু বেশি দিতে হচ্ছে। কেন্দ্রীয়ভাবে তাঁদের বলা হয়েছে, ‘আপনারা গ্রাহকদের একটু বোঝান, খুব তাড়াতাড়ি বিদ্যুতের অবস্থার উন্নতি হবে।’