আমন ধান চাষের খরচ ওঠা নিয়ে দুশ্চিন্তায় কৃষক
গত বছর এক বিঘা জমিতে আমন ধানের চাষ করতে সব মিলিয়ে খরচ হয়েছে ১৫-১৮ হাজার টাকা। এবার তা বেড়ে হবে ১৮-২১ হাজার টাকা।
কৃষক হাফিজুর রহমানের ফসলি জমি ছয় বিঘা। এর মধ্যে এবার পাঁচ বিঘা ( ৪২ শতকে এক বিঘা) জমিতে আমন ধানের চাষ করেছেন তিনি। ধানের চারা রোপণের দুই মাস পার হয়েছে। এবার ডিজেল, সার, কৃষিশ্রমিকের মজুরি ও কীটনাশকের দাম বাড়তি। সেই তুলনায় বাজারে ধানের দাম কম। ফলে খরচ ওঠা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তিনি।
হাফিজুরের বাড়ি যশোরের মনিরামপুর উপজেলার দোনার গ্রামে। গত ২৩ সেপ্টেম্বর সকালে তাঁর সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, প্রথম দফায় ১৯ এপ্রিল ডিজেলের দাম বাড়ায় আমন ধান চাষে তাঁর খরচ বেড়ে যায়। পাঁচ মাসের মাথায় দ্বিতীয় দফায় গত ২০ সেপ্টেম্বর ডিজেলের দাম আবারও বাড়ে। এ ছাড়া সব কৃষি উপকরণের দাম বাড়তি। তাই এবার বিঘাপ্রতি খরচ দুই থেকে তিন হাজার টাকা বেড়ে যাবে। বাজারে ধানের দাম মণপ্রতি গড়ে ১ হাজার ৫০ টাকা। খরচ উঠবে কি না, সেই চিন্তায় আছেন।
হাফিজুরের মতো যশোর সদর, মনিরামপুর, ঝিকরগাছা ও অভয়নগর উপজেলার বিভিন্ন এলাকার ১৫ জন কৃষকের সঙ্গে কথা হয় প্রথম আলোর। তাঁরাও আমন ধান চাষের খরচ ওঠা নিয়ে উদ্বেগের কথা জানান।
ওই সব কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এবার সব ধরনের সার বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। ফলে গত বছরের চেয়ে এবার বিঘাপ্রতি সারে খরচ বাড়ছে গড়ে এক হাজার টাকা। ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় জমি চাষে ট্রাক্টর খরচ বেড়েছে। আমন ধানের জন্য সাধারণত জমিতে চারটি চাষ লাগে। গত বছর প্রতি চাষে খরচ ছিল ৩০০ টাকা। ডিজেলের দাম বাড়ায় এবার ৩৫০ টাকা করে চাষ দিতে হয়েছে। ৫০ টাকা বাড়তি হিসাবে চারটি চাষে খরচ বেড়েছে ২০০ টাকা। গত বছর শ্রমিকের দিনমজুরি ছিল জনপ্রতি ৪০০ টাকা। এবার জনপ্রতি মজুরি খরচ ১০০ টাকা বেড়ে হয়েছে ৫০০ টাকা। বিঘাপ্রতি জমিতে সাধারণত ধানের চারা রোপণ ও নিড়ানিতে ১০ জন শ্রমিক লাগে। সে হিসাবে বিঘাপ্রতি শ্রমিকের মজুরি খরচ বেড়েছে এক হাজার টাকা। গত বছরের চেয়ে এবার বিঘাপ্রতি জমিতে কীটনাশক খরচ গড়ে বেড়েছে ৫০০ টাকা। সব মিলিয়ে বিঘাপ্রতি খরচ বেড়েছে ২ হাজার ৭০০ টাকা। তবে কোনো জমিতে যদি সেচের প্রয়োজন পড়ে, সে ক্ষেত্রে কৃষকের বিঘাপ্রতি খরচ আরও বেড়ে যাবে।
সাধারণত বোরো আবাদে সেচ লাগে। ফলনও বেশি হয়। আর আমন আবাদে সাধারণত সেচ লাগে না। বোরোর তুলনায় আমনের ফলন অনেক কম। তবে বেশি উঁচু জমি বা প্রচণ্ড খরা দেখা দিলে আমনেও সেচের প্রয়োজন পড়ে। আমন ধানের চারা রোপণের সময় মধ্য জুলাই থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত। জমি প্রস্তুতের সময় টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সার দিতে হয়। চারা রোপণের পর জুলাই ও আগস্ট মাসে ইউরিয়ার ব্যবহার হয় সবচেয়ে বেশি। এরপর ইউরিয়ার চাহিদা কমতে থাকে।
২ হাজার ২০০ টাকা দিয়ে এক বস্তা টিএসপি, ১ হাজার ২০০ টাকা দিয়ে এক বস্তা এমওপি এবং ১ হাজার ৪০০ টাকা করে দুই বস্তা ইউরিয়া কিনে খেতে দিয়েছি। ধান চাষ করে আর বাঁচা যাচ্ছে না।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, কৃষক পর্যায়ে সরকারনির্ধারিত প্রতি বস্তা (৫০ কেজি) টিএসপি সারের খুচরা মূল্য ১ হাজার ৩৫০ টাকা (কেজি প্রতি ২৭ টাকা), এমওপি ১ হাজার টাকা (কেজি প্রতি ২০ টাকা) এবং ডিএপি ১ হাজার ৩৫০ টাকা (কেজি প্রতি ২৭ টাকা)। প্রতি বস্তা (৫০ কেজি) ইউরিয়া সারের খুচরা মূল্য ১ হাজার ৩৫০ টাকা।
অনুমোদিত সার পরিবেশকের বিক্রয়কেন্দ্রে হয়রানি এড়াতে বাজারের খুচরা ব্যবসায়ীর কাছ থেকে বেশি দামে সার কিনতে হয়েছে যশোর সদর উপজেলার জলকর গ্রামের কৃষক অলিয়ার রহমানকে। গত ২৩ সেপ্টেম্বর দুপুরে ধানখেতে কীটনাশক ছিটিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন তিনি। জলকর গ্রামের বিল জলেশ্বরের মধ্যে চিত্রা নদীর সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে তাঁর সঙ্গে কথা হয়। এ সময় তিনি প্রথম আলোকে বলেন, দুই বিঘা ছয় কাঠা জমিতে তিনি আমন ধানের চাষ করেছেন। এর মধ্যে নিজের জমি মাত্র আট কাঠা। বাকি জমি বন্ধক (বর্গা) নেওয়া। ২ হাজার ২০০ টাকা দিয়ে এক বস্তা টিএসপি, ১ হাজার ২০০ টাকা দিয়ে এক বস্তা এমওপি এবং ১ হাজার ৪০০ টাকা করে দুই বস্তা ইউরিয়া কিনে খেতে দিয়েছেন। ধান চাষ করে আর বাঁচা যাচ্ছে না।
সদর উপজেলার ভায়না গ্রামের কৃষক তোফাজ্জেল মোল্যা তিন বিঘা জমিতে আমন চাষ করেছেন। এর মধ্যে দুই বিঘা জমি বর্গা এবং এক বিঘা তাঁর নিজের। তিনি বলেন, সরকার সারের যে দাম নির্ধারণ করেছে, বাজারে দাম তার চেয়ে অনেক বেশি। চাষাবাদ ছেড়ে দেওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই।
যশোর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, জেলায় এবার আমন ধান চাষ হয়েছে ১ লাখ ৩৩ হাজার হেক্টর জমিতে। ৩৩ শতকে বিঘা ধরে আমন ধান চাষে ইউরিয়া সার ৩০ কেজি, টিএসপি ১৫ থেকে ২০ কেজি এবং এমওপি ১৫ থেকে ২০ কেজি প্রয়োগ করতে হয়। টিএসপি সারের বিকল্প হিসেবে একই পরিমাণ ডিএপি সার দেওয়া যেতে পারে।
কৃষি-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত বছর এক বিঘা (৩৩ শতকে বিঘা) জমিতে আমন ধানের চাষ করতে সব মিলিয়ে ১৫ হাজার থেকে ১৮ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছিল। ধান উৎপাদন হয়েছিল ১৫ থেকে ১৬ মণ। এবার বিঘাপ্রতি খরচ পড়বে ১৮ থেকে ২১ হাজার টাকা। আর ধান কাটার সময় ধানের দাম থাকে প্রতি মণ সাড়ে ৯০০ টাকা থেকে ১ হাজার ৫০ টাকা। সে হিসাবে ১৬ মণ (১ হাজার ৫০ টাকা মণ ধরে) ধানের দাম দাঁড়ায় ১৬ হাজার ৮০০ টাকা। এ হিসাবে আমন ধান উৎপাদনের খরচই উঠছে না।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের যশোর কার্যালয়ের উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. জাহিদুল ইসলাম বিশ্বাস প্রথম আলোকে বলেন, আমন খেতে সার প্রয়োগ প্রায় শেষ। বেশি দামে সার কেনার সুযোগ নেই। তবে উঁচু জমিতে এখনো দুই-একটি সম্পূরক সেচ লাগতে পারে। ডিজেলের দাম বেশি। সে ক্ষেত্রে উৎপাদন খরচ বাড়বে। আমন ধানে যে বাড়তি খরচ হচ্ছে, তা পুষিয়ে নেওয়ার একটা সুযোগও আছে ধানের দাম বাড়িয়ে। ধানের দাম না বাড়লে কৃষক কষ্টে থাকবেন।সদর উপজেলার ভায়না গ্রামের কৃষক তোফাজ্জেল মোল্যা তিন বিঘা জমিতে আমন চাষ করেছেন। এর মধ্যে দুই বিঘা জমি বর্গা এবং এক বিঘা তাঁর নিজের। তিনি বলেন, সরকার সারের যে দাম নির্ধারণ করেছে, বাজারে দাম তার চেয়ে অনেক বেশি। চাষাবাদ ছেড়ে দেওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই।
আমন খেতে সার প্রয়োগ প্রায় শেষ। বেশি দামে সার কেনার সুযোগ নেই। তবে উঁচু জমিতে এখনো দুই-একটি সম্পূরক সেচ লাগতে পারে। ডিজেলের দাম বেশি। সে ক্ষেত্রে উৎপাদন খরচ বাড়বে। আমন ধানে যে বাড়তি খরচ হচ্ছে, তা পুষিয়ে নেওয়ার একটা সুযোগও আছে ধানের দাম বাড়িয়ে। ধানের দাম না বাড়লে কৃষক কষ্টে থাকবেন।
যশোর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, জেলায় এবার আমন ধান চাষ হয়েছে ১ লাখ ৩৩ হাজার হেক্টর জমিতে। ৩৩ শতকে বিঘা ধরে আমন ধান চাষে ইউরিয়া সার ৩০ কেজি, টিএসপি ১৫ থেকে ২০ কেজি এবং এমওপি ১৫ থেকে ২০ কেজি প্রয়োগ করতে হয়। টিএসপি সারের বিকল্প হিসেবে একই পরিমাণ ডিএপি সার দেওয়া যেতে পারে।
কৃষি-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত বছর এক বিঘা (৩৩ শতকে বিঘা) জমিতে আমন ধানের চাষ করতে সব মিলিয়ে ১৫ হাজার থেকে ১৮ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছিল। ধান উৎপাদন হয়েছিল ১৫ থেকে ১৬ মণ। এবার বিঘাপ্রতি খরচ পড়বে ১৮ থেকে ২১ হাজার টাকা। আর ধান কাটার সময় ধানের দাম থাকে প্রতি মণ সাড়ে ৯০০ টাকা থেকে ১ হাজার ৫০ টাকা। সে হিসাবে ১৬ মণ (১ হাজার ৫০ টাকা মণ ধরে) ধানের দাম দাঁড়ায় ১৬ হাজার ৮০০ টাকা। এ হিসাবে আমন ধান উৎপাদনের খরচই উঠছে না।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের যশোর কার্যালয়ের উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. জাহিদুল ইসলাম বিশ্বাস প্রথম আলোকে বলেন, আমন খেতে সার প্রয়োগ প্রায় শেষ। বেশি দামে সার কেনার সুযোগ নেই। তবে উঁচু জমিতে এখনো দুই-একটি সম্পূরক সেচ লাগতে পারে। ডিজেলের দাম বেশি। সে ক্ষেত্রে উৎপাদন খরচ বাড়বে। আমন ধানে যে বাড়তি খরচ হচ্ছে, তা পুষিয়ে নেওয়ার একটা সুযোগও আছে ধানের দাম বাড়িয়ে। ধানের দাম না বাড়লে কৃষক কষ্টে থাকবেন।