যশোরের বারীনগর পাইকারি মোকামে ৫৬ টাকা কেজি দরে পটোল বিক্রি করছেন মাঠের কৃষক। ব্যাপারী, ফড়িয়া ও খুচরা ব্যবসায়ীদের অন্তত পাঁচবার হাতবদল হয়ে সেই পটোল পৌঁছাচ্ছে ঢাকার মানুষের রান্নাঘরে। প্রতিবার হাতবদলে দাম বাড়ছে ৮ থেকে ১০ টাকা। এতে কৃষকের ৫৬ টাকার পটোল ভোক্তাকে ১০০ টাকার বেশি দরে কিনতে হচ্ছে।
হাতবদলের পাশাপাশি দাম বাড়ার পেছনে ন্যায্যমূল্যে কৃষকের সার-কীটনাশক ওষুধ না পাওয়া, পৌরসভার নামে রাস্তায় চাঁদাবাজি, পাইকারি বাজারে শ্রমিকদের বকশিশ, রাজনৈতিক কর্মীদের দালালি, হাটে অতিরিক্ত খাজনা আদায়, সবজি প্যাকেজিংয়ের বস্তা, ডিজেল ও শ্রমের মূল্য বেশি হওয়াও অন্যতম কারণ।
বারীনগর পাইকারি মোকাম থেকে ঢাকাসহ সারা দেশে সবজি পাঠানো হয়। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে এ বাজারে পটোলের কেজি ৫৫ থেকে ৫৬ টাকা, প্রতিটি লাউ ১৫ থেকে ২০ টাকা (আকারভেদে), মুলার কেজি ১৮ থেকে ২০ টাকা, লাল বেগুন ১৭ থেকে ১৮ টাকা কেজি দরে পাইকারি বেচাবিক্রি হয়। এদিন বাজারে ওঠা সবজির ৯০ শতাংশই ছিল পটোল।
কৃষকের কাছ থেকে পটোলসহ অন্যান্য সবজি কিনছেন হাটের ব্যাপারীরা। শ্রমিক দিয়ে সেই সবজি ধুয়ে প্যাকেজিং করে ট্রাকে সাজানো হচ্ছে। এদিন হাটে অন্তত ১৫টি ট্রাকে সবজি বোঝাই করে গন্তব্যে পাঠানো হয়।
হাটের ব্যাপারী আতিয়ার রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আজ আমি ৭ হাজার কেজি সবজি কিনেছি। ৯০ ভাগ পটোল আর লাউ। এই অল্প সবজি কিনতে হাটের খাজনা দিতে হয়েছে ১ হাজার ২০০ টাকা। পরিবহন খরচ ১৮ হাজার। ওজন কাটা, বস্তা, শ্রমিক, হাটের দালালি—সব মিলিয়ে খরচ আছে আরও সাড়ে ১৭ হাজার। ৭ হাজার কেজি সবজি যশোর থেকে ঢাকায় পাঠাতে খরচ হচ্ছে প্রায় ৩৫ হাজার টাকা; অর্থাৎ প্রতি কেজিতে ৮ টাকা করে খরচ পড়ছে। তারপরে আমাদের লাভ করতে হবে।’
পথে পথে যা দেখা গেল
বারীনগর মোকামের সবজি খুচরা পর্যায়ে প্রায় দ্বিগুণ দামে ভোক্তাকে কিনতে হয়। সবজির দাম কেন এত বাড়ে, তা দেখার জন্য গতকাল বারীনগর মোকাম থেকে বিভিন্ন সবজিবোঝাই একটি ট্রাকে উঠে বসেন প্রথম আলোর এ প্রতিবেদক। গন্তব্য ঢাকার যাত্রাবাড়ী কাঁচাবাজার।
বেলা ৩টা ২০ মিনিটে ট্রাকটি যাত্রা শুরু করে। বিকেল পাঁচটা চার মিনিটে ট্রাকটি নড়াইল বাস টার্মিনাল মোড়ে পৌঁছায়। নির্দিষ্ট পোশাক পরা পাঁচজন কর্মী রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে ট্রাকটি থামালেন। তাঁদের হাতে লাঠি। মুঠোফোন বের করে ছবি তোলার সঙ্গে সঙ্গে তিনজন তেড়ে এলেন। একজন বলে উঠলেন, ‘ক্যামেরা কি আর একটা দেব ছবি তোলার জন্য।’
এরপর একটি স্লিপ ধরিয়ে দিয়ে চালকের কাছ থেকে ৫০ টাকা নিলেন। স্লিপে লেখা, ‘নড়াইল পৌরসভা টোল আদায়ের রসিদ। প্রতিদিনের জন্য পরিবহন/ ট্রাক ৫০ টাকা মাত্র।’ এরপর ট্রাকটি আবার যাত্রা শুরু করল। ১৭০ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে মধুমতী সেতু, পদ্মা সেতু, মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে, আড়িয়াল খাঁ সেতুসহ চার জায়গায় টোল আদায় করা হলো। অবশেষে রাত ১০টা ২ মিনিটে ট্রাকটি যাত্রাবাড়ী কাঁচাবাজার পৌঁছায়।
শ্রমিকেরা ট্রাক থেকে সবজি নামিয়ে বিভিন্ন আড়তে নিয়ে গেলেন। প্রায় দেড় ঘণ্টা অপেক্ষার পরও সিটি করপোরেশন বা অন্য কাউকে চাঁদা নিতে আসতে দেখা গেল না। ব্যাপারীরা জানালেন, সবজির আড়তে কেনাবেচার জন্য কেজিপ্রতি এক টাকা ব্যাপারীকে দিতে হয়। যাঁরা কেন্দ্রে তাঁরা দেবেন আরও এক টাকা; অর্থাৎ আড়তে এক কেজি সবজি কেনাবেচার জন্য দুই টাকা আড়তদারি খরচ।
কাঁচাবাজারে সিটি করপোরেশন বা অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের চাঁদা দিতে হয় কি না, জানতে চাইলে সামাদ বাণিজ্যালয়ের ব্যবস্থাপক বাঁধন হোসেন বলেন, ‘আমাদের বাজারের ভেতরে কোনো চাঁদাবাজি নেই।’
তাহলে ৫৬ টাকার পটোল ঢাকার খুচরা বাজারে ১০০ টাকা কীভাবে হচ্ছে প্রশ্ন করলে বাঁধন বলেন, ‘যশোর থেকে ১ কেজি পটোল ঢাকায় আনতে পরিবহন-শ্রমিক-বস্তা-খাজনা সব মিলিয়ে ৮ থেকে ১০ টাকা খরচ হয়। তখন ৬৬ টাকা বিক্রি করলে ব্যাপারীর আসল উঠবে। আড়তে ৩ থেকে ৪ টাকা লাভে বিক্রি হবে ৭০ টাকা দরে। এরপর আড়তদারিতে কেজিতে দুই টাকা। ওই পটোল কিনবেন একজন ফড়িয়া। ফড়িয়া থেকে কিনবেন পাইকারি ব্যবসায়ী। পাইকারি ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ১০ কেজি, ১৫ কেজি করে কিনবেন খুচরা ব্যবসায়ীরা। খুচরা ব্যবসায়ীর কাছ থেকে কেনেন ভোক্তা। ব্যাপারীসহ মোট পাঁচবার হাতবদল হলো। এই বদলের মধ্যে দোকান ভাড়া, শ্রমিক খরচ, কিছু সবজি বাদ যায়—সব মিলিয়ে প্রতিবার হাতবদলে ৮ থেকে ১০ করে বাড়ে; অর্থাৎ ১ কেজি পটোল ভোক্তার হাতে পৌঁছাতে ৮০ থেকে ৯০ টাকা খরচ পড়ে যায়। সেখানে প্রতি কেজি পটোল ১০০ থেকে ১১০ টাকা বিক্রি হওয়াটা তো স্বাভাবিক।’
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, মধ্যস্বত্বভোগী কমাতে পারলে সবজির দাম কিছুটা কমত। সরকার কৃষক থেকে ভোক্তা পর্যায়ে সবজি বিক্রির ব্যবস্থা করতে পারলে দাম নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আসবে।
ন্যায্যমূল্যে পাওয়া যায় না সার-কীটনাশক
কৃষকদের অভিযোগ, তাঁরা ন্যায্যমূল্যে সার ও কীটনাশক পান না। সরকারি বেঁধে দেওয়া দামের চেয়ে বেশি দামে স্থানীয় খুচরা দোকান থেকে সার ও কীটনাশক কিনতে হয় তাঁদের। এটাও সবজির মূল্যবৃদ্ধির আরেকটি বড় কারণ।
যশোর সদর উপজেলার সমসপুর গ্রামের কৃষক আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘১১ বিঘা জমিতে পটোল, ধান, কচুমুখি ও মসুর ডালের আবাদ রয়েছে আমার। প্রতিদিন সার-ওষুধ লাগে। কিন্তু সরকারি দামে কখনোই আমরা সার কিনতে পারি না। স্থানীয় খুচরা দোকান থেকে বেশি দামে সার ও কীটনাশক কিনতে হয়।’