কক্সবাজারে অবৈধ রিসোর্টের ছড়াছড়ি, প্রশাসন নিষ্ক্রিয়

প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে অবৈধ হোটেল-কটেজ। গতকাল কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ সড়কের পাটুয়ারটেক এলাকায়ছবি: সৌরভ দাশ

কক্সবাজারের উখিয়ার পাটুয়ারটেক সৈকতের পাশে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় (ইসিএ) গড়ে উঠছে কোরাল বিচ রিসোর্ট। আগুনে পুড়ে যাওয়া টুপটুপ রিসোর্ট থেকে হেঁটে মাত্র এক মিনিটের পথ। টুপটুপের মতো এ রিসোর্টেও নেই অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, নেই প্রয়োজনীয় কোনো সনদ।

গতকাল রোববার দুপুরে রিসোর্টটিতে গিয়ে অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্রও পাওয়া যায়নি। প্রায় ১০ বিঘা জমিতে স্থাপনাটি গড়ে তোলা হচ্ছে। দোতলা একটি ভবন হয়েছে। ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাসান তালুকদার প্রথম আলোকে বলেন, সামনে আরও অবকাঠামো হবে। ধাপে ধাপে সব সনদ সংগ্রহ করা হবে।

সৈকতের আশপাশে গড়ে উঠেছে হোটেল–রিসোর্ট। প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় এসব হোটেল–রিসোর্টের অনেকগুলোই অবৈধ
ছবি: সৌরভ দাশ

পুড়ে যাওয়া টুপটুপ রিসোর্ট বন্ধ করতে নোটিশ দিয়েছিল পরিবেশ অধিদপ্তর। ভেঙে ফেলতে দুই দফা নোটিশ দিয়েছিল কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কউক)। ঝুঁকিপূর্ণ চিহ্নিত করে সতর্ক করেছিল ফায়ার সার্ভিসও। তবু অনুমোদন ও অগ্নিনিরাপত্তার ব্যবস্থা ছাড়াই ব্যবসা করে যাচ্ছিল রিসোর্টটি। গত শনিবার সকালে ভয়াবহ আগুনে সেই রিসোর্টে ১০ পর্যটকের মৃত্যু হয়। তাঁদের ছয়জন একই পরিবারের। এ ঘটনার পর পর্যটকদের নিরাপত্তা, রিসোর্ট নির্মাণে অনিয়মের বিষয়টি আবার সামনে এসেছে।

আরও পড়ুন
টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের লাশের অপেক্ষায় স্বজনেরা। বেলা ১১টার দিকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের সামনে, ১৮ অক্টোবর
ছবি: প্রথম আলো

টুপটুপে প্রাণহানির পরদিন গতকাল দিনভর কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভের প্রায় ৩০ কিলোমিটার ঘুরে অনুমোদন ছাড়াই নতুন রিসোর্ট–কটেজ নির্মাণ এবং অতিথি কক্ষ তৈরির কাজ দেখা গেছে। শহরে আটতলা হোটেলও চলছে অগ্নিনিরাপত্তা সনদ ও পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া। বিভিন্ন সংস্থা অনিয়ম চিহ্নিত করে নোটিশ দিচ্ছে। কিন্তু নির্মাণ ও ব্যবসা বন্ধ হচ্ছে না।

সরকারি সংস্থা, হোটেলমালিক সমিতি ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, কক্সবাজার জেলায় সাত শতাধিক আবাসিক হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজে অগ্নিনিরপত্তার ঘাটতিসহ নানা অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে। হোটেলমালিকদের হিসাব অনুযায়ী, বছরে অন্তত ৯০ লাখ পর্যটক কক্সবাজারে আসেন। আগুন লাগলে তাঁদের সতর্ক করা, প্রাথমিকভাবে আগুন নেভানো এবং নিরাপদে বের হওয়ার ব্যবস্থা থাকার কথা। টুপটুপের প্রাণহানি সেই ব্যবস্থার ঘাটতি ও সরকারি তদারকির ব্যর্থতা সামনে এনেছে।

টুপটুপে প্রাণহানির পরদিন গতকাল দিনভর কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভের প্রায় ৩০ কিলোমিটার ঘুরে অনুমোদন ছাড়াই নতুন রিসোর্ট–কটেজ নির্মাণ এবং অতিথি কক্ষ তৈরির কাজ দেখা গেছে। শহরে আটতলা হোটেলও চলছে অগ্নিনিরাপত্তা সনদ ও পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া। বিভিন্ন সংস্থা অনিয়ম চিহ্নিত করে নোটিশ দিচ্ছে। কিন্তু নির্মাণ ও ব্যবসা বন্ধ হচ্ছে না।

২৫ বছরে ২০০ থেকে ২০০০ হোটেল-রিসোর্ট

কক্সবাজারের ইনানীতে টুপটুপ রিসোর্ট অগ্নিকাণ্ডের পর স্বজনদের খুঁজছেন এক পর্যটক
ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

অনুসন্ধানে সংগৃহীত আনুমানিক হিসাব অনুযায়ী, ২০০০ সালে কক্সবাজারে হোটেল–রিসোর্ট ছিল ২ শতাধিক। ২০১০ সালে সংখ্যা বেড়ে হয় প্রায় ৫০০। ২০২০ সালে তা এক হাজার ছাড়ায়। বর্তমানে জেলায় হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ মিলিয়ে সংখ্যা দুই হাজারের বেশি। প্রায় আড়াই দশকে পর্যটকদের থাকার স্থাপনা বেড়েছে কয়েক গুণ।

শুধু কক্সবাজার শহরের প্রায় চার বর্গকিলোমিটার এলাকায় হোটেল–রিসোর্ট রয়েছে ৫৩৭টি। শহরের বাইরে মেরিন ড্রাইভ ধরে হিমছড়ি, ইনানী, পাটুয়ারটেক ও টেকনাফেও ব্যবসা ছড়িয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ–অভ্যুত্থানের পর মেরিন ড্রাইভ এলাকায় প্রায় ৬০টি রিসোর্ট–কটেজ নির্মাণের তথ্য পাওয়া গেছে।

আরও পড়ুন

কিন্তু পর্যটন ব্যবসার এই বিস্তারের সঙ্গে অনুমোদন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি। সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে সংগ্রহ করা তথ্য অনুযায়ী, জেলায় ১১৫টি হোটেল–রিসোর্টের অগ্নিনিরাপত্তা সনদ রয়েছে। পরিবেশগত ছাড়পত্র রয়েছে ৪৪টি প্রতিষ্ঠানের। এর বাইরে ঠিক কত প্রতিষ্ঠান এসব ছাড়া চলছে, তার কোনো সমন্বিত তালিকা পাওয়া যায়নি সরকারি দপ্তর ও সংস্থায়।

কউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মুহাম্মদ জসিম উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, মেরিন ড্রাইভের দুই পাশে প্রায় আড়াই হাজার স্থাপনা গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ প্রায় ২৫০টি। তারকা মানের কয়েকটি ছাড়া অন্যগুলোর বৈধ অনুমোদন নেই।

শুধু কক্সবাজার শহরের প্রায় চার বর্গকিলোমিটার এলাকায় হোটেল–রিসোর্ট রয়েছে ৫৩৭টি। শহরের বাইরে মেরিন ড্রাইভ ধরে হিমছড়ি, ইনানী, পাটুয়ারটেক ও টেকনাফেও ব্যবসা ছড়িয়েছে।

কটেজ উঠছে, কাগজপত্র পরে

কক্সবাজারে হোটেল, রিসোর্টের ছড়াছড়ি
ছবি: সৌরভ দাশ

মেরিন ড্রাইভের সোনারপাড়া এলাকায় দেখা গেল, বাঁশ ও বেত দিয়ে ছয়টি কটেজ নির্মাণ করা হচ্ছে। সরকারি দপ্তরের অনুমোদন না থাকলেও নির্মাণকাজ থেমে নেই। প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম কর্ণধার ইমরান নাজির নিজেকে ব্যবসায়ী পরিচয় দেন। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, অগ্নিনিরাপত্তা সনদের জন্য আবেদন করেছেন। অন্য সরকারি সংস্থার অনুমোদনের কাগজপত্র প্রস্তুত করছেন। স্থানীয় এক বাসিন্দার কাছ থেকে জমিটি কিনেছেন বলে জানান তিনি।

পাটুয়ারটেকের সেইলর বিচ রিসোর্টে পর্যটকদের জন্য ১৫টি কক্ষ তৈরি করা হচ্ছে। সেখানে ৩০ জনের বেশি মানুষ থাকতে পারবেন। প্রায় এক বছর আগে রিসোর্টটি নির্মিত হয়েছে। ব্যবস্থাপক মামুন হোসেন বলেন, অনুমোদনের জন্য সরকারি দপ্তরে যোগাযোগ করেছেন তাঁরা।

অর্থাৎ নির্মাণের আগে অনুমোদন নেওয়ার বদলে ভবন তৈরির পর দপ্তরে যোগাযোগ করছেন উদ্যোক্তারা। মাঠপর্যায়ে বাধা না পাওয়ায় আগে স্থাপনা তৈরি, পরে কাগজপত্র সংগ্রহের সুযোগ পাচ্ছেন তাঁরা। হোটেল–রিসোর্টের ক্ষেত্রে ভবনের নকশা ও নির্মাণের অনুমোদন, ব্যবসা পরিচালনার প্রযোজ্য নিবন্ধন ও লাইসেন্স, পরিবেশগত ছাড়পত্র এবং অগ্নিনিরাপত্তার অনুমোদন আলাদা বিষয়। এক সংস্থার কাগজ দিয়ে অন্য সংস্থার অনুমোদনের ঘাটতি পূরণ হয় না। ইসিএভুক্ত এলাকায় জমির ব্যবহার ও নির্মাণের বিধিনিষেধও মানতে হয়।

হোটেলের কর্ণধার মো. ফরিদ দুবাইয়ে থাকেন। এটি দেখভাল করেন স্থানীয় সাংবাদিক এম আর মাহবুব। তাঁর দাবি, সব ধরনের নিয়ম মেনেই হোটেল চলছে। তাঁদের কাছে সব কাগজপত্র রয়েছে। তবে হোটেলে গেলে কর্মচারীরা কাগজপত্র দেখাতে পারেননি।

আটতলা হোটেলেও সনদ নেই

কক্সবাজারের কলাতলী এলাকায় আটতলা হোটেল কক্স রোটানা। ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, এই হোটেলের অগ্নিনিরাপত্তা সনদ ও পরিকল্পনা নেই। সম্প্রতি নোটিশ দেওয়া হয়েছে। আবার নোটিশ দেওয়া হবে। পরিবেশ অধিদপ্তর জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির পরিবেশগত ছাড়পত্রও নেই।

হোটেলের কর্ণধার মো. ফরিদ দুবাইয়ে থাকেন। এটি দেখভাল করেন স্থানীয় সাংবাদিক এম আর মাহবুব। তাঁর দাবি, সব ধরনের নিয়ম মেনেই হোটেল চলছে। তাঁদের কাছে সব কাগজপত্র রয়েছে। তবে হোটেলে গেলে কর্মচারীরা কাগজপত্র দেখাতে পারেননি।

দুই সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, হোটেল সি সোর, আরহাম রিসোর্ট ও মডার্ন রিসোর্টেরও অগ্নিনিরাপত্তা সনদ এবং পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই। ফায়ার সার্ভিস সম্প্রতি এসব প্রতিষ্ঠানকে নোটিশ দিয়েছে। পার্ল এভিনিউরও ফায়ার লাইসেন্স ও অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনা নেই। প্রতিষ্ঠানটিকেও নোটিশ দেওয়া হয়েছে।

নোটিশ দেওয়ার মধ্য দিয়ে সংস্থাগুলো ঘাটতি চিহ্নিত করছে। কিন্তু ঘাটতি দূর হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করার আগেই ব্যবসা চলছে। টুপটুপের ক্ষেত্রে একাধিক সংস্থার নোটিশের পরও পর্যটক রাখা বন্ধ হয়নি।

আরও পড়ুন

ইসিএভুক্ত এলাকায়ও নির্মাণ

কক্সবাজার জেলায় প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা বা ইসিএ তিনটি—কক্সবাজার–টেকনাফ সমুদ্রসৈকত এলাকা, সোনাদিয়া ও সেন্ট মার্টিন দ্বীপ। এসব এলাকার প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বিশেষ বিধিনিষেধ রয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, মেরিন ড্রাইভের প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় জমির ভেতর চারটি কটেজ নির্মাণ করছেন মো. তানভিরুল নামের স্থানীয় এক ব্যক্তি। তাঁকে পাওয়া যায়নি। কটেজের নির্মাণকাজে নিয়োজিত রবিউল হাসান বলেন, তিন মাস আগে নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। কাজ শেষ হতে আরও দুই মাস লাগবে।

পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী, ইসিএ ঘোষণার প্রজ্ঞাপনে নির্দিষ্ট ক্ষতিকর কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা হয়। ২০১৬ সালের ব্যবস্থাপনা বিধিমালায় ইসিএভুক্ত জমির শ্রেণি পরিবর্তনে পরিবেশ অধিদপ্তরের সম্মতি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এলাকার ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা এবং সরেজমিন তদারকির দায়িত্বও রয়েছে।

কউক চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন বলেন, প্রায় ৮০ কিলোমিটার মেরিন ড্রাইভের দুই পাশে নির্মাণে বিধিনিষেধ থাকায় কউক অনুমোদন দিতে পারছে না। কিন্তু স্থাপনা তৈরি হচ্ছে। অবৈধভাবে নির্মিত দেড় শতাধিক স্থাপনাকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। আরও স্থাপনা সরেজমিনে দেখে তালিকা করা হবে।

কক্সবাজারে ইসিএভুক্ত এলাকায় হোটেল-কটেজ নির্মাণের কোনো সুযোগ আর কাউকে দেওয়া হবে না। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, হোটেল-কটেজে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা আছে কি না যাচাই করা। সামনে শীত মৌসুমে অনেক পর্যটক সেখানে যাবেন। তাঁদের নিরাপত্তা দিতে হবে। তাই অগ্নিনির্বাপণ সনদ না থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সিলগালা করা উচিত।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম

সেন্ট মার্টিনে ২৩৪টি হোটেল–রিসোর্ট গড়ে ওঠার তথ্য পাওয়া গেছে। দ্বীপেও দীর্ঘদিন ধরে আইন ভেঙে স্থাপনা নির্মাণ হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা, জরিমানা ও নির্মাণ বন্ধের ব্যবস্থা নেয় পরিবেশ অধিদপ্তর। তখন নতুন রিসোর্ট–কটেজ নির্মাণ অনেকটা বন্ধ হয়।

মেরিন ড্রাইভে নির্মাণ চলার বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক জমির উদ্দিন গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, নিয়ম না মেনে ইসিএভুক্ত এলাকায় রিসোর্ট নির্মাণ হচ্ছে। তাঁরা জরিমানা করছেন, নোটিশ দিচ্ছেন, মামলাও করছেন। তবু কাজ হচ্ছে না।

যোগাযোগ করা হলে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, কক্সবাজারে ইসিএভুক্ত এলাকায় হোটেল-কটেজ নির্মাণের কোনো সুযোগ আর কাউকে দেওয়া হবে না। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, হোটেল-কটেজে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা আছে কি না যাচাই করা। সামনে শীত মৌসুমে অনেক পর্যটক সেখানে যাবেন। তাঁদের নিরাপত্তা দিতে হবে। তাই অগ্নিনির্বাপণ সনদ না থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সিলগালা করা উচিত।

জরিমানা–মামলা করেই দায়িত্ব শেষ

পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া কার্যক্রম পরিচালনা ও ইসিএভুক্ত এলাকায় বিধিনিষেধ লঙ্ঘন করে স্থাপনা নির্মাণের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে পরিবেশ অধিদপ্তর। সংস্থার কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ের নথির সারসংক্ষেপ অনুযায়ী, গত এক বছরে ৫৫টি হোটেল, রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁকে মোট ১ কোটি ২৭ লাখ ৩৪ হাজার ১৫৮ টাকা ক্ষতিপূরণ ধার্য করা হয়েছে।

এর মধ্যে জিডি সমুদ্রবিলাসকে ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা, হোটেল কল্লোলকে ৩ লাখ ৯০ হাজার টাকা, টাইটান হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টকে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা এবং সী পার্ল বীচ রিসোর্টকে ৪ লাখ ৩৮ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ ধার্য করা হয়।

অধিদপ্তরের দেওয়া পৃথক তথ্য অনুযায়ী, মূলত একই ধরনের অনিয়মে শতাধিক রিসোর্টের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে ২৮টি। এর মধ্যে সেন্ট মার্টিনের ৩৪টি রিসোর্টের বিরুদ্ধে মামলা আটটি।

মেরিন ড্রাইভ সড়কের পরিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা অবৈধ হোটেল ও রিসোর্টগুলোর বিরুদ্ধে পরিবেশ অধিদপ্তরের জরিমানা, নোটিশ ও মামলা কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। কক্সবাজার বন ও পরিবেশ সংরক্ষণ পরিষদের সভাপতি দীপক শর্মা প্রথম আলোকে বলেন, দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি সংস্থাগুলো নামমাত্র জরিমানা, নোটিশ ও মামলা করে একধরনের দায় সারছে। আইনের তোয়াক্কা না করে পরিবেশের ওপর ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে ঠিকই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে অসংখ্য প্রতিষ্ঠান। তিনি মনে করেন, পরিবেশ সুরক্ষার স্বার্থে কেবল আর্থিক দণ্ড বা মামলা নয়; বরং অবৈধ স্থাপনাগুলো অবিলম্বে উচ্ছেদের মাধ্যমে কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।

জিডি সমুদ্রবিলাসকে ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা, হোটেল কল্লোলকে ৩ লাখ ৯০ হাজার টাকা, টাইটান হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টকে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা এবং সী পার্ল বীচ রিসোর্টকে ৪ লাখ ৩৮ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ ধার্য করা হয়।

অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে শহর

কউক চেয়ারম্যান জানান, ২০১৬ সালে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠার পর থেকে জেলার বিভিন্ন এলাকায় সব ধরনের ভবন মিলিয়ে প্রায় ১ হাজার ৭০০টি নকশা অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। প্রতি মাসে ৫০ থেকে ১০০টি আবেদন জমা পড়ছে। মাঠপর্যায়ে যাচাই করে অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে। অবৈধ স্থাপনাও উচ্ছেদ হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।

তবে অনুমোদিত এসব নকশার মধ্যে হোটেল–রিসোর্টের ভবন কতটি, তার আলাদা হিসাব পাওয়া যায়নি। কউক সূত্র জানায়, শুধু শহরেই ১ হাজার ৭০০ স্থাপনার মধ্যে সাড়ে পাঁচ শ হোটেল-রিসোর্ট, গেস্টহাউস ভবন। পর্যাপ্ত অনুমোদন না নিয়েই এসব গড়ে উঠেছে।

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান প্রথম আলোকে বলেন, অতীতে নিয়মনীতি লঙ্ঘন করে অনেক হোটেল–রিসোর্ট গড়ে উঠেছে। এগুলোর বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চলছে দাবি করে তিনি বলেন, গত দুই সপ্তাহে শহরে দুই শতাধিক অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। এর মধ্যে বেশ কিছু হোটেল–রিসোর্টও ছিল।

কক্সবাজার হোটেল–গেস্টহাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার বলেন, শহরের ৫৩৭টি হোটেলের মধ্যে তাঁর সমিতির সদস্য ১৮৭টি। সদস্যভুক্ত প্রায় সব হোটেল–গেস্টহাউসের প্রয়োজনীয় অনুমোদন রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

পরিবেশবাদী সংগঠন ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা’ (ধরা)–এর কক্সবাজারের সভাপতি ফজলুল কাদের চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, কউক, জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর ও ফায়ার সার্ভিসের গাফিলতিতেই একের পর এক বেআইনি হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ গড়ে উঠেছে। এখনো নির্মাণ চলছে। আসলে পুরো কক্সবাজার শহরই গড়ে উঠেছে অপরিকল্পিতভাবে।

আগুনের ঘটনায় মামলা

টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ২৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে পুলিশ। মালিক মো. তানভীরকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। গত শনিবার রাতে উখিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আশিস সূত্রধর বাদী হয়ে মামলাটি করেন। উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান মজুমদার গতকাল জানান, মামলায় চারজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। আরও ১৯ জন অজ্ঞাতনামা আসামি। শনিবার বিকেলে ঘটনাস্থল থেকে আটক রিসোর্টের ব্যবস্থাপক জাহিদুল ইসলাম ওরফে সুমনকে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।

মরদেহের অপেক্ষায় স্বজনেরা

নিহত ১০ জনের মরদেহ কক্সবাজার সদর হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়েছে। স্বজনেরা হাসপাতালে ছুটে এলেও মরদেহ বুঝে পাচ্ছেন না। আগুনে পুড়ে চেহারা বিকৃত হয়ে যাওয়ায় কোনটি কার মরদেহ, তা নিশ্চিত করতে ডিএনএ পরীক্ষা করা হবে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।

হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা সুবক্তগীন মাহমুদ সোহেল জানান, নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ছয়জনের পরিচয় প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। তবে মরদেহগুলোর কোনটি কার, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। জেলা প্রশাসক বলেন, ডিএনএ পরীক্ষায় পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর মরদেহ হস্তান্তর করা হবে।

এদিকে রিসোর্টে থাকা নাসরিন আক্তারের সন্ধান পাওয়া যায়নি। বৃহস্পতিবার দুই বান্ধবীর সঙ্গে সেখানে উঠেছিলেন তিনি। তাঁদের একজন আইরীন জাহান জানান, শনিবার ভোরে তাঁরা দুজন সৈকতে যান। নাসরিন ঘুমানোর জন্য রিসোর্টে থেকে যান। ফিরে এসে তাঁরা আগুন দেখতে পান। মেরিন ড্রাইভে দাঁড়িয়ে চিৎকার করা ছাড়া তাঁরা কিছুই করতে পারেননি।

খবর পেয়ে শনিবার বিকেলে ঢাকা থেকে কক্সবাজারে আসেন নাসরিনের স্বামী দেওয়ান ফয়সাল। নাসরিন আশুলিয়ার স্বপ্নবিলাস নিরিবিলি স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। ছয় বছর আগে তাঁদের বিয়ে হয়। রিসোর্ট ও হাসপাতালে খুঁজেও স্ত্রীর সন্ধান পাননি ফয়সাল। রাতে হাসপাতাল প্রাঙ্গণে তিনি বলেন, হাসপাতালে লাশের যে অবস্থা দেখা গেল, কারও পরিচয় শনাক্ত করারই উপায় নেই। পরিচয় শনাক্তে ডিএনএ টেস্ট লাগবে।