সুন্দরবনে বাঘ আটকে পড়া এলাকা থেকে আরও ফাঁদ উদ্ধার
সুন্দরবনের শরকির খালের অদূরে বাঘ আটকে পড়া এলাকা থেকে আরও ছিটকে ফাঁদ উদ্ধার করা হয়েছে। আজ সোমবার দিনব্যাপী শরকির খাল থেকে জয়মনি ঠোঁটা পর্যন্ত পায়ে হেঁটে তল্লাশি করে অন্তত আটটি ছিটকে ফাঁদ উদ্ধার করেন বন বিভাগের লোকজন।
বাঘসহ অন্যান্য বন্য প্রাণী রক্ষায় অধিকতর সতর্ক থাকার অংশ হিসেবে বন বিভাগ এই তল্লাশি কার্যক্রম পরিচালনা করে। এর মধ্যে বাঘ আটকে পড়া সুন্দরবনের ওই এলাকা থেকে দুটি এবং নজরুলের ছিলা এলাকা থেকে ছয়টি ছিটকে ফাঁদ উদ্ধার হয়।
সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) দ্বীপন চন্দ্র দাস মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, সুন্দরবনের বৈদ্যমারী এলাকায় হরিণের ফাঁদে আটকে পড়া বাঘটিকে খুবই সতর্কতার সঙ্গে উদ্ধার করা হয়। অসাধু মানুষেরা ওই এলাকায় আরও ফাঁদ পেতে রাখতে পারেন, সে ধারণা থেকেই আজ দিনব্যাপী চারটি পৃথক দলে ভাগ হয়ে সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের জয়মনির ঠোঁটা থেকে শরকির খাল পর্যন্ত তল্লাশি অভিযান চালানো হয়। বন বিভাগ ছাড়াও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীরা এ কাজে অংশ নেন। তল্লাশি করে মোট আটটি ফাঁদ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া পুরো এলাকা নজরদারিতে রাখা হয়েছে।
বন বিভাগের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হরিণ শিকারের জন্য পাতা ছিটকে ফাঁদে কোনো প্রাণী আটকে যাওয়ার পর যত বেশি নড়াচড়া করা হয়, ফাঁদ তত কষে যায়।
গত শনিবার দুপুরের পর স্থানীয় বাসিন্দাদের মাধ্যমে ফাঁদে একটি বাঘিনী আটকে পড়ার খবর পায় বন বিভাগ। ঘটনাস্থলটি সুন্দরবনের পূর্ব অংশের চাঁদপাই রেঞ্জের বৈদ্যমারী ফরেস্ট টহল ফাঁড়ির আওতাধীন শরকির খাল–সংলগ্ন বনাঞ্চল। এলাকাটি বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার বৈদ্যমারী ও জয়মনি বাজারের মধ্যবর্তী।
গতকাল রোববার দুপুরে বিশেষজ্ঞ দলের সহায়তায় ‘ট্রাঙ্কুইলাইজার গান’ ব্যবহার করে বাঘিনীটিকে অচেতন করা হয়। এরপর ফাঁদ কেটে এটিকে উদ্ধারের পর লোহার খাঁচায় করে চিকিৎসার জন্য খুলনায় নেওয়া হয়। ফাঁদের রশিতে বাঘিনীটির সামনের বাঁ পা আটকে ছিল। সেখানে গুরুতর ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে।
‘ছিটকে’ বা ‘ছিটকা’ ফাঁদ কী?
সুন্দরবনে হরিণ শিকারের জন্য চোরা শিকারিরা বিভিন্ন ধরনের ফাঁদ ব্যবহার করেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শিকারিরা সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করেন মালা ফাঁদ। কেবল দড়ি বা রশি দিয়ে বনের মধ্যে হরিণ চলাচলের পথে মালার মতো ঝুলিয়ে রাখা হয় এই ফাঁদ। এই ফাঁদে হরিণ ছাড়াও বিভিন্ন সময় শূকর আটকে পড়তে দেখা গেছে। তবে ছিটকে বা ছিটা ফাঁদে পশু ছাড়াও বিভিন্ন সময় পাখি পর্যন্ত আটকে পড়ে।
বন বিভাগ ও স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, সুন্দরবনে যাঁরা হরিণ শিকার করেন, তাঁরা ফাঁদ বহন করেন না। জালের সঙ্গে দড়ি নিয়ে বনে ঢোকেন তাঁরা। তারপর বনের ভেতর বসে ফাঁস তৈরি করেন। কয়েক ঘণ্টায় বানিয়ে ফেলেন হরিণ ধরার ফাঁদ। এরপর শিকারে নামেন। দড়ি দিয়ে কয়েক ধরনের ফাঁদ তৈরি করা যায়, এসব ফাঁদে আটকা পড়ে হরিণসহ বিভিন্ন বন্য প্রাণী।
সুন্দরবনে হরিণ শিকারে মালা ফাঁদ, ছিটকে ফাঁদ ও হাঁটা ফাঁদ—এই তিন ধরনের ফাঁদের ব্যবহার বেশি। বাঘটি যে ‘ছিটকে’ বা ছিটা ফাঁদে আটকা পড়ে, এ ধরনের ফাঁদ তৈরি হয় মাত্র একটুকরো দড়ি দিয়ে। সুন্দরবনে হরিণের চলাফেরার পথ হিসাব করে ছিটকে ফাঁদ পাতেন শিকারিরা।
মাঝারি আকারের গাছ কেটে সঙ্গে কয়েক টুকরো চিকন গাছের ডাল ও দড়ি দিয়ে তৈরি করা হয় ছিটকে ফাঁদ। পরে শুকনা ঘাস-পাতা দিয়ে ঢেকে রাখা হয় জায়গাটি। দড়িগুলো দেখা যায় না। এর মধ্যে (জায়গামতো) পা পড়লে তীব্র বেগে উঠে যায় দড়ির ফাঁস। ঝুলে পড়ে শিকার। হরিণ ছাড়াও যেকোনো প্রাণী এমনকি পাখিও ধরা পড়ে যায় ছিটকে ফাঁদে।
এসিএফ দ্বীপন চন্দ্র দাস বলেন, বাঘিনীটিকে যে এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়, ওই শরকির খাল এলাকা থেকে তিন দিন আগেও মালা ফাঁদ উদ্ধার করা হয়। শরকির খালে খনন চলছে। এমনিতেই শুকনো মৌসুমে পানি থাকে না, তার ওপর খননের কারণে পায়ে হেঁটে এখন বনে প্রবেশ করা বেশ সহজ হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় শিকারিরা যেন সুযোগ নিতে না পারেন, সে জন্য সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে।