টিনের ঘরের যে বিদ্যালয়ে পড়ছে পাহাড়ি শিশুরাও, তিন দশকেও মেলেনি সরকারি সহায়তা

মিরসরাই উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি এলাকা কয়লা পশ্চিম সোনাইয়ের একমাত্র উচ্চবিদ্যালয়টি ৩১ বছর ধরে টিন ও বেড়ার ঘরেই চলছে। ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণিতে ৩১০ শিক্ষার্থীর মধ্যে শতাধিক ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর হলেও সরকারি সুবিধা বলতে শুধু বিনা মূল্যের পাঠ্যবই। নেই স্থায়ী ভবন, পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ, শৌচাগার, সুপেয় পানি, লাইব্রেরি বা মেয়েদের কমনরুম। কক্ষসংকটে একসঙ্গে কয়েকটি শ্রেণির পরীক্ষা নিতে হয়। শিক্ষক ও স্থানীয় লোকজনের আবেদনের পরও বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্ত হয়নি।

সরকারি সুবিধা ছাড়াই তিন দশক ধরে চলছে বিদ্যালয়টি। ১০ বর্গ কিলোমিটারের একমাত্র বিদ্যালয়টিতে পড়ছে তিন শতাধিক শিক্ষার্থী। চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের করেরহাট ইউনিয়নের কয়লা পশ্চিম সোনাই এলাকায়ছবি: প্রথম আলো

উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরের গ্রাম কয়লা পশ্চিম সোনাই। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ পেরিয়ে গ্রামটিতে গেলে চোখ জুড়ায় সবুজের স্নিগ্ধতা। এই গ্রামেরই এক প্রান্তে অবস্থিত কয়লা পশ্চিম সোনাই উচ্চবিদ্যালয়। পাহাড়ি এলাকার প্রায় ১০ বর্গকিলোমিটারের মধ্যে এটিই একমাত্র উচ্চবিদ্যালয়। স্থানীয় কয়েকজন শিক্ষা অনুরাগীর হাতে গড়া প্রতিষ্ঠানটিতে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত ৩১০ জন শিক্ষার্থী পড়লেও বিনা মূল্যে সরকারি বই পাওয়া ছাড়া সরকারি আর কোনো সুবিধা মেলে না এখানে। সুপেয় পানির অভাব, শৌচাগার না থাকা ও বিদ্যালয় ভবনের সংকটে ক্ষীণ হচ্ছে দারিদ্র্যপীড়িত পাহাড়ি এই এলাকার শিক্ষা বিস্তারের সম্ভাবনা।

গত বৃহস্পতিবার বিদ্যালয়টি ঘুরে দেখা যায়, টিনের বেড়ায় তৈরি ৩০ মিটার দীর্ঘ আর ১০ মিটার প্রস্থের একটি ঘরে চলছে বিদ্যালয়টির শ্রেণির কার্যক্রম। তার পাশের ছোট একটি ঘর ব্যবহার করা হয় শিক্ষকদের অফিস হিসেবে। বিদ্যালয়ের পাশের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিত্যক্ত দুটি কক্ষ ব্যবহার করা হয় পাঠদানে। বিদ্যালয়ের বড় কক্ষটিতে ঢুকে দেখা যায় সেখানে চলছিল সপ্তম, অষ্টম ও দশম শ্রেণির অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা। কক্ষ সংকটের কারণে গাদাগাদি করে অন্তত ১৫০ জন শিক্ষার্থী বসে পরীক্ষার খাতায় লিখছিল সেখানে।

বিদ্যালয়টির শিক্ষক শিক্ষার্থী ও স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৯৯৫ সালে উপজেলার করেরহাট ইউনিয়নের কয়লা পশ্চিম সোনাই এলাকায় শিক্ষা বিকাশে মো. মহিউদ্দিন, জসিম উদ্দিন ও ফজলুল করিম নামের তিন ব্যক্তি ৭৫ শতাংশ জায়গার ওপর বিদ্যালয়টি স্থাপন করেন। শুরুতে ৬ জন শিক্ষক ও ২৬ জন শিক্ষার্থী নিয়ে পাঠ কার্যক্রম শুরু হলেও এখন ব্যবসা শিক্ষা ও মানবিক বিভাগে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণিতে ৩১০ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে এই বিদ্যালয়ে। এসব শিক্ষার্থীর মধ্যে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর শিক্ষার্থী রয়েছে ১০০ জনের বেশি। এখন শিক্ষকসংখ্যা ১০ জন এবং দুজন কর্মচারী রয়েছেন এখানে। এ বছর স্বীকৃতির জন্য সরকারিভাবে পরিদর্শন করা হয় বিদ্যালয়টি। তবে হয়নি কোনো অগ্রগতি।

নেই পাকা ভবন, পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ, টয়লেট, তবু গত তিন দশক ধরে শিক্ষার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বিদ্যালয়টি। চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের করেরহাট ইউনিয়নের কয়লা পশ্চিম সোনাই এলাকায়
ছবি: প্রথম আলো

বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক সাইফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘পাহাড়ি অনগ্রসর এই অঞ্চলের শিক্ষা উন্নয়নের জন্য আমরা বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেছি। শতভাগ উপযোগিতা থাকার পরও সরকারিভাবে এই বিদ্যালয়কে তেমন কোনো পৃষ্ঠপোষকতা করা হয় না। এখানে বিদ্যালয়ের ভবন নেই, শিক্ষকদের বেতন নেই, ভালো একটি শৌচাগার নেই, সুপেয় পানির ব্যবস্থা নেই। প্রায় সময় সাপ কুকুর বিড়াল শেয়াল বিদ্যালয়ের ভেতর ঢুকে বসে থাকে। বড় একটি পাহাড়ি জনপদের একমাত্র বিদ্যালয় হলেও বলতে গেলে কারোরই কোনো নজর নেই এই প্রতিষ্ঠান নিয়ে। শত প্রতিকূলতার পরও আমাদের শিক্ষার্থীরা বরাবরই ফলাফলে ভালো। অনেক তুখোড় মেধাবী শিক্ষার্থী আছে আমাদের। প্রয়োজনীয় সুবিধাটুকু না পাওয়ায় তারা পিছিয়ে পড়ছে। শিক্ষা যদি মানুষের মৌলিক অধিকার হয় তাহলে এই বিদ্যালয়ের উন্নয়নে সরকারের নজর দেওয়া অবশ্যই কর্তব্য। আমরা চাই প্রয়োজনীয় ভবনসহ বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্ত করা হোক।’

টিনের বেড়ার তৈরি ৩০ মিটার দীর্ঘ আর ১০ মিটার প্রস্থের একটি ঘরে চলছে বিদ্যালয়টির শ্রেণির কার্যক্রম। তার পাশের ছোট একটি ঘর ব্যবহার করা হয় শিক্ষকদের অফিস হিসেবে। বিদ্যালয়ের পাশের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিত্যক্ত দুটি কক্ষ ব্যবহার করা হয় পাঠদানে। বিদ্যালয়ের বড় কক্ষটিতে ঢুকে দেখা যায় সেখানে চলছিল সপ্তম, অষ্টম ও দশম শ্রেণির অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা। কক্ষসংকটের কারণে গাদাগাদি করে অন্তত ১৫০ জন শিক্ষার্থী বসে পরীক্ষার খাতায় লিখছিল সেখানে।

জানতে চাইলে বিদ্যালয়টির নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী দিপুরানী ত্রিপুরা বলে, ‘প্রত্যন্ত এলাকার বড় জনপদের একমাত্র উচ্চবিদ্যালয় এটি। আমাদের বিদ্যালয়ে ভালো শ্রেণিকক্ষ নেই, বৃষ্টি হলে পানি পড়ে। গাদাগাদি করে বাসায় গরমে প্রাণ হয় ওষ্ঠাগত। আমাদের বিদ্যালয়ে একটি লাইব্রেরি নেই, মেয়েদের জন্য কোনো কমন রুম নেই। শৌচাগার নেই, সুপেয় পানির ব্যবস্থা নেই। তবু শিক্ষকদের অনুপ্রেরণায় আমরা সব প্রতিকূলতা ডিঙিয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি। আমরা চাই শিক্ষার ন্যায্য অধিকারটুকু পেতে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় বাসিন্দা ও কয়লা পশ্চিম সোনাই উচ্চবিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক আবদুল আলিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘বলা চলে কয়লা পশ্চিম সোনাই উচ্চবিদ্যালয় এই অঞ্চলের শিক্ষার বাতিঘর। বিদ্যালয়টি না থাকলে এখানকার শিক্ষার্থীদের উচ্চমাধ্যমিকে পড়ার জন্য অন্তত ১৭ কিলোমিটার দূরে করের হাট এলাকায় যেতে হতো। এখানকার মানুষ খুব দরিদ্র। অভিভাবকেরা সচেতন নয়। তবু এই বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আপ্রাণ চেষ্টায় শত শত শিক্ষার্থী উচ্চমাধ্যমিক পর্যায় পড়াশোনার সুযোগ পাচ্ছে। কর্তৃপক্ষের অবহেলায় বিদ্যালয়টি এখনো শুধু বিনা মূল্যে বই পাওয়া ছাড়া সব ধরনের সরকারি সুযোগ-সুবিধার বাইরে রয়েছে। এ অঞ্চলের বাসিন্দা ও অভিভাবক হিসেবে আমি বলতে চাই বিদ্যালয়টির প্রতি সরকারের সুনজর দেওয়া উচিত।’

বিদ্যালয়টির বিষয়ে জানতে চাইলে মিরসরাই উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফেরদৌস হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘মিরসরাইয়ের করেরহাট ইউনিয়নের কয়লা পশ্চিম সোনাই উচ্চবিদ্যালয়টি পাহাড়ি দুর্গম এলাকায় অবস্থিত। সম্প্রতি দায়িত্ব নেওয়ার পর পরই আমি প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শন করেছি। সার্বিক পরিস্থিতি দেখে সেখানে একটি ভবনের ব্যবস্থা করতে নথিপত্র দিয়ে মিরসরাইয়ের সংসদ সদস্যকে অনুরোধ করেছি। বিদ্যালয়টির উন্নয়নে আমি সব ধরনের সহযোগিতা করব।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মিরসরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সোমাইয়া আক্তার বলেন, ‘বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্ত করার শর্ত পূরণ করতে পারলে আমরা মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ পাঠাব। তা ছাড়া অন্যান্য আরও যত সহযোগিতা করা যায় আমরা সাধ্যমতো তা করার চেষ্টা করব।’