সাগরে ইলিশ আহরণ বাড়লেও দাম কমেনি বাজারে

বিক্রির জন্য ইলিশ সাজিয়ে রাখা হয়েছে। আজ সকালে চট্টগ্রাম নগরের কর্ণফুলী কমপ্লেক্স বাজারেছবি: প্রথম আলো

সাগরে জেলি ফিশের আধিক্য, জলবায়ু পরিবর্তনসহ নানা কারণে গত কয়েক বছর সাগরে মাছ ধরা ব্যাহত হয়েছে। এর সঙ্গে গত মার্চ মাসে যুক্ত হয়েছে জ্বালানিসংকট। ফলে বৈশাখের আগে জেলেদের দুশ্চিন্তা ছিল ইলিশের দেখা নিয়ে। তবে সেই দুশ্চিন্তা দূর হয়েছে। বঙ্গোপসাগরের চট্টগ্রাম উপকূলে জেলেদের জালে ধরা পড়ছে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ।

মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ মাসে চট্টগ্রাম উপকূলে যে পরিমাণ ইলিশ আহরিত হয়েছে, তা আগের বছরের মার্চের তুলনায় প্রায় ১০ গুণ বেশি। সামগ্রিকভাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসের তুলনায় চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ইলিশ আহরণ বেশি হয়েছে প্রায় আড়াই গুণ।

চট্টগ্রাম নগরের পতেঙ্গা, হালিশহর, কাট্টলীসহ উপকূলীয় এলাকায় জেলেরা সাগরে মাছ ধরেন। এ ছাড়া সন্দ্বীপ, সীতাকুণ্ড, মিরসরাই, আনোয়ারা ও বাঁশখালীর জেলেরাও সাগরে মাছ শিকার করেন। মৎস্য কর্মকর্তারা জানান, মার্চে ইলিশ আহরণ ভালো থাকায় এবার বৈশাখে বাজারে দাম কিছুটা কম থাকার কথা। তবে আহরণ করা বেশির ভাগ মাছ আকারে ছোট।

মৎস্য দপ্তর জানায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত চট্টগ্রামে ইলিশ আহরণ হয়েছিল ১ হাজার ৫৫৭ টন। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে তা বেড়ে প্রায় ৫ হাজার টনে দাঁড়িয়েছে। মার্চ মাসে প্রায় ১৬৭ টন ইলিশ ধরা পড়েছে কুতুবদিয়া চ্যানেল ও সাঙ্গু নদে। বঙ্গোপসাগরে নগরের জেলেরা আহরণ করেছেন প্রায় ১০০ টন ইলিশ।

চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলার পাঁচ উপজেলা ও নগরের জেলেরা সাগরে ইলিশ শিকার করেন। আনোয়ারা ও বাঁশখালীর জেলেরা সাগরের পাশাপাশি সাঙ্গু নদ এবং সন্দ্বীপের জেলেরা মেঘনা নদীতেও মাছ ধরেন। গত মার্চে নগর ও এসব এলাকার জেলেদের জালে প্রায় ৫০৮ টন বা প্রায় ৫ লাখ কেজি ইলিশ আহরিত হয়েছে। এর আগের বছরের মার্চে ইলিশ আহরিত হয়েছিল ৫০ টনের মতো।

মৎস্য দপ্তর জানায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত চট্টগ্রামে ইলিশ আহরিত হয়েছিল ১ হাজার ৫৫৭ টন। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে তা বেড়ে প্রায় ৫ হাজার টনে দাঁড়িয়েছে। মার্চ মাসে প্রায় ১৬৭ টন ইলিশ ধরা পড়েছে কুতুবদিয়া চ্যানেল ও সাঙ্গু নদে। বঙ্গোপসাগরে নগরের জেলেরা আহরণ করেছেন প্রায় ১০০ টন ইলিশ।

সাগরের ইলিশ বেশি

দেশে ইলিশ আসে নদী ও সমুদ্র থেকে। পদ্মা ও মেঘনার ইলিশের চাহিদা বেশি। কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম উপকূলের সাগরের ইলিশের চাহিদাও রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সাগরে ইলিশ মিললেও নদীতে ইলিশ কম পাওয়া যাচ্ছে। তবে ৬ এপ্রিল কক্সবাজারের টেকনাফে একটি ট্রলারের জালে একসঙ্গে ধরা পড়েছে ১০১ মণ ইলিশ।

দেশে মোট ইলিশের ১৫–১৬ শতাংশ আসে বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে। সামুদ্রিক মৎস্য দপ্তরের হিসাবে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাণিজ্যিক জাহাজের মাধ্যমে সাগরে ইলিশ আহরিত হয়েছে ১৭ লাখ ৯০ হাজার ২৭৬ কেজি; মাসে গড়ে প্রায় দেড় লাখ কেজি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) আহরিত হয়েছে ১৩ লাখ ১৫ হাজার ২৬৩ কেজি। মাসে গড়ে প্রায় ১ লাখ ৮৮ হাজার কেজি।

দেশে সাধারণত জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ইলিশের মৌসুম ধরা হয়। বর্তমানে মৌসুম না থাকায় ও জ্বালানিসংকটে জেলেদের সাগরে যাওয়া কমেছে। ১৫ এপ্রিল সাগরে শুরু হচ্ছে ৫৮ দিনের মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা। পাশাপাশি জাটকা সংরক্ষণে ১ মার্চ থেকে চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনা নদীতে দুই মাসের নিষেধাজ্ঞা চলছে।

মৎস্য অধিদপ্তর চট্টগ্রামের পরিচালক মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, গত অর্থবছরের তুলনায় চলতি সময়ে ইলিশ আহরণ নদীতে কিছুটা কমেছে। তবে নদীতে প্রচুর পরিমাণে জাটকা রয়েছে। সংরক্ষণ করা গেলে আগামী মৌসুমে নদীতেও ইলিশ উৎপাদন বাড়বে। নদীতে ইলিশ কমে যাওয়ার পেছনে জলবায়ু পরিবর্তন, নদী ভরাট, পানিদূষণ এবং অতিরিক্ত আহরণ দায়ী।

বাজারে দাম কমেনি

দেশে সারা বছরই ইলিশের চাহিদা থাকে। পয়লা বৈশাখ ঘিরে চাহিদা আরও বাড়ে। সরকারি হিসাবে চট্টগ্রামে ইলিশ আহরণ বাড়লেও দাম কমেনি; বরং বেড়েছে। সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাবে গত এক বছরে ইলিশের দাম ১৫ শতাংশের মতো বেড়েছে। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরও বলছে একই কথা। টিসিবির তথ্য বলছে, গত মার্চে বাজারে ইলিশ ৬০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।

আজ সোমবার বেলা সাড়ে ১১টায় নগরের কর্ণফুলী কমপ্লেক্স বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ৩০০ গ্রাম থেকে ১ কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে। পদ্মার ইলিশ দাবি করা এসব মাছের দাম চাওয়া হচ্ছে কেজি ১ হাজার ১০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকা। তবে বাজারে ইলিশের ক্রেতা তেমন দেখা যায়নি। অধিকাংশই দাম জেনে সরে পড়ছেন। বাজারেই কথা হয় ব্যবসায়ী রোকন উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘বৈশাখে ইলিশ লাগবে, এমন নয়, তবে স্ত্রী ও বাচ্চারা আবদার করেছে। দেখে পদ্মার মনে হয়নি, তাই নেওয়া হয়নি।’

চট্টগ্রাম সামুদ্রিক বোট মালিক সমিতির যুগ্ম মহাসচিব মো. ইসমাইলের দাবি, ইলিশের আহরণ তেমন বাড়েনি। সরকারি হিসাবের সঙ্গে জেলেদের হিসাব মেলে না। ফলে দামও সেভাবে কমেনি। আড়তেই এখন ছোট আকারের ইলিশ কেজিপ্রতি ৬০০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

জানতে চাইলে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ফয়েজ উল্যাহ প্রথম আলোকে বলেন, বৈশাখ ঘিরে বাজারে ইলিশের সরবরাহ ও দামের ওপর নজরদারি রয়েছে। কোনো ব্যবসায়ী বা আড়তদার মজুত করে দাম বাড়ানোর চেষ্টা করলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।