অধিদপ্তরের নির্দেশ না মেনে ডিজিটাল হাজিরা যন্ত্র কিনতে ২২৭ বিদ্যালয়কে ‘বাধ্য’ করার অভিযোগ

নোয়াখালী জেলার মানচিত্র

ক্রয় নিয়ে অনিয়মের কারণে দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে উন্নয়ন পরিকল্পনা খাতের টাকা থেকে শিক্ষকদের জন্য ডিজিটাল হাজিরা যন্ত্র না কিনতে বছর তিনেক আগে নির্দেশনা দিয়েছিল প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তর। তবে সে নির্দেশনা অমান্যের অভিযোগ উঠেছে নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার ২২৭টি বিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকেরা অভিযোগ করেছেন, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার ‘চাপে’ নতুন করে এ যন্ত্র কিনতে ‘বাধ্য’ হয়েছেন তাঁরা।

হাতিয়ার কয়েকটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকেরা প্রথম আলোর কাছে অভিযোগ করে বলেন, সম্প্রতি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মোসলেম উদ্দিন বিদ্যালয়ের উন্নয়ন পরিকল্পনা (স্লিপ) খাতের টাকা থেকে সবগুলো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে ডিজিটাল হাজিরা যন্ত্র কেনার নির্দেশনা দেন। একই সঙ্গে তিনি মার্স অ্যাডুকিট লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে যন্ত্রটি বিদ্যালয়ে বিদ্যালয়ে সরবরাহের দায়িত্ব দেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন শিক্ষক বলেন, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার পীড়াপীড়ির কারণেই তাঁরা স্লিপ খাতের টাকা থেকে ছয় হাজার টাকা দিয়ে ডিজিটাল হাজিরা যন্ত্র কেনেন। তাঁর নির্ধারণ করে দেওয়া প্রতিষ্ঠান থেকে যন্ত্রটি না কেনায় ক্ষুব্ধ হন মোসলেম উদ্দিন। একবার কেনা যন্ত্রটি ফেরত দিয়ে মার্স অ্যাডুকিট নামের প্রতিষ্ঠানটি থেকে পুনরায় ১৯ হাজার টাকা দিয়ে যন্ত্রটি কিনতে প্রধান শিক্ষকদের বাধ্য করেন তিনি।

বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিদ্যালয় পর্যায়ের বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য সরকারিভাবে প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীসংখ্যার অনুপাতে বার্ষিক ৫০ হাজার থেকে ৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়। এ টাকা দিয়ে প্রধান শিক্ষকেরা বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটি ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পরামর্শ করে বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করেন।

শিক্ষকেরা জানান, ইতিপূর্বে ২০১৯ সালে উন্নয়ন পরিকল্পনার টাকায় দেশের বিভিন্ন বিদ্যালয়ে ডিজিটাল হাজিরা যন্ত্র কেনার হিড়িক পড়ে। তখন একশ্রেণির অসাধু শিক্ষক ও শিক্ষা কর্মকর্তা যন্ত্রটি কেনার ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মো. বদিয়ার রহমান স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে এই খাতের টাকায় ডিজিটাল হাজিরা যন্ত্র না কেনার নির্দেশনা দেওয়া হয়।

অভিযোগকারী শিক্ষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁরা ছয় হাজার টাকা দিয়ে যে ডিজিটাল হাজিরা যন্ত্র কিনেছেন, সেটির সঙ্গে হাতিয়া উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার ‘পছন্দের প্রতিষ্ঠানের’ সরবরাহ করা ডিজিটাল হাজিরা যন্ত্রের কোনো তফাত নেই। তবুও তাঁদের ১৩ হাজার টাকা বেশি গুনতে হয়েছে।

শিক্ষকদের অভিযোগ, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের নিষেধ সত্ত্বেও বিদ্যালয়ের উন্নয়ন পরিকল্পনা খাতের টাকা থেকে এ যন্ত্র কিনতে বাধ্য করা হয়েছে। এতে উপজেলার ২২৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অতিরিক্ত খরচ হয়েছে ৪৩ লাখ ১৩ হাজার টাকা।

ডিজিটাল হাজিরা যন্ত্র সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান মার্স অ্যাডুকিট লিমিটেডের কর্মকর্তা মো. আল আমিন প্রথম আলোকে বলেন, ৫ হাজার ৯০০ টাকার ডিজিটাল হাজিরা যন্ত্র ১৯ হাজার টাকায় সরবরাহ করার তথ্যটি সঠিক নয়। তাঁদের সরবরাহ করা যন্ত্রটিতে বায়োমেট্রিক ডিভাইসের পাশাপাশি তিন বছরের ওয়ারেন্টি দেওয়া আছে। ডিভাইসের সঙ্গে এক বছরের ইন্টারনেট ডেটা, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, বিদ্যালয়ে গিয়ে যন্ত্র স্থাপন এবং প্রতিটি যন্ত্রে একটি সফটওয়্যার দেওয়া হচ্ছে, যার মাধ্যমে হাজিরা পর্যবেক্ষণ করা যাবে।

শিক্ষকদের অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্যের জন্য উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মোসলেম উদ্দিনের মুঠোফোনে কল দিয়ে প্রথম আলোর পরিচয় দেওয়ার পর তিনি উত্তেজিত কণ্ঠে বলেন, ‘কী সমস্যা আপনার?’ তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ বিষয়ে কথা বলতে ফোন দেওয়া হয়েছে জানালে তিনি বলেন, ‘আমার সমস্যা দেখার জন্য ডিপার্টমেন্ট আছে। আমি ব্যস্ত আছি।’ এরপর ফোন কেটে দেন তিনি। তারপর একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

নিয়মবহির্ভূত এমন কেনাকাটার বিষয়ে ‘কিছুই জানেন না’ বলে জানিয়েছেন নোয়াখালী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. সাইদুল ইসলাম। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, উন্নয়ন পরিকল্পনা খাতের টাকায় ডিজিটাল হাজিরা যন্ত্র না কেনার জন্য প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে নিষেধ আছে। এরপরও হাতিয়া উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা কিসের ভিত্তিতে সেটি কিনছেন, তা খতিয়ে দেখা হবে।