করোনায় আক্রান্ত ভাইকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে রত্নার দুই দিনের লড়াই

করোনা আক্রান্ত ভাইকে হাসপাতালে ভর্তি করানোর অপেক্ষায় রত্না আরা। আজ বুধবার দুপুরে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে
প্রথম আলো

হাসপাতাল থেকে বাড়ি, আবার বাড়ি থেকে হাসপাতাল। মাঝে করোনায় আক্রান্ত ভাইয়ের শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়েছে, ভর্তি করানোর জন্য হাসপাতালের বাইরে দাঁড়িয়ে অসহায়ের মতো কান্নাকাটি করেছেন। তিন দফায় টিকিট কেটেছেন। তবুও ভর্তি করাতে পারেননি। নিজেই এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করে অক্সিজেন মাপার যন্ত্র কিনেছেন। অনলাইনে খুঁজে খুঁজে সংগ্রহ করেছেন অক্সিজেন সিলিন্ডার।

করোনায় আক্রান্ত ভাইকে সঙ্গে নিয়ে গত দুই দিন এভাবে কেটেছে রাজশাহীর ষষ্ঠীতলা এলাকার রত্না আরার। শেষ পর্যন্ত আজ বুধবার রত্নার ভাই আবু সাঈদের (৪২) ঠাঁই হয়েছে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডের বারান্দায়।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, করোনায় আক্রান্ত রোগীর শয্যা-সংকট দেখা দিয়েছে। শুধু যেসব রোগীদের অক্সিজেন স্যাচুরেশন কম, অবস্থা বেশি খারাপ, তাঁদেরই ভর্তি করা হচ্ছে। অন্য রোগীদের ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

আজ বুধবার সকালে ৩ নম্বর টিকিট কেটেও ভাইকে ভর্তি করাতে না পেরে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে কান্নাকাটি শুরু করেন রত্না। তাঁরা ছয় ভাইবোনের মধ্যে আবু সাঈদই সবার ছোট।

গত ২৬ মে পরীক্ষায় তাঁর ভাই করোনা পজিটিভ হন। সেই দিন ৯০০ টাকা দিয়ে অক্সিজেন মাপার পালস অক্সিমিটার যন্ত্র কিনে নেন। এরপর থেকে অনলাইনে একটি বেসরকারি রোগ নির্ণয়কেন্দ্রের চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে চিকিৎসা করাচ্ছিলেন।

সাঈদের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে গতকাল মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান রত্না। ভর্তি করার জন্য টিকিট কাটেন কিন্তু তখন হাসপাতালে ভর্তি না নিয়ে জরুরি বিভাগেই একটি অক্সিজেন মাস্ক লাগিয়ে দেওয়া হয়। আধা ঘণ্টা পর সাঈদ কিছুটা ভালো বোধ করেন। তাই তাঁকে আর ভর্তি নেওয়া হয়নি।

রাতে ভাইকে নিয়ে বাড়ি যান রত্না। রাত ২টার দিকে আবারও সাঈদের শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। তখন অনলাইন ঘেঁটে অক্সিজেন সিলিন্ডার সরবরাহকারী একটি প্রতিষ্ঠানের ফোন নম্বর পান। ফোন করে অক্সিজেনের সিলিন্ডার অর্ডার দেন। রাতেই তারা সিলিন্ডার পৌঁছে দেয়। পরদিন সকালে অক্সিজেনের মাত্রা ৯০-এর নিচে নেমে গেলে সাঈদকে আবারও হাসপাতালে নেন রত্না। ভর্তির জন্য আবার টিকিট কাটেন কিন্তু এবারও ভর্তি নিতে আপত্তি করেন জরুরি বিভাগের দায়িত্বরত চিকিৎসক। অন্যদিকে ভাইয়ের অবস্থা খারাপ হতে দেখে কাঁদতে শুরু করেন রত্না।

রত্না বলেন, ভাইকে হাসপাতালে ভর্তির জন্য তিনি দুই দিনে তিনবার টিকিট কেটেছেন কিন্তু ভর্তি করাতে পারেননি। আজ বুধবার কান্নাকাটি শুরু করলে তাঁকে করোনা ওয়ার্ডগুলো ঘুরে দেখে আসতে বলা হয়। বেড খালি থাকলে ভর্তি করা হবে। তিনি ভাইকে একা রেখে যেতে চাননি। শেষ পর্যন্ত তাঁর ভাইকে ২৯ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তির জন্য পাঠানো হয়।

সেখানে গিয়ে দেখেন কোনো বেড খালি নাই। নার্সরা বলেন, জায়গা নাই, রোগী নিতে পারবেন না। পরে সাঈদকে ওয়ার্ডের মেঝেতে রাখা হয়। কোনো চিকিৎসক দেখেননি। মেঝেতে অক্সিজেন সরবরাহেরও কোনো ব্যবস্থা নেই। দুপুর ১২টার দিকে সাঈদকে ৩ নম্বর ওয়ার্ডে পাঠানো হয়। রত্না ভাইকে নিয়ে সেখানে যান। পরে বলা হয়, ওয়ার্ডের কেবিনের চিকিৎসককে আগে দেখাতে হবে। কেবিনে গিয়ে দেখেন তালা দেওয়া। কোনো চিকিৎসকও নেই। এই অবস্থায় ভাইকে ওয়ার্ডের বারান্দায় পাতা একটি চৌকির ওপরে বসিয়ে রাখেন।

রত্না বলেন, ওয়ার্ডের ভেতর থেকে কাচের ফাঁক দিয়ে তাঁদের কাগজপত্র নেওয়া হয়। এরপর আর কেউ যোগাযোগ করেননি।

রত্নাকে আজ বুধবার হাসপাতালে এমন ছোটাছুটি করতে দেখে বিষয়টি মুঠোফোনে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানীকে জানান এই প্রতিবেদক। তখন পরিচালক বলেন, প্রতিদিনই কিছু রোগীকে ছুটি দেওয়া হচ্ছে। তখন কিছু বেড খালি হচ্ছে। তারপরই নতুন রোগী ভর্তি করা যাচ্ছে। পরিচালক তাঁর ফোন নম্বরটি রত্নাকে দিয়ে কল করতে বলেন।

প্রতিবেদকের কাছে থেকে নম্বর পেয়ে পরিচালককে কল করেন রত্না। এরপর বেলা একটার দিকে বারান্দার ওই চৌকিতেই রত্নার ভাইকে অক্সিজেনের সংযোগ দেওয়া হয়। বেলা আড়াইটার দিকে যোগাযোগ করা হলে রত্না বলেন, ভেতর থেকে তাঁকে জানানো হয়েছে, বিকেল পাঁচটার দিকে একটি বেড খালি হবে। তখন তাঁর ভাইকে ওয়ার্ডের ভেতরে নেওয়া হবে।

রামেক উপপরিচালক সাইফুল ফেরদৌস জানান, হাসপাতালের আটটি ওয়ার্ড, কেবিন ও আইসিইউ মিলে মোট করোনা শয্যার সংখ্যা ২৩২টি। ১ নম্বর ওয়ার্ডটি করোনা ওয়ার্ড হিসেবে প্রস্তুত করা হচ্ছে। এটি হলে আরও ৩২টি শয্যা বাড়বে।