কারামুক্ত কয়েদিদের নতুন জীবন দেওয়ার উদ্যোগ

দীর্ঘমেয়াদে কারাভোগ করে মুক্তি পাওয়া কয়েদিদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিয়েছে বগুড়া জেলা অপরাধী সংশোধন ও পুনর্বাসন সমিতি এবং সমাজসেবা অধিদপ্তর। এক কারামুক্ত কয়েদির হাতে গরু হস্তান্তর করছেন জেলা প্রশাসক
প্রথম আলো

প্রায় ২৪ বছর কারাগারে কাটিয়ে ১ ডিসেম্বর মুক্তি পান বাদশা প্রামাণিক। বয়স এখন ৬৫ বছর। বাড়ি বগুড়ার ধুনট উপজেলার আনারপুর দহপাড়া গ্রামে। ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন মামলায় সাজা খেটে বগুড়া কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্ত হলেও এই বয়সে নতুন করে জীবন চালানোর পথ খুঁজে পেতে অনেকটা দিশেহারা ছিলেন তিনি। সহায়সম্বল বিক্রি করে মামলা চালাতে গিয়ে এই দিনমজুরের বসতভিটা ছাড়া এখন কিছুই নেই। সংসারে স্ত্রী, দুই ছেলে। অভাবের কারণে তিনজনই পোশাক কারখানায় কাজ করছেন।

কারামুক্ত কয়েদি বাদশা প্রামাণিক যাতে মুক্ত জীবনে কিছু একটা করে সংসার চালাতে পারেন, সে জন্য জেলা অপরাধী সংশোধন ও পুনর্বাসন সমিতি এবং সমাজসেবা অধিদপ্তর তাঁকে একটি গরু কিনে দিয়েছে। ওই সমিতির সভাপতি ও বগুড়ার জেলা প্রশাসক মো. জিয়াউল হক গতকাল বুধবার তাঁর কার্যালয় চত্বরে বাদশা প্রামাণিকের হাতে গরু হস্তান্তর করেন। এই গরু দিয়ে এখন সংসারে সুদিন ফেরানোর আশা তাঁর।

শুধু বাদশা প্রামাণিক নয়, জেলা অপরাধী সংশোধন ও পুনর্বাসন সমিতি কারাগার থেকে মুক্ত তিনজন কয়েদিকে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে গতকাল দুই কয়েদির হাতে গরু তুলে দেওয়া হয়। অন্যজনকে কাঠের আসবাব তৈরির সরঞ্জাম কিনে দেওয়া হয়।

বাদশা প্রামাণিক বলেন, ‘বর্গাচাষ করে সংসার চলত। বাড়িতে হালের গরুও ছিল। ছিল দুধেল গাই। জমিজমা ও পারিবারিক বিষয় নিয়ে প্রতিবেশীর সঙ্গে বিরোধ ছিল। সেই বিরোধের জেরে ধর্ষণের মামলায় ১৯৯৭ সালে কারাগারে ঢুকেছিলাম। ১৯৯৯ সালে মামলার রায়ে যাবজ্জীবন সাজা হয়। টানা ২৪ বছর পর ১ ডিসেম্বর কারামুক্ত হয়ে বেড়িয়ে আসি। কারাগারে থাকতেই বড় মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। দুই ছেলের বয়স যথাক্রমে ২৬ ও ২৪ বছর। স্ত্রী ও ছেলেরা গার্মেন্টসে কাজ করে। বসতভিটা ছাড়া সংসারে কিছুই নেই। এখন উপহারের গরুটা পালন করব। বাকি জীবন সৎ পথে বেঁচে থাকার চেষ্টা করব।’

জেলা অপরাধী সংশোধন ও পুনর্বাসন সমিতি কারাগার থেকে মুক্ত তিনজন কয়েদিকে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে গতকাল দুই কয়েদির হাতে গরু তুলে দেওয়া হয়। অন্যজনকে কাঠের আসবাব তৈরির সরঞ্জাম কিনে দেওয়া হয়।

বাদশা প্রামাণিকের মতোই গতকাল গরু উপহার পেয়েছেন আরেক কারামুক্ত কয়েদি বাদশা মিয়া, তাঁর বয়স এখন ৫০ বছর। গ্রামের বাড়ি বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার শ্মশানকান্দি গ্রামে হলেও এখন তিনি বসবাস করছেন বগুড়া শহরের বেজোড়া এলাকায়। কারাগারে যাওয়ার আগে তিনি অন্যের বাড়িতে দিনমজুরি দিতেন। খাসজমি ও পারিবারিক বিষয়াদি নিয়ে বিরোধের জেরে প্রতিবেশীকে হত্যা মামলার রায়ে ২০১৬ সালের ৩০ মে সাত বছরের সাজা মাথায় নিয়ে কারাগারে ঢোকেন তিনি। পাঁচ বছর তিন মাস সাজা খাটার পর বের হন এ বছরের ২৫ আগস্ট।

বাদশা মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘২০০৬ সালে গ্রেপ্তার হই। পাঁচ মাস হাজতবাস করি। ২০০৮ সালে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করা হয়। রায়ে খালাস পেলেও বাদী হাইকোর্টে আপিল করেন। ২০১৬ সালের ৩০ মে আপিলের রায়ে দোষী সাব্যস্ত করে আমাকে সাত বছর সাজা দেওয়া হয়। এ বছরের আগস্টে কারাগার থেকে মুক্ত হয়েছি। এখন বাড়িতে সহায়সম্বল বলতে কিছুই নেই। মেয়েটা অনার্সে পড়াশোনা করছে। ছেলেটা স্কুলে পড়ছে। কীভাবে সংসার চালাব সেই চিন্তায় দিশেহারা ছিলাম। একটা গরু পেলাম, একটি আয়ের উৎস হলো। আমি আবার ঘুরে দাঁড়াতে চাই। স্ত্রী, ছেলে ও মেয়েকে নিয়ে নতুনভাবে বাঁচতে চাই।’

২২ বছর ৬ মাস কারাগারে কাটিয়ে গত বছরের ১ অক্টোবর মুক্তি পান বগুড়ার কাহালু উপজেলার ভাদাহারের বাসিন্দা আকবর আলী, বয়স এখন ৬৫ বছর। এ বয়সে শুরু করেছেন নতুন জীবন। হত্যা মামলার সাজা খাটার সময় কারাগারেই কাঠমিস্ত্রির কাজ শিখেছিলেন। মুক্তি পেয়ে সেই কাজটিকেই পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। তিনি যাতে মুক্ত জীবনেও কাঠমিস্ত্রির কাজ করে সংসার চালাতে পারেন, সে জন্য সমাজসেবা অধিদপ্তর ও জেলা অপরাধী সংশোধন ও পুনর্বাসন সমিতি তাঁকে যন্ত্রপাতি কিনে দেয়। আকবর এখন নিজের বাড়িতে আসবাব তৈরির কাজ করছেন।

আকবর বলেন, ‘কারাগারে ঢুকেছিলাম অপরাধী হিসেবে। বের হয়েছি কর্মঠ মানুষ হিসেবে। কাঠমিস্ত্রির প্রশিক্ষণটা খুব কাজে দিয়েছে। এখন নিজে উপার্জন করতে পারছি।’

গতকাল কারামুক্ত তিন কয়েদির হাতে গরু ও কাঠমিস্ত্রির সরঞ্জাম তুলে দেওয়ার সময় জেলা প্রশাসক ছাড়াও জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের বগুড়ার উপপরিচালক এ এস এম কাওছার রহমান, বগুড়া কারাগারের জেল সুপার মনির আহমেদ, সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রবেশন কর্মকর্তা আবু সালেহ মো. নূহ, লিগ্যাল এইড প্রতিষ্ঠান ব্লাস্টের জেলা প্রকল্প কর্মকর্তা জিপিআর প্রকল্পের প্যারালিগ্যাল টিম প্রধান হুসনে নূর রশীদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের বগুড়ার উপপরিচালক এ এস এম কাওছার রহমান প্রথম আলোকে জানান, কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর বন্দীরা যাতে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন, পরিশ্রম করে আয় করতে পারেন—এ জন্য সমাজসেবা অধিদপ্তর পরিচালিত জেলা অপরাধী সংশোধন ও পুনর্বাসন সমিতি কারামুক্ত বন্দীদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিয়েছে।