কুমিল্লায় অযত্ন ও অবহেলায় জাতীয় কবির স্মৃতিফলকগুলো

কুমিল্লা জেলা শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণে স্থাপিত ‘চেতনায় নজরুল’ ম্যুরাল অযত্ন ও অবহেলায় পড়ে আছে। ছবিটি সম্প্রতি তোলা
প্রথম আলো

জাতীয় পর্যায়ের নজরুলজয়ন্তী অনুষ্ঠান উপলক্ষে ১৯৯২ সালের ২৫ মে কুমিল্লা জেলা শিল্পকলা একাডেমি চত্বরে ‘চেতনায় নজরুল’ নামের একটি ম্যুরাল স্থাপন করা হয়। এরপর থেকে প্রতিবছর কবির জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকীতে মুর‍্যালটিতে জেলা প্রশাসন ও সংস্কৃতিকর্মীরা পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে আসছেন। কিন্তু স্মৃতিফলকটি অযত্ন ও অবহেলায় পড়ে আছে। ফলকের নামও প্রায় মুছে গেছে।

‘চেতনায় নজরুলের’ মতো কুমিল্লা শহরে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের অন্যান্য স্মৃতিফলকও অযত্ন ও অবহেলায় অস্তিত্ব হারাতে বসেছে।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৪৫তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ শুক্রবার। ১৯৭৬ সালের ২৭ আগস্ট (১৩৮৩ বঙ্গাব্দের ১২ ভাদ্র) তিনি ঢাকায় পিজি হাসপাতালে (বর্তমানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়) শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। কবির কুমিল্লায় আগমনের ১০০ বছরও পূর্তি হচ্ছে এ বছর।

নজরুল–গবেষক আলী হোসেন চৌধুরী বলেন, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ১৯২১ সালের এপ্রিল মাস থেকে ১৯২৪ সালের জানুয়ারি মাস পর্যন্ত ৫ দফায় ১১ মাস কুমিল্লায় ছিলেন। এর মধ্যে ১৯২১ সালের ২১ নভেম্বর ব্রিটিশ নেতা প্রিন্স অব ওয়েলসের কলকাতা আগমনের দিন ছিল ওই দিন। এ উপলক্ষে ওই দিন ভারতীয় কংগ্রেসের ডাকা হরতাল ছিল। ওই হরতালের মধ্যে কবি নজরুল কুমিল্লায় গলায় হারমোনিয়াম ঝুলিয়ে প্রতিবাদী গানে মিছিল করেন। ওই অপরাধে কবিকে কুমিল্লা শহরের রাজগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে জনতার দাবির মুখে কোতোয়ালি থানায় কয়েক ঘণ্টা আটক রেখে ছেড়ে দেওয়া হয়। ১৯২২ সালের ২৩ ডিসেম্বর বিকেলে ‘আনন্দময়ীর আগমন’ কবিতার জন্য কবিকে শহরের ঝাউতলা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। পরদিন তাঁকে কলকাতায় নিয়ে যাওয়া হয়।

আলী হোসেন চৌধুরী আরও বলেন, কবি কুমিল্লা শহরের ঝাউতলা, ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের উচ্চমাধ্যমিক শাখার পূর্ব-দক্ষিণ কোণে, নজরুল অ্যাভিনিউ, ফরিদা বিদ্যায়তন, দারোগা বাড়ি, ঝানু মিয়ার বাড়ি, শচীন দেব বর্মণের বাড়ি, বসন্ত স্মৃতি পাঠাগার ও প্রমীলার বাড়ি ও কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার দৌলতপুরে বসে সংগীতচর্চা করেছেন। কাব্য রচনা করেছেন। সংস্কৃতিপাগলদের সঙ্গে মিশে গলা ছেড়ে গান গেয়েছেন। কুমিল্লায় দুটি বিয়েও করেছেন তিনি।

১৯৮৩ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর নজরুল স্মৃতিরক্ষা পরিষদের উদ্যোগে কবির স্মৃতিবিজড়িত কুমিল্লার এসব স্থানে স্মৃতিফলক বসানো হয়। এরপর সেগুলোর বেশির ভাগই সংস্কার করা হয়নি। উল্টো নজরুল অ্যাভিনিউর স্মৃতিফলকে ডাস্টবিন বানানো হয়েছে। ২০১৭ সালে নজরুল অ্যাভিনিউ এলাকার একটি ফলক ট্রাক চাপা দিয়ে ভেঙে ফেলে। ২০২০ সালে গণমাধ্যমকর্মীদের তত্পরতায় সেটি পুনরায় লাগানো হয়।

শহরের ঝাউতলা এলাকার স্মৃতিফলকের লেখা মুছে গেছে। ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের উচ্চমাধ্যমিক শাখার পূর্ব-দক্ষিণ কোণের স্মৃতিফলকটি ঝোপজঙ্গলে ভরা, ফরিদা বিদ্যায়তনের স্মৃতিফলকটি ঘিরে থাকা বিভিন্ন ভাসমান দোকানে ঢাকা পড়েছে। দারোগা বাড়ির স্মৃতিফলকের লেখা উঠে গেছে, ঝানু মিয়ার বাড়ি, শচীন দেব বর্মণের বাড়ি, মুরাদনগর উপজেলার দৌলতপুরের ফলকের লেখাও উঠে গেছে।
নজরুল–গবেষক শান্তিরঞ্জন ভৌমিক বলেন, স্মৃতিচিহ্নগুলো ভালো করে সংরক্ষণ করা দরকার। নতুন প্রজন্ম এ থেকে শিক্ষা নিতে পারবে।

জেলা সংস্কৃতিবিষয়ক কর্মকর্তা সৈয়দ আয়াজ মাবুদ বলেন, এ বছর কবির কুমিল্লায় আগমনের ১০০ বছর পূর্ণ হচ্ছে। জেলা প্রশাসন এই উপলক্ষে কবির সব স্মৃতিচিহ্ন সংস্কারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। করোনা সংক্রমণের কারণে বিধিনিষেধ চলায় এখনো সংস্কারকাজ শুরু হয়নি। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সংস্কার শুরু হবে।

কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ও কুমিল্লার বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ আমীর আলী চৌধুরী বলেন, ২০১৫ সালের ২৫ মে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ১৯৯২ সালের ২৫ মে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া দুবার নজরুলের জাতীয় পর্যায়ের অনুষ্ঠান কুমিল্লায় এসে করেছেন। বর্তমান সরকারের আমলে কুমিল্লায় নজরুল ইনস্টিটিউট কেন্দ্র হয়েছে। কিন্তু কুমিল্লায় কবির সৃষ্টিশীল কর্মযজ্ঞ নিয়ে গবেষণা সেই অর্থে বাড়েনি। স্মৃতিফলকগুলো অযত্ন ও অবহেলায় আছে। এগুলো আরও দৃষ্টিনন্দন করা হোক।

কবির ৪৫তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আজ শুক্রবার সকাল ৯টায় কুমিল্লা জেলা শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণে চেতনায় নজরুল ম্যুরালে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ, রাত আটটায় নজরুল স্মরণে অনলাইনে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এতে সভাপতিত্ব করবেন কুমিল্লা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামরুল হাসান।