
রংপুরে অবস্থিত বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগের শর্ত অনুযায়ী উপাচার্যকে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে সার্বক্ষণিক বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতে হবে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ প্রায়ই ক্যাম্পাসে অনুপস্থিত থাকেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে শিক্ষক, কর্মকর্তা–কর্মচারীদের শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। নানা সমস্যা হওয়ার কারণে শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের সার্বক্ষণিক ক্যাম্পাসে অবস্থানের দাবিতে সম্প্রতি মানববন্ধন করেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, উপাচার্য ২০১৭ সালের ১৪ জুন বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেওয়ার পর গত বৃহস্পতিবার (২৮ মার্চ) পর্যন্ত ৬৫২ দিন অতিবাহিত হয়েছে। শিক্ষক–কর্মকর্তাদের সূত্রগুলো বলছে, এর মধ্যে উপাচার্য ৪৬৫ দিনই ক্যাম্পাসে অনুপস্থিত ছিলেন। এ নিয়ে গণমাধ্যমে খবরও প্রকাশিত হয়েছে। তবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপাচার্য নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, এ তথ্য সঠিক নয়। তাঁরা মনগড়া খবর পরিবেশন করেছেন। প্রতিবাদ করলেন না কেন, তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রয়োজন মনে করিনি।’
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক গাজী মাজহারুল আনোয়ার উপাচার্যের অনুপস্থিতির বিষয়টি নিশ্চিত করে প্রথম আলোকে বলেন, উপাচার্য দীর্ঘ সময় ধরে অনুপস্থিত থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ভাটা পড়ে। এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে শিক্ষক সমিতি ইতিমধ্যে একটি সভা করেছে। উপাচার্যকে শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকে একটি স্মারকলিপিও দেওয়া হতে পারে। কিন্তু কবে নাগাদ দেওয়া হবে, তা নিশ্চিত করা হয়নি।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, গত ২৮ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয় খোলা থাকলেও উপাচার্য ঢাকায় অবস্থান করেন। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের দিন গত ২৩ মার্চ উপাচার্য সকালে এসে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরিচয়পত্র বিতরণ করে পরদিন রোববার আবার ঢাকায় চলে যান। সোমবার বিকেলে আবার ঢাকা থেকে এসে পরদিন মঙ্গলবার স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠান করে ওই দিন সন্ধ্যায় আবার ঢাকায় চলে যান। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন উপাচার্যের একান্ত সচিব আমিনুর রহমান।
শিক্ষক-কর্মচারীরা জানান, বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরিচয়পত্র বিতরণ এবং কোনো সভা কিংবা সেমিনারের আয়োজন থাকলে তিনি ঢাকা থেকে আসেন। এ ছাড়া জাতীয় দিবসেও উপস্থিত থাকেন। এরপর আবার ঢাকায় চলে যান।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা, জীব ও ভূতত্ত্ব অনুষদের ডিন। উপাচার্যের অনুপস্থিতির কারণে এই তিন অনুষদের ১০টি বিভাগের কাজকর্ম যথাসময়ে হচ্ছে না। উপাচার্যকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব পরীক্ষা কমিটির অনুমোদন দিতে হয়। তিনি ছাড়া পরীক্ষার ফল প্রকাশেও বিলম্ব হয়। উপাচার্য নিজে কোষাধ্যক্ষের দায়িত্বে আছেন। তিনি না থাকলে আর্থিক কাজগুলো গতিহীন হয়ে যায়।
এদিকে উপাচার্যের নিয়মিত উপস্থিতির দাবি জানিয়ে গত ২১ মার্চ লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে মানববন্ধন ও সমাবেশ কর্মসূচি পালন করেন। ওই বিভাগের শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, উপাচার্য ক্যাম্পাসে অধিকাংশ সময় অনুপস্থিত থাকায় শিক্ষকেরা পরীক্ষা নিতে চাইলেও যথাসময়ে পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হয় না। যথাসময়ে পরীক্ষা না নেওয়ায় সমস্যায় পড়েন শিক্ষার্থীরা।
লোকপ্রশাসন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান জুবায়ের ইবনে তাহের বলেন, শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে উপাচার্য নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ গত বুধবার ঢাকায় অবস্থান করে মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘ক্যাম্পাসে না থাকায় খুব একটা অসুবিধা হয় না। ক্যাম্পাসে যাওয়ার পর এসব কাজ খুব কম সময়ে করে দিই।’ দিনের পর দিন ক্যাম্পাসে অনুপস্থিতির অভিযোগ প্রসঙ্গে উপাচার্য বলেন, ‘সরকারি–বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন কমিটির সদস্য হওয়ায় এসব মিটিংয়ে আমাকে উপস্থিত হতে ঢাকায় থাকতে হয়। ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের লিয়াজোঁ অফিস রয়েছে। সেখানে আমি দিন-রাত বিশ্ববিদ্যালয়েরই কাজ করে থাকি।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক তাবিউর রহমান প্রধান প্রথম আলোকে বলেন, ‘স্যার (উপাচার্য) সরকারের অনেক প্রতিষ্ঠানের সদস্য। বিভিন্ন সময় ওই সব প্রতিষ্ঠানের ঢাকায় বৈঠক থাকায় তিনি ক্যাম্পাসে নিয়মিত থাকতে পারেন না।’
কর্মকর্তা–কর্মচারীদের আন্দোলন
এদিকে ১১ দফা দাবি জানিয়ে গত ১১ মার্চ থেকে অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতি এবং ১৩ মার্চ থেকে কর্মচারী ইউনিয়ন ১০ দফা দাবি নিয়ে লাগাতার কর্মবিরতি শুরু করে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম পুরোদমে ভেঙে পড়ে। গত ২৪ মার্চ কর্মকর্তারা কর্মবিরতি প্রত্যাহার করে নিলেও কর্মচারীদের লাগাতার আন্দোলন এখনো অব্যাহত আছে। এত দিন খোলা আকাশের নিচে আন্দোলন চললেও গত রোববার কর্মচারীরা শামিয়ানা টানিয়ে আন্দোলন শুরু করেছেন।
অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘আমাদের দাবিগুলো দীর্ঘদিনের। বারবারই আশ্বাস দেওয়া হয়, কিন্তু বাস্তবায়নে কোনো পদক্ষেপ নেই। এ ছাড়া উপাচার্য স্যার প্রায় সময় ঢাকায় থাকেন। দাবি পূরণের আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে গত রোববার (২৪ মার্চ) কর্মবিরতি প্রত্যাহার করা হয়েছে। খুব শিগগির দাবি মানা না হলে আবারও আন্দোলন শুরু করা হবে।’
কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি নূর আলম মিয়া বলেন, ‘উপাচার্য স্যার ক্যাম্পাসে না থাকায় আমরাও তাঁর সঙ্গে কথা বলতে পারি না। আর ঢাকায় যেতে হলে অনেক টাকা ব্যয় হয়। এই টাকা কে দেবে?’
অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের ১১ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে উপাচার্যের একান্ত সচিব ও উপরেজিস্ট্রার (একাডেমিক) আমিনুর রহমানকে অবিলম্বে একান্ত সচিবের পদ থেকে অব্যাহতি দিয়ে অন্য দপ্তরে বদলি, পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের চাকরি স্থায়ীকরণ, যেসব কর্মকর্তার পদবি বদল করা হয়েছে তাঁদের স্বপদে ফিরিয়ে আনা, সরকারি নিয়মে পুলিশ ভেরিফিকেশন ফরম প্রস্তুত করা, প্রতিটি দপ্তরকে নিজস্ব কাজ বুঝিয়ে দিয়ে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করা, ৫৮ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বকেয়া বেতন পরিশোধ করা, হয়রানিমূলক বদলি করা কর্মকর্তাদের নিজ নিজ দপ্তরে পুনর্বহাল, রেজিস্ট্রার অফিসের স্বকীয়তা ও গোপনীয়তা রক্ষা করা ইত্যাদি। কর্মচারীদের দাবির মধ্যে রয়েছে পেনশন নীতিমালা প্রণয়ন, দূরের কর্মচারীদের গাড়ি ও আবাসন সুবিধার ব্যবস্থা, নিয়োগপত্র অনুযায়ী দায়িত্ব, সাময়িক বরখাস্ত কর্মচারীদের মানবিক দিক বিবেচনা, কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতিকে লাঞ্ছিত করার ঘটনার বিষয়ে দ্রুত পদপেক্ষ গ্রহণ।
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাবি প্রসঙ্গে উপাচার্য নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ বলেন, ‘এসব সমস্যা আমার আমলের নয়। আগের ভিসিদের আমলের। এরপরও চেষ্টা করছি তাঁদের সমস্যা সমাধানের।’