ছাত্রলীগ নেতার পরিবারের হুমকিতে আতঙ্কে ব্যবসায়ী
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বাকিতে টাইলস না দেওয়ার জেরে প্রভাবশালী এক ছাত্রলীগ নেতার পরিবারের হুমকিতে জামাল হোসেন নামের এক ব্যবসায়ী আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। দোকানে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার চার দিন পর ব্যবসায়ীকে দিনদুপুরে দোকান থেকে তুলে নিয়ে ছাত্রলীগ নেতার ভাই হুমকি দিয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ভয়ে ওই ব্যবসায়ী ব্যবসা গুটিয়ে জেলা ছেড়ে চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
ওই ব্যবসায়ীরা নাম জামাল হোসেন। তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহরের কুমারশীল মোড় এলাকার মেসার্স ইসলাম টাইলসের স্বত্বাধিকারী। নোয়াখালীর লক্ষ্মীপুরের বাসিন্দা জামাল প্রায় ৩০ বছর ধরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় টাইলসের ব্যবসা করেন। তিনি পরিবার নিয়ে শহরের পাইকপাড়ায় বসবাস করেন। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সদস্য ও ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি রেদোয়ান আনসারি ওরফে রিমুর বড় ভাই রায়হান আনসারি ওরফে রিকুর হুমকি-ধমকি ও উৎপাতে ওই ব্যবসায়ী আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।
দোকানের কর্মচারীরা টাইলস বিক্রির জন্য ৬৪ হাজার ৪০০ টাকার একটি মেমো তৈরি করেন। তখন ১০ হাজার টাকা দিয়ে টাইলসগুলো পাঠানোর জন্য দোকানের কর্মচারীদের নির্দেশ দেন রায়হান।
স্থানীয় লোকজন ও ভুক্তভোগী সূত্রে জানা যায়, দেড় বছর আগে রায়হান আনসারির কাছে জামাল টাইলস বিক্রি করেন। তখন রায়হানের কাছ থেকে ৯ হাজার ২০০ টাকা পাওনা ছিল। টাকার জন্য দীর্ঘদিন মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও রায়হান আনসারি ফোন ধরেননি। অবশেষে গত শুক্রবার রায়হান পাওনা ৯ হাজার টাকা ফেরত দিয়ে যান। তখন রায়হান বাকিতে আরও টাইলস কেনার জন্য বাবু নামের একজনকে সঙ্গে নিয়ে যান। গত শনিবার বিকেলে দোকানে জামাল ছিলেন না। দোকানের কর্মচারীরা টাইলস বিক্রির জন্য ৬৪ হাজার ৪০০ টাকার একটি মেমো তৈরি করেন। তখন ১০ হাজার টাকা দিয়ে টাইলসগুলো পাঠানোর জন্য দোকানের কর্মচারীদের নির্দেশ দেন রায়হান। আরও ১০ হাজার টাকা সন্ধ্যার পর পাঠানো হবে বলে জানান।
তখন দোকানে কর্মরত লোকজন বাকিতে টাইলস পাঠাতে অপারগতা প্রকাশ করেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে রায়হান আনসারি ও তাঁর সঙ্গে থাকা বাবু জামালের টাইলসের দোকান থেকে কর্মচারীদের বের করে দেন। পরে দোকানের শাটার বন্ধ করে তালা দিয়ে চাবি নিয়ে যান। ঘটনার দুই দিন পর গতকাল সোমবার সকালে তালা ভেঙে জামাল দোকান খোলেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে আজ মঙ্গলবার বেলা আড়াইটার দিকে রায়হান আনসারি বাবুকে নিয়ে জামালের দোকানে যান। এ সময় অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন এবং একপর্যায়ে দোকান থেকে জামালকে তুলে নিয়ে যান রায়হান।
আমি কোনো কথা বলতে চাই না। আমি এখানে আর ব্যবসা করব না। ব্যবসা ছেড়ে এখান থেকে চলে যাব।’
দোকানের কর্মচারীরা বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করলেও জামালের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। খবর পেয়ে পুলিশ খোঁজাখুঁজি শুরু করলে সন্ধ্যা ছয়টার দিকে জামালকে ছেড়ে দেন রায়হান।
আশপাশের ব্যবসায়ীরা জানান, শনিবার রায়হান আনসারি দোকানে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার পর রোববার দুপুরে বিষয়টি ব্যবসায়ীরা জেলা টাইলস ব্যবসায়ী মালিক সমিতি, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আল মামুন সরকার ও চেম্বার অব কমার্সকে অবগত করেন। কিন্তু কেউ এসে দোকান খুলে দেয়নি। ভয়ে ভুক্তভোগী জামাল হোসেন আইনগত কোনো ব্যবস্থাও নিতে পারছেন না।
জানতে চাইলে জামাল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি কোনো কথা বলতে চাই না। আমি এখানে আর ব্যবসা করব না। ব্যবসা ছেড়ে এখান থেকে চলে যাব।’
তাঁর (জামাল) দোকান থেকে টাইলস পছন্দ করেছিলাম। কিছু টাকা অগ্রিম, কিছু টাকা ঈদের আগে এবং বাকি টাকা ঈদের পর পরিশোধ করব বলে জানিয়েছিলাম। শনিবার দুপুরে দোকানে গেলেও তাঁকে পাইনি। তখন রাগের মাথায় দোকানের এক কর্মচারীকে বলেছিলাম, দোকান বন্ধ করে চলে যাও। মালিক এলেই দোকান খুলতে বলেছিলাম।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে রায়হান আনসারি প্রথম আলোকে বলেন, ‘তাঁর (জামাল) দোকান থেকে টাইলস পছন্দ করেছিলাম। কিছু টাকা অগ্রিম, কিছু টাকা ঈদের আগে এবং বাকি টাকা ঈদের পর পরিশোধ করব বলে জানিয়েছিলাম। কিছু টাকা পেতেন, যা পরিশোধ করে দিয়েছি। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে দিতে পারিনি। আমি কাজও শুরু করতে পারছিলাম না। শনিবার দুপুরে দোকানে গেলেও তাঁকে পাইনি। তখন রাগের মাথায় দোকানের এক কর্মচারীকে বলেছিলাম, দোকান বন্ধ করে চলে যাও। মালিক এলেই দোকান খুলতে বলেছিলাম। কিন্তু আমি দোকানে তালা দিইনি।’
রায়হান বলেন, ‘তিনি (জামাল) বিভিন্ন জায়গায় দোকানে তালা ঝোলানোর বিষয়ে বিভিন্ন জনকে আমার নাম বলেছেন। আজ তাঁকে দোকান থেকে আমার সঙ্গে নিয়ে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের কার্যালয়ে গিয়েছি। সেখানে তিনি সন্ধ্যার মধ্যে আমার বাকি টাইলস দেবেন বলে জানান। তাঁকে তুলে আনার অভিযোগ সত্য না।’
রায়হানের ভাই রেদোয়ান আনসারি প্রথম আলোকে বলেন, ‘রায়হান ভাই ৬০ হাজার টাকার টাইলস কিনতে চেয়েছিলেন। ২০ হাজার টাকা নগদ এবং বাকি টাকা পরে দেবে জানিয়েছিলেন। কিন্তু দোকানদার হঠাৎ টাইলস দিতে পারবেন না বলে জানান। এটি নিয়ে হয়তো কোনো ঝামেলা হয়েছে।’
জেলা চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি আজিজুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘দোকানে তালা ঝোলানোর বিষয়টি ওই ব্যবসায়ীসহ একাধিক ব্যবসায়ী আমাকে জানিয়েছেন। আইনি প্রক্রিয়ায় না গেলে তো তাঁর পাশে দাঁড়ানো যাবে না।’
জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) লোকমান হোসেন বলেন, ‘বিকেলে ওই ব্যবসায়ীকে আমরা খুঁজে বের করেছি। তবে তিনি অনেক ভীত ও আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। কোনো কিছু বলতে চাইছেন না।’