ছেলের খোঁজে পুণ্যার্থীদের সঙ্গে ভারত হয়ে নেপালে যান আমেনা
স্বামীর মৃত্যুর পর অভাব নেমে আসে বগুড়ার ধুনট উপজেলার আমেনা খাতুনের সংসারে। মেজ ছেলে ফটিক হোসেন কাজের সন্ধানে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমান। মানসিকভাবে ভেঙে পড়া আমেনা খাতুন একসময় অন্য ছেলে ও তাঁদের স্ত্রীদের ওপর অভিমান করে বাড়ি ছাড়েন। এরপরের গল্পটা আমেনার নিজ গ্রামের বাসিন্দাদের কাছেই অনেকটা অবিশ্বাস্য।
বাড়ি ছাড়ার ২৩ বছর পর আবার ফিরে এসেছেন আমেনা। মধ্যবর্তী সময়টা ছিলেন নেপালের কাঠমান্ডুতে। কাজ করতেন একটি হোটেলে। ২৩ বছর আগে তিনি নেপালে গিয়েছিলেন পায়ে হেঁটে। সেখানে কাজ করার ফাঁকে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে ছেলে ফটিক হোসেনকে খুঁজতেন।
আমেনার বয়স এখন প্রায় ৮০। গতকাল সোমবার রাতে তাঁকে ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে আসেন স্বজনেরা। মঙ্গলবারের সকালটা দেখেছেন নিজ জন্মস্থান উপজেলার ছোট চাপড়া গ্রামে বসে। এর আগেই তাঁর দেশে ফেরার কথা ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের গ্রামেও। ভোর থেকেই উৎসুক মানুষ আমেনাকে দেখতে ভিড় করেন ছোট চাপড়া গ্রামে আমেনার বড় ছেলে আমজাদ হোসেনের বাড়িতে।
এ বাড়িতে বসে কথা হয় আমেনার সঙ্গে। নিজেই বলেন, তিনি এখনো মানসিকভাবে পুরোপুরি সুস্থ নন। অনেক প্রশ্নের উত্তরে চুপ করে থাকেন। মাঝেমধ্যে কথা বলেন। গ্রামের আঞ্চলিক ভাষা এখনো ভোলেননি। প্রতিবেশীদেরও চিনতে পারেন। অনেকের নাম ধরেও ডাক দেন।
বাড়ির সামনে একটি চেয়ারে বসে ছিলেন আমেনা। নেপালে কীভাবে গেলেন? থেমে থেমে বলা আমেনার ভাষ্য এমন—বাড়ি থেকে বের হয়ে যশোর হয়ে খুলনায় যান। সেখান থেকে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে একটি মন্দির দেখতে যান। এ মন্দিরের নাম বলতে পারেননি। তবে ওই মন্দিরে আসা ভারতীয় পুণ্যার্থীদের সঙ্গে হেঁটে সীমানা পাড়ি দেন। ভারতে গিয়ে হেঁটে বিভিন্ন স্থানে ঘুরতে ঘুরতে একসময় চলে যান নেপালে। সে দেশের সীমানা কীভাবে পাড়ি দেন, তা স্পষ্ট করে বলতে পারেননি আমেনা।
আমেনা বলেন, নেপালের কাঠমান্ডুতে তিনি একটি হোটেলে কাজ শুরু করেন। সময় পেলেই সেখানকার রাস্তায় ঘুরে ছেলে ফটিকের সন্ধান করতেন। তিনি জানতেন, ছেলে বিদেশে গেছে। নেপাল যেহেতু বিদেশ, তাই এখানে খুঁজলে ছেলেকে পাবেন।
কাঠমান্ডুতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের কনস্যুলার মো. মাসুদ আলমের ইস্যু করা চিঠির সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ৩০ মে নেপালে বাংলাদেশ দূতাবাস আমেনা খাতুনের সন্ধান পায়। তিনি নেপালের সুনসারি জেলার ইনারোয়া শহরে বাসাবাড়ি ও হোটেলে কাজ করতেন।
বার্ধক্যের কারণে কাজ করতে না পেরে রাস্তাঘাট ও ফুটপাতে অবস্থান করছিলেন তিনি। পরে ইনারোয়া পৌরসভার কর্মীরা তাঁকে উদ্ধার করে সুনসারি জেলা প্রশাসনের সেফ হাউসে রাখেন। নেপালের এক ব্যক্তি তাঁর ফেসবুকে বিষয়টি পোস্ট করেন। ওই পোস্টে তিনি আমেনাকে ‘বাংলাদেশি’ বলে উল্লেখ করেন।
পোস্টটির মন্তব্যে নেপালে বাংলাদেশ ইয়ুথ কনক্লেভের চেয়ারম্যান অভিনাভ চৌধুরী বাংলাদেশ দূতাবাসের কনস্যুলারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এরপর বাংলাদেশের একটি গোয়েন্দা সংস্থার সহযোগিতায় বগুড়ার ধুনটের মাজবাড়ি গ্রামে আমেনার পরিবারের খোঁজ মেলে।
১৯৪১ সালে উপজেলার নিমগাছি ইউনিয়নের মাজবাড়ি গ্রামে বিয়ে হয় আমেনার। তাঁর বাবার বাড়ি একই উপজেলার চিকাশি ইউনিয়নের ছোট চাপড়া গ্রামে। গ্রাম দুটি পাশাপাশি। স্বামী আজগর আলী ছিলেন কাঠমিস্ত্রি। অভাবের সংসারে তিন ছেলে ও এক মেয়ে। এ অবস্থায় ১৯৯৫ সালের দিকে আজগর আলী মারা যান। আমেনার স্বজনেরা জানিয়েছেন, এরপর অভাবের সংসার চালাতে গিয়ে একসময় মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন তিনি।
১৯৯৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আমেনার মেজ ছেলে ফটিক হোসেন জীবিকার সন্ধানে মালয়েশিয়ায় যান। এর প্রায় দুই মাস পর বাড়ি থেকে নিখোঁজ হন আমেনা। দীর্ঘদিন খুঁজেও সন্ধান না পেয়ে স্বজনেরা ভেবেছিলেন, আমেনা মারা গেছেন।
তিন বছর মালয়েশিয়ায় থাকার পর দেশে ফিরে আসেন ছেলে ফটিক। তিনি এখন পৈতৃক ভিটা মাজবাড়ি গ্রামে থাকেন। মঙ্গলবার সকালে ফটিক (৫৮) বলেন, দেশে ফেরার পর মাকে খুঁজে না পেয়ে আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। যখন শুনলেন, তাঁকে খুঁজতেই তাঁর মা বিদেশে গেছেন, তখন খুব কষ্ট লেগেছে।
আমেনা খাতুনের বড় ছেলে আমজাদ হোসেন (৬০) বলেন, তিন মাস আগে গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের মাধ্যমে জানতে পারেন, নেপালে তাঁর মাকে পাওয়া গেছে। এরপর তাঁকে সরকারি খরচে দেশে ফেরানোর জন্য আবেদন করেন। কিন্তু করোনা ও লকডাউনের কারণে মায়ের দেশে ফিরতে দেরি হয়। এত বছর পর মাকে ফিরে পাওয়ার আনন্দ-অনুভূতি কাউকে বলে বোঝাতে পারবেন না।