ছোট ভাইকে দেখিয়ে হাইকোর্টে জামিন নেওয়া সেই বড় ভাই গ্রেপ্তার
মানব পাচার আইনের মামলায় উচ্চ আদালতে ছোট ভাই রফিকুল ইসলামকে দেখিয়ে জামিন নিয়ে লাপাত্তা হওয়া কক্সবাজারের রামুর সেই আলাউদ্দিনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। একই সঙ্গে আলাউদ্দিনের মা রাজিয়া বেগম ও বড় ভাই মঈন উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের তিনজনকে একটি হত্যাচেষ্টা মামলার পলাতক আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়। আলাউদ্দিন যে মানব পাচার মামলার পলাতক আসামি, সেটি পুলিশ নিশ্চিত করেছে।
রামু থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনোয়ারুল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, রামুর একটি হত্যাচেষ্টা মামলার পলাতক আসামি হিসেবে মঙ্গলবার রাতে উপজেলার চাকমারকুল ইউনিয়নের শাহ আহমদের পাড়ার একটি আস্তানা থেকে আলাউদ্দিনসহ তাঁর মা রাজিয়া বেগম ও বড় ভাই মঈন উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করা হয়। বুধবার দুপুরে তিনজনকে কক্সবাজার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পাঠানো হয়। আদালত রাজিয়া বেগম ও মঈন উদ্দিনকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। কিন্তু আলাউদ্দিন আদালতের কাছে নিজেকে রফিকুল ইসলাম দাবি করলে বিপত্তি দেখা দেয়। তখন বিচারক আলাউদ্দিনের আসল পরিচয় শনাক্ত করতে রামু থানা-পুলিশকে নির্দেশ দেন। আলাউদ্দিন এখন পুলিশের হেফাজতে আছেন।
ওসি আরও বলেন, ছোট ভাই রফিকুল পরিচয় দিয়ে আলাউদ্দিন অতীতে অনেক কিছু করেছেন। এই আলাউদ্দিন রফিকুল নন, আসল আলাউদ্দিন। আগামীকাল আলাউদ্দিনকে পুনরায় আদালতে পাঠানো হবে।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালের ২৯ অক্টোবর চট্টগ্রামের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ আদালতে আলাউদ্দিনসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে মানব পাচার আইনে মামলা করেন চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার উজানটিয়ার বাসিন্দা নুরুল ইসলাম। আদালত অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ারা জারি করেন।
আদালতের বাদীপক্ষের আইনজীবী জি এম জাহিদ হোসেন বলেন, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর ২০১৯ সালের ২৮ অক্টোবর উচ্চ আদালতের একটি দ্বৈত বেঞ্চে আলাউদ্দিনের (২২) বদলে তাঁর ছোট ভাই রফিকুলকে (১২) দাঁড় করানো হয়। আদালত ১২ বছর বয়সী শিশু রফিকুলকে আলাউদ্দিন মনে করে আট সপ্তাহের আগাম জামিন দেন। এ নিয়ে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে তোলপাড় শুরু হয়।
ওই সংবাদের ছবিতে দেখা গেছে, আদালত প্রাঙ্গণে আইনজীবীর সঙ্গে আলাউদ্দিনের জায়গায় রফিকুল ইসলাম ও তার মা রাজিয়া বেগম দাঁড়িয়ে আছেন। ২২ বছরের তরুণ আলাউদ্দিনের জায়গায় ১২ বছরের শিশু রফিকুলের ছবি দেখে রামুর বাসিন্দারা অবাক হন। এরপর বিষয়টি নিয়ে পুলিশ তৎপর হলে আলাউদ্দিন উধাও হয়ে যান। সঙ্গে রফিকুল, মা রাজিয়া বেগমসহ পরিবারের সবাই আত্মগোপন করেন। ২০২১ সালের ১ ডিসেম্বর প্রথম আলোতে ‘ছোট ভাইকে দেখিয়ে বড় ভাইয়ের জামিন, লাপাত্তা দুজনই’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়।
থানা-পুলিশ জানায়, ২০২১ সালের ২৩ এপ্রিল আলাউদ্দিন (২২), মঈন উদ্দিনসহ (২৪) কয়েকজন মিলে মামলার বাদী ও চাকমারকুল ইউনিয়নের পশ্চিম শাহ আহমদের পাড়ার বাসিন্দা মো. রফিককে (৩০) হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা চালান। এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাতে রফিকের চোখ ও মুখে জখম হয়। লাঠির আঘাতে রফিক মাটিতে ঢলে পড়লে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা শ্বাসরোধ করে হত্যাচেষ্টা চালান। এ ঘটনায় কক্সবাজার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করলে আদালত রামু থানাকে ঘটনা তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেন।
২০২১ সালের ১৫ অক্টোবর মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও রামু থানার পরিদর্শক (এসআই) মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম আদালতে আলাউদ্দিন, মঈন উদ্দিন, রাজিয়া বেগম, জয়নাল উদ্দিন ও রোকসানা বেগমের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। এরপর আদালত আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করলে সবাই আত্মগোপন করেন।
মামলার বাদী মো. রফিক বলেন, মানব পাচার মামলায় ছোট ভাই রফিকুলকে দেখিয়ে জামিন নেন বড় ভাই আলাউদ্দিন। এ জালিয়াতি প্রকাশ পেলে আলাউদ্দিন ও ছোট ভাই রফিকুল আত্মগোপন করে। গতকাল আলাউদ্দিনসহ তিনজনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করলে এলাকায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। কারণ, পুলিশ আলাউদ্দিন ও রফিকুলকে দুই বছর ধরে খুঁজছিল।
রামু থানা-পুলিশ জানায়, ২০১৯ সালের ২২ ডিসেম্বর হাইকোর্টের দেওয়া আট সপ্তাহের আগাম জামিনের মেয়াদ শেষ হয়। কিন্তু গ্রেপ্তারের ভয়ে দুই ভাইয়ের কেউ চট্টগ্রামের আদালতের হাজিরা দেন না।
মামলার এজাহারে বলা হয়, ২০১৪ সালের ২০ জুন আলাউদ্দিনসহ অন্য আসামিরা মালয়েশিয়ায় ভালো বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে মামলার বাদী নুরুল ইসলামকে চট্টগ্রামের লোহাগাড়া থেকে কক্সবাজারের দরিয়ানগর উপকূলে নিয়ে যান। সেখান থেকে নুরুল ইসলাম ও একই এলাকার হেলালউদ্দিনকে ট্রলারের মাধ্যমে জাহাজে তুলে দেওয়া হয়। কয়েক দিন পর জাহাজটি থাইল্যান্ড উপকূলে তাঁদের নামিয়ে দেয়। সেখানকার দালালেরা তাঁদের ওপর শারীরিক নির্যাতন চালিয়ে চার লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায় করেন। এরপর ওই দুজনকে মালয়েশিয়ায় দালালের হাতে তুলে দেওয়া হয়। ২০১৭ সালের জুনে মালয়েশিয়া পুলিশ অবৈধ অভিবাসী হিসেবে নুরুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠায়। এক বছর কারাভোগের পর বাংলাদেশ সরকার ২০১৮ সালের অক্টোবর মাসে নুরুল ইসলামকে দেশে ফিরিয়ে আনে। এরপর ২৯ অক্টোবর আলাউদ্দিনসহ ছয় আসামির বিরুদ্ধে মানব পাচার আইনে একটি মামলা করেন নুরুল ইসলাম।
২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর কক্সবাজার সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আদিবুল ইসলাম আলাউদ্দিনের বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, পত্রপত্রিকায় আলাউদ্দিনের যে ছবি প্রকাশিত হয়েছে, সেটি আলাউদ্দিনের ছোট ভাই রফিকুল ইসলামের।