‘জীবনে প্রথম স্কুলে আসার মতো অনুভূতি হচ্ছে’
বাবা জাহেদুল আলমের সঙ্গে স্কুলের ফটকের সামনে রিকশা থেকে নামল মারকাজুল আরাবী। তার কাঁধে স্কুলব্যাগ। মুখে মাস্ক। স্কুলের ফটকে দাঁড়িয়ে ছিল স্বেচ্ছাসেবকেরা। স্কুলে প্রবেশের সময় থার্মাল স্ক্যানার দিয়ে মারকাজুলের তাপমাত্রা মেপে নিল এক স্বেচ্ছাসেবী। স্কুলে ঢুকেই বেসিনে গিয়ে হাত ধুয়ে নিল মারকাজুল। তারপর আরেক স্বেচ্ছাসেবী তাকে তার নির্ধারিত শ্রেণিকক্ষ দেখিয়ে দিল। সেখানে চলে যায় সে। আজ রোববার সকাল পৌনে আটটার দিকে চট্টগ্রাম নগরের নাসিরাবাদ সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে এমন চিত্র দেখা গেল।
করোনা মহামারির কারণে গত বছরের ১৭ মার্চ বন্ধ হয়ে যায় দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। প্রায় দেড় বছর পর আজ রোববার খুলে দেওয়া হয়েছে স্কুল-কলেজ। এ নিয়ে কয়েক দিন ধরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে উচ্ছ্বাস ছিল, যার বহিঃপ্রকাশ ঘটে আজ। অনেক দিন পর বন্ধুদের দেখা পেয়ে অনেক শিক্ষার্থী আবেগে পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে। মেতে ওঠে আনন্দ-উচ্ছ্বাসে। শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে মুখর হয়ে ওঠে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ। শিক্ষক-কর্মচারীরাও শিক্ষার্থীদের বরণ করে নেন আনন্দচিত্তে। আর সন্তানেরা শ্রেণিকক্ষে ফেরায় স্বস্তি ফিরে পেয়েছেন অভিভাবকেরা। তবে করোনা মহামারিতে স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি নিয়ে তাঁরা কিছুটা উদ্বিগ্ন।
নাসিরাবাদ সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের ফটকের সামনে পঞ্চম শ্রেণিপড়ুয়া ছাত্র মারকাজুলের বাবা জাহেদুল বলেন, স্কুল খুলে দেওয়ায় ভালো হয়েছে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় বাচ্চারা পড়ালেখায় পিছিয়ে গেছে। ঘরে পড়লেও মনোযোগ ছিল কম। আসলে স্কুলে যেভাবে পড়ানো হয়, নির্দেশনা দেওয়া হয়, ঘরে বসে তা সম্ভব নয়।
মহামারির সময় স্কুল খোলা ও স্বাস্থ্যবিধি অনুযায়ী বিদ্যালয়ের প্রস্তুতি সম্পর্কে এই অভিভাবক বলেন, ‘কিছুদিন পর্যবেক্ষণ করার পর মন্তব্য করব। তবে এখন পর্যন্ত যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা ঠিকই আছে।’
ছেলেকে স্কুলে প্রবেশ করিয়ে দিয়ে ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন আরেক অভিভাবক মোহাম্মদ সেলিম। তিনি বলেন, তাঁর ছেলে ইননান সেলিম এই স্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে এবার ভর্তি হয়েছে। ভর্তি হওয়ার পর আজই প্রথম স্কুল তার। স্কুল খুলে দেওয়ায় সবার সঙ্গে সে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবে। আর ঘরে থাকতে থাকতে সে বিরক্তও হয়ে পড়ছিল। এখন পড়াশোনায় মনোযোগী হবে।
আজ সকাল আটটায় এই স্কুলে শ্রেণি কার্যক্রম শুরু হয়। প্রথম দিন ২০২১ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থী ও পঞ্চম শ্রেণির ক্লাস হচ্ছে। অধিকাংশ ছাত্র স্কুলের নির্ধারিত পোশাক পরে এসেছে। প্রায় সবার মুখে মাস্ক রয়েছে। যাদের ছিল না, তাদের স্কুল থেকে মাস্ক দেওয়া হয়। স্কুলের নিচতলায় হাত ধোয়ার জন্য বেসিন রাখা হয়েছে। শ্রেণিকক্ষেও সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে শিক্ষার্থীদের বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। শিক্ষকেরা মাস্ক পরেই ক্লাস নিচ্ছেন।
দশম শ্রেণির ছাত্র আসহাব উদ্দিন শ্রেণিকক্ষে যাওয়ার আগে বলে, ‘জীবনে প্রথম যেবার স্কুলে এসেছিলাম, আজকে এসে ঠিক একই অনুভূতি হচ্ছে। অনেক দিন পর বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হলো। স্যারদের দেখব।’
পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র ফয়সাল আবরার বলে, ‘ভর্তি হওয়ার পর আজই প্রথম স্কুলে এসেছি। তাই ভালো লাগছে।’
স্কুলের ভেতরে স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে তোড়জোড় থাকলেও বাইরে তা ছিল না। অভিভাবকেরা বসেছিলেন পাশাপাশি। মুখে মাস্ক থাকলেও সামাজিক দূরত্ব ছিল না।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এম ফরিদুল আলম হোসাইনী বলেন, শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। প্রথম দিনে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ৯০ শতাংশের বেশি।
নগরের চট্টগ্রাম সরকারি উচ্চবিদ্যালয়, চট্টগ্রাম কলেজ ও হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজে গিয়ে দেখা যায়, প্রবেশমুখে তাপমাত্রা মাপা হচ্ছে। হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে হাত জীবাণুমুক্ত করা হচ্ছে। তারপর শিক্ষার্থীদের ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা সারিবদ্ধভাবে প্রবেশ করে। অবশ্য এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে অভিভাবকদের জটলা ছিল।
হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজের বাংলা বিভাগের প্রভাষক ফারজানা আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, ‘অনেক দিন পর সরাসরি শিক্ষার্থীদের ক্লাস নিয়েছি। অনলাইনের তুলনায় এভাবে ক্লাস নেওয়া অনেক আনন্দের।’