তলিয়ে গেছে ১০ হাজার হেক্টর ফসলি জমি ও ৮৪১ পুকুর

উজানের ঢলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিভিন্ন উপজেলার ফসলি জমি বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। সম্প্রতি নাসিরনগর উপজেলার গোকর্ণ ইউনিয়নে
ছবি: প্রথম আলো

উজানে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর, বিজয়নগর ও আখাউড়া উপজেলার প্রায় ১০ হাজার হেক্টর ফসলি জমি তলিয়ে গেছে। বন্যার পানিতে ভেসে গেছে প্রায় ৮৪১টি পুকুরের মাছ। বন্যায় তিন উপজেলার প্রায় ৩৩ হাজার কৃষক ও ৬০০ মাছচাষি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। শুধু আখাউড়া ও নাসিরনগর উপজেলায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২১ কোটি ৩০ লাখ টাকা। আকস্মিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা এখন হাহাকার করছেন।

নাসিরনগর ও আখাউড়া উপজেলা কৃষি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, পাহাড়ি ঢলে আখাউড়ার ৫৫ হেক্টর আউশ, ৫০ হেক্টর সবজি ও ১০৯টি পুকুরের মাছ পানিতে ভেসে গেছে। এতে ৫০০ কৃষক ও ৮৫ জন মাছচাষি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। শুধু মাছের পুকুর তলিয়ে আখাউড়ায় প্রায় ৫৮ লাখ টাকা ক্ষতি হয়েছে। অন্যদিকে নাসিরনগরে ৯ হাজার হেক্টর আমন, ৬০ হেক্টর আউশ, ৩৫ হেক্টর সবজি ও ৩৫ হেক্টর জমির পাট পানিতে নিমজ্জিত। একই সঙ্গে ৭১২টি পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। এতে ৩২ হাজার কৃষক ও ৫০০ মাছচাষি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

আরও পড়ুন

বিজয়নগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাব্বির আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ৫৩০ হেক্টর আউশ ও ৬০ হেক্টর জমির সবজি পানিতে নিমজ্জিত। পানি বেড়েই চলেছে। তাঁরা এখনো ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করেননি। উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, এখন পর্যন্ত উপজেলার ২০টি বড় পুকুরের মাছ পানিতে ভেসে গেছে। এতে ৫০ লাখ টাকার বেশি ক্ষতি হয়েছে। উপজেলার হরষপুর, চরইসলামপুর, পত্তন, চান্দুরা এলাকার আরও অনেক পুকুর তলিয়ে গেছে। পানি আরও বাড়ছে। ক্ষতির পরিমাণও বেড়ে যাবে।

আখাউড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাহানা বেগম প্রথম আলোকে বলেন, উপজেলার ১০৫ হেক্টর জমিতে আউশ ও ২৮০ হেক্টর জমিতে সবজি আবাদ করা হয়েছিল। এর মধ্যে ৫৫ হেক্টর আউশ ও ৫০ হেক্টর সবজির খেত তলিয়ে গেছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় ৫০০ কৃষক। টাকার অঙ্কে ৫০ লাখ টাকার বেশি ক্ষতি হয়েছে।

উজানের পানিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন নাসিরনগর উপজেলার কৃষক ও মাছচাষিরা। উপজেলার ধরমন্ডল ইউনিয়নের হুরুণ আলী প্রথম আলোকে বলেন, ‘২২ কানিতে (প্রতি কানি ৩০ শতক) আমন, ৯ কানিতে আউশ ও ৪-৫ কানি জমিতে পাট চাষ করেছিলাম। কিন্তু সব পানির নিচে। এক কানি জমিতে ১২ মণ আমন ও ১৪ মণ আউশ ধান পাওয়া যায়। গত বছর ৫-৬ লাখ টাকার ফসল বিক্রি করতে পেরেছিলাম। কিন্তু এবার বন্যায় সব শেষ হয়ে গেছে।’ তিনি আরও বলেন, চারটি পুকুরে তেলাপিয়ার চাষ করেছিলেন। এ পর্যন্ত ৩-৪ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু বন্যার পানিতে মাছ ভেসে গেছে।

গোকর্ণ গ্রামের কামরুল ইসলাম বলেন, চার বিঘা পাট, এক বিঘা তিল ও দেড় বিঘা জমিতে আউশ ধান চাষ করেছিলেন। কিন্তু বন্যার পানিতে সব তলিয়ে গেছে। খেতে এত পানি যে সেখানে সাঁতার কাটা যাবে। তিনি বলেন, গত বছর ৫৪ হাজার টাকার পাট, ১৬ হাজার টাকার পাটকাঠি ও ২০ হাজার টাকার ধান বিক্রি করেছিলেন। কিন্তু এবার কপালে কিছুই জুটল না। কৃষকদের মধ্যে হাহাকার চলছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলায় উজানের পানিতে ভেসে গেছে পুকুরের মাছ। সম্প্রতি উপজেলার গোকর্ণ ইউনিয়নের জেঠা গ্রামে
ছবি প্রথম আলো

কামরুল ইসলাম আরও জানান, চাচাতো ভাই ইদ্রিস দুই বিঘা পাট ও দুই বিঘা জমিতে ধান চাষ করেন। ভাতিজা আজারুল করিম ৬-৭ বিঘা জমিতে আউশ ও প্রতিবেশী জহিরুল আড়াই বিঘা জমিতে আউশ ধানের চাষ করেছিলেন। তাঁদের সব জমি পানিতে নিমজ্জিত। নাসিরনগরের অন্তত ১৫ জন কৃষক বলেন, উপজেলার প্রায় ৯৫ শতাংশ ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে কৃষকদের প্রায় ১৮ কোটি ৩০ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবু সাঈদ তারেক প্রথম আলোকে বলেন, উপজেলার ৯ হাজার হেক্টর আমন, ৬০ হেক্টর আউশ, ৩৫ হেক্টর সবজি ও ৩৫ হেক্টর পাট চাষের জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। বন্যায় প্রায় ৩২ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে আমন ধানের।

উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা শুভ্র সরকার প্রথম আলোকে বলেন, নাসিরনগরের প্রায় ৭১২টি পুকুরের মাছ পানিতে ভেসে গেছে। মাছ চাষের সঙ্গে উপজেলার প্রায় ৫০০ মানুষ জড়িত। এতে প্রায় ১ কোটি ৯২ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তিনি বলেন, উপজেলার কিছু জায়গায় পানি কমেছে, কিছু জায়গা অপরিবর্তিত অবস্থায় আছে। তবে পানি বাড়েনি।