নগর বিএনপির সভাপতির পদ থেকে বাদ পড়ার পর গত বছরের নভেম্বর থেকে মজিবর রহমান সরোয়ারকে বরিশালে বিএনপির কোনো কর্মসূচিতে আর দেখা যায়নি। তিনি দলের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে সক্রিয় আছেন। সম্প্রতি কেন্দ্রঘোষিত দেশব্যাপী বিক্ষোভ কর্মসূচিতে বিভাগের বরগুনা জেলায় কেন্দ্রীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা হিসেবে অংশ নিলেও নিজ জেলায় কোনো দলীয় কর্মসূচিতে যোগ দেননি। আজ বুধবার দুপুরে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের নির্বাচনে ভোট দিতে তিনি বরিশালে আসেন।
এ সময় তাঁর সমর্থক আইনজীবী, মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি থেকে বাদ পড়া নেতা-কর্মীরা এবং সম্প্রতি নগরের ৩০টি ওয়ার্ডের ভেঙে দেওয়া কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকেরা সেখানে জড়ো হন। দুপুর সোয়া ১২টায় মজিবর রহমান ভোট দিতে বরিশাল জেলা আইনজীবী সমিতিতে আসেন। সাড়ে ১২টার দিকে ভোট দিয়ে বের হওয়ার পর দলীয় নেতা-কর্মীরা তাঁকে নিয়ে জেলা জজ আদালতের কম্পাউন্ড থেকে বের হয়ে শুরু করেন স্লোগান। এ সময় তাঁরা ফজলুল হক অ্যাভিনিউ এলাকায় খালেদা জিয়ার মুক্তি, তারেক রহমানের মামলা প্রত্যাহারসহ বিভিন্ন দাবিতে স্লোগান দেন। পরে দলীয় নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন মজিবর রহমান। এ সময় তিনি সরকার পতন এবং খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মামলা প্রত্যাহার করে দেশে ফিরিয়ে আনার আন্দোলনে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। পরে তিনি নগরের ওয়ার্ড বিএনপির এক অসুস্থ নেতাকে দেখতে তাঁর বাড়িতে যান।
দলীয় সূত্র জানায়, বরিশাল মহানগরের ১৭১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ভেঙে দিয়ে গত বছরের ৩ নভেম্বর আহ্বায়ক কমিটির অনুমোদন দেয় কেন্দ্র। কমিটিতে মনিরুজ্জামান খানকে আহ্বায়ক, আলী হায়দারকে ১ নম্বর যুগ্ম আহ্বায়ক ও মীর জাহিদুল কবিরকে সদস্যসচিব করা হয়। এরপর গত ২২ জানুয়ারি ৪১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ আহ্বায়ক কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়। সেখানে আগের কমিটির গুরুত্বপূর্ণ নেতারা কেউ স্থান পাননি।
আগের কমিটির নেতাদেরও আহ্বায়ক কমিটি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। ফলে তাঁরা সবাই দলে কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। এমনকি তাঁদের দলীয় কর্মসূচিতেও ডাকা হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।
পূর্ণাঙ্গ আহ্বায়ক কমিটির জন্য কেন্দ্রে নাম জমা দেওয়ার পর জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে তা নিয়ে আপত্তি তোলেন বিলুপ্ত কমিটির অন্তত ৩১ জন নেতা। তাঁরা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। কিন্তু তাঁদের আবেদন আমলে নেওয়া হয়নি।
মজিবর রহমান দীর্ঘ ২০ বছরের বেশি সময় ধরে বরিশাল মহানগর কমিটির সভাপতি পদে ছিলেন। সংসদ সদস্য, হুইপ ও সিটি করপোরেশনের মেয়রের দায়িত্বও পালন করেন তিনি। ফলে বরিশাল নগর বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামোতে তাঁর শক্ত প্রভাব রয়েছে। কিন্তু তাঁকে সভাপতির পদ থেকে বাদ দিয়ে আহ্বায়ক কমিটির করার পর আগের কমিটির নেতাদেরও আহ্বায়ক কমিটি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। ফলে তাঁরা সবাই দলে কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। এমনকি তাঁদের দলীয় কর্মসূচিতেও ডাকা হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। এ নিয়ে দলের ভেতরে অসন্তোষ ও দ্বন্দ্ব প্রকট হয়ে উঠেছে।
বাদ পড়া নেতারা দলীয় কর্মসূচিতে না থাকলেও আলাদা বলয়ে তাঁরা নানা অরাজনৈতিক কর্মসূচির মাধ্যমে নিজেদের সংগঠিত করছেন। মহানগর বিএনপির নতুন আহ্বায়ক কমিটি নিয়ে চলা দ্বন্দ্ব ও বিতর্কের মধ্যে গত ১১ মার্চ সিটি করপোরেশনের ৩০টি ওয়ার্ডের পূর্ণাঙ্গ কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির এক জরুরি সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। ফলে আহ্বায়ক কমিটি থেকে বঞ্চিত নেতাদের বলয়টি আরও বেশি সুসংগঠিত হয়েছে।
গত জানুয়ারি থেকে বাদ পড়া নেতারা চা-চক্র, মহড়া, ইফতার মাহফিল এবং সর্বশেষ ২০ মে বাদ পড়া নেতারা নগরের একটি কমিউনিটি সেন্টারে ঈদ পুনর্মিলনী করেছেন। এতে দলের প্রায় ৪০০ নেতা-কর্মী অংশ নেন। সেখানে ৩০টি ওয়ার্ডের বিলুপ্ত কমিটির নেতা-কর্মীরাও উপস্থিত ছিলেন।
মহানগরের বিলুপ্ত কমিটির সাবেক সহসাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুল হক বলেন, ‘আমরা ছাত্রজীবন থেকে শ্রম দিয়ে দলকে শক্তিশালী করেছি। এখন উড়ে এসে জুড়ে বসা নেতাদের কারণে দলের বাইরে। মজিবর রহমানকে পেয়ে দলের ত্যাগী, জেল-জুলুম, হামলা-মামলার শিকার নেতা-কর্মীরা দীর্ঘদিন পর প্রাণ ফিরে পেয়েছিলেন। এ জন্য তাঁর আসার খবরে সেখানে সবাই ছুটে গিয়েছিল এবং খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মামলা প্রত্যাহারের দাবিসহ নানা স্লোগান দেয়। এর মধ্য দিয়ে দলের প্রকৃত নেতা-কর্মীরা বেশ কয়েক মাস পর প্রাণ ফিরে পেয়েছিল।’