দৌলতদিয়া ২ নম্বর ঘাটে ভাঙনে ২০ মিটার বিলীন, ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষোভ

রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া লঞ্চ ও ২ নম্বর ফেরিঘাটের মাঝামাঝি এলাকা মজিদ শেখের পাড়ায় সকাল থেকে বালুভর্তি জিওব্যাগ ফেলার কাজ শুরু করে পাউবো ও বিআইডব্লিউটিএ। বুধবার সকালেছবি: এম রাশেদুল হক

রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়ার ২ নম্বর ফেরিঘাটে নতুন করে ভাঙন দেখা দিয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার থেকে ভাঙন শুরু হয়ে আজ বুধবার সকাল পর্যন্ত প্রায় ২০ মিটার এলাকা বিলীন হয়েছে। এ ছাড়া গতকাল লঞ্চঘাট ও ১ নম্বর ফেরিঘাটের মাঝামাঝি স্থানে আরও প্রায় ২০ মিটারের মতো ভেঙেছে।

ভাঙন প্রতিরোধে আজ সকাল থেকে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ও পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জিও ব্যাগ ফেলছে। দুটি প্রতিষ্ঠান চারটি স্থান নির্ণয় করে জিও ব্যাগ ফেলছে। এদিকে ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন, ভাঙন প্রতিরোধে আগে ব্যবস্থা নিলে এত ক্ষতি হতো না।

আজ সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, দৌলতদিয়া লঞ্চঘাটসংলগ্ন মজিদ শেখের পাড়ায় পাউবো ট্রলার ভর্তি করে বালু আনছে। নদীর পাড়েই জিও ব্যাগে ভর্তি করে সেখানে ফেলছে। আশপাশের এলাকার অনেকে এখনো ভাঙন–আতঙ্কে অন্যত্র সরে যাচ্ছেন। লঞ্চঘাট সড়ক ও কাঠের পাটাতনের সিঁড়ির ওপর দিয়ে ভাঙনকবলিত লোকজন মালামাল রেখে আশ্রয় নিয়েছেন। পাশে ১ নম্বর ফেরিঘাট সড়কজুড়ে ভাঙনকবলিত পরিবারের লোকজন ঘরের চালা, জিনিসপত্র রেখেছেন। দেখলে মনে হবে, যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকার মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। কেউ কেউ বসতভিটা ফেলে ঘর ভেঙে নিয়ে অন্যত্র যাচ্ছেন। জিনিসপত্র সরানোর সময় অনেকে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

দৌলতদিয়া লঞ্চ ও ফেরিঘাট এলাকায় ভাঙনে সব হারিয়ে ঘরের চালা আর জিনিসপত্র নিয়ে ১নম্বর ফেরিঘাট সড়কে আশ্রয় নিয়েছেন সবাই। বুধবার সকালে
ছবি: এম রাশেদুল হক

কালকের ভাঙনে অল্পতে রক্ষা পায় তাছলিমা বেগমের ঘর। লোকজন নিয়ে তিনি আজ অন্যত্র সরে যাচ্ছেন। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘এখন কেন বালির বস্তা নিইয়া আইছে। আগে থেকে হুস ছিল না? সময়মতো কাজ করলে এত ক্ষতি হতো না। কোটি টাকার সম্পত্তি, বাড়িঘর নদীতে যাচ্ছে। এখন আইছে দুই টাকার বালি ফেলাবার। দুই বস্তা বালি ফেললে সমাধান হয়ে যাবে? পারবেন বাড়ি ফিরাইয়া দিতে?’

ভাঙনে বসতভিটার অর্ধেকটা নদীতে চলে গেছে। বাকিটুকু রক্ষা হবে না ভেবে ঘরবাড়ি সব ভেঙে পাশে লঞ্চঘাট সড়কে নিয়ে ফেলেছেন চান্দু মোল্লা। তিনিও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘কত দিন ধইরা বলতেছি, আগে থেকে ব্যবস্থা নেন। এখন আমরা কই যাব, কোনো জায়গা নাই। রাস্তার পর সব আইনা ফেলাইছি। রাতভর এভাবেই রাস্তায় পরে ছিলাম। কোথায় যাব, কোনো কূল খুঁজে পাচ্ছি না।’

স্থানীয় ইউপি সদস্য আশরাফুল ইসলাম বলেন, গতকাল বেলা ১১টার দিকে চোখের পলকে ৮টি পরিবারের বসতভিটা নদীতে তলিয়ে গেল। কেউ কিছুই রক্ষা করতে পারেনি। ভাঙন আতঙ্কে ৪০টি পরিবার ঘর ভেঙে অন্যত্র গেছে। আজও ৪০টির মতো পরিবার ঘরবাড়ি সরিয়ে ফেলছে। অনেকে ১ নম্বর ফেরিঘাট সড়কে আশ্রয় নিয়েছে। এসব পরিবার আরও দু-তিনবার নদীভাঙনের শিকার হয়েছে।

ভাঙনে সব হারিয়ে লঞ্চঘাট সড়কে আশ্রয় নিয়েছেন বিধবা পাখি বেগম, রুপবান বেগমের মতো অনেকে। বুধবার সকালে
ছবি: এম রাশেদুল হক

লঞ্চঘাট সড়কে মেয়ে, মেয়েজামাই, নাতি নিয়ে রাতভর নির্ঘুম রাত কাটিয়েছেন বিধবা পাখি বেগম। কোথায় আশ্রয় নেবেন, তার কোনো ঠিকানা নেই। পাখি বেগম বলেন, দৌলতদিয়ার ঢল্লাপাড়ায় বাড়ি ছিল তাঁর। আট বছর আগে ভাঙনে বিলীন হলে আসেন ২ নম্বর ফেরিঘাটে। দুই বছর পর আবার ভাঙলে আসেন বর্তমানে লঞ্চঘাটসংলগ্ন মজিদ শেখের পাড়ায়। এখানেও এবার সব বিলীন হওয়ায় এখন খোলা আকাশের নিচে আছেন।

২ নম্বর ফেরিঘাটে দেখা যায়, ফেরিঘাট সড়কের মাথা থেকে শুরু করে পন্টুনের আগপর্যন্ত প্রায় ২০ মিটার এলাকা ভেঙেছে। পানির তীব্র স্রোত এসে আঘাত হানায় দুই দিন ধরে অল্প অল্প করে ভাঙছে।

বিআইডব্লিউটিএর উপসহকারী প্রকৌশলী মো. শাহ আলম বলেন, লঞ্চঘাটসংলগ্ন মজিদ শেখের পাড়ায় ২০ মিটার এবং ২ নম্বর ফেরিঘাট এলাকার ছিদ্দিক কাজী পাড়ায় নতুন করে প্রায় ২০ মিটার এলাকা ভেঙেছে। সকাল থেকে দুটি ঘাটের চারটি স্থানে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলেছেন তাঁরা। পাশাপাশি পাউবো বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলছে।

দৌলতদিয়া লঞ্চ ও ২ নম্বর ফেরিঘাটের মাঝামাঝি এলাকা মজিদ শেখের পাড়ায় প্রায় ২০ মিটার এলাকা ভেঙে গেছে। বুধবার সকালে
ছবি: এম রাশেদুল হক

পাউবো রাজবাড়ীর নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল আহাদ বলেন, তিনিসহ পাউবোর প্রায় সব স্টাফ করোনায় আক্রান্ত। এরপরও জরুরি মুহূর্তে ভাঙনকবলিত এলাকায় বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলছেন। বিআইডব্লিউটিএকে ঘাটের উজানে আরও আগে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলতে বলেছিলেন। তারা ফেললে এখন হয়তো এত ক্ষতি হতো না।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আজিজুল হক বলেন, ‘গতকাল সন্ধ্যায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি পরিবারকে ১৫ কেজি চাল, ডালসহ খাদ্যসহায়তা দিয়েছি। প্রাথমিক পর্যায়ে ক্ষতিগ্রস্ত ৪২ পরিবারের পুনর্বাসনের জন্য জেলা প্রশাসককে জানানো হয়েছে। গোয়ালন্দ পৌরসভার মেয়র নজরুল ইসলামও ব্যক্তিগত উদ্যোগে ৫০টি পরিবারে খাদ্যসহায়তা দিয়েছেন।’