নেত্রকোনায় শতবর্ষের পুরোনো খেলার মাঠ রক্ষার দাবি
নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার বলাইশিমুল এলাকার শত বছরের পুরোনো একটি খেলার মাঠ রক্ষার দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেছেন এলাকার বাসিন্দারা। আজ মঙ্গলবার দুপুর ১২টার দিকে এলাকাবাসীর ব্যানারে শতাধিক নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর ও শিক্ষার্থীরা ওই খেলার মাঠে জড়ো হন। তাঁরা প্রথমে মাঠের চারপাশ ঘুরে বিক্ষোভ মিছিল করেন। মিছিল শেষে মাঠে মানববন্ধন করেন তাঁরা।
মানববন্ধনে ও বিক্ষোভ কর্মসূচিতে বক্তব্য দেন স্থানীয় ব্যবসায়ী হেলাল উদ্দিন, কৃষক মাহতাব উদ্দিন, হাবিবুর রহমান, শিক্ষার্থী শরিফুল ইসলাম, জহিরুল ইসলাম, আরিফুল হক, পলাশ মিয়া, গৃহিণী আরিফা আক্তার, লুৎফা আক্তার, মরিয়ম বেগম প্রমুখ। এ সময় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদা বেগম, সহকারী পুলিশ সুপার (কেন্দুয়া সার্কেল) জুনায়েদ আফ্রাদ ছাড়াও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীসহ বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য মাঠে উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা আন্দোলনকারীদের বিক্ষোভ করতে নিষেধ করলেও তাঁরা মানেননি।
এলাকাবাসী ও উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, বলাইশিমুল গ্রামের ১ একর ৮৭ শতক সরকারি জায়গায় অবস্থিত শত বছরের পুরোনো ওই খেলার মাঠটি। সেখানে এলাকার শিশু-কিশোর, শিক্ষার্থীসহ তরুণ-যুবকেরা খেলাধুলা করেন। সম্প্রতি স্থানীয় প্রশাসন মাঠের দুই পাশে ভূমিহীন ও গৃহহীনদের জন্য আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় ২৩টি ঘর নির্মাণ করছে। স্থানীয় বাসিন্দারা ওই কাজে বাধা দেন। তাঁরা ওই জায়গার পরিবর্তে মাঠের উত্তর পাশে কিছুটা নিচু জমিতে ঘর নির্মাণের দাবি জানান। এ নিয়ে প্রশাসনের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক হয়। কিন্তু প্রশাসন সিদ্ধান্তে অটল থেকে মাঠের দক্ষিণ ও পশ্চিম দিকে ঘরের নির্মাণকাজ চালাচ্ছে।
এলাকার বাসিন্দারা আরও জানান, মাঠ রক্ষার দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভের পাশাপাশি স্থানীয় হাবিবুর রহমান মণ্ডলসহ আটজন বাদী হয়ে ৩০ মে আদালতে একটি মামলা করেন। মামলায় জেলা প্রশাসক, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, ইউএনও, সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) আসামি করা হয়। আদালত ইউএনওকে পাঁচ দিনের মধ্যে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দেন। এরপরও পুলিশের পাহারায় ঘর নির্মাণ শুরু করে প্রশাসন। ২ জুন রাতের আঁধারে দুটি নির্মাণাধীন ঘরের গাঁথুনি ভেঙে দেয় দুর্বৃত্তরা। পরের দিন প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ের উপসহকারী প্রকৌশলী কাজী মাজহারুল ইসলাম বাদী হয়ে ১৯ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করা হয়। মামলায় বলাইশিমুল ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সাবেক চেয়ারম্যান আলী আকবর তালুকদার ও ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য হায়দার আলী তালুকদারকে গ্রেপ্তার করা হয়। বর্তমানে তাঁরা জামিনে আছেন।
বলাইশিমুল গ্রামের হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘আমাদের গ্রামটি অনেক বড়। চার হাজারের বেশি ভোটার। গ্রামে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে। আশপাশের এলাকার ছেলেমেয়েরা বলাইশিমুল মাঠে খেলাধুলা করে। শত বছরের ঐতিহ্যবাহী মাঠটি রক্ষায় শুরু থেকেই দাবি জানাচ্ছি। কিন্তু প্রশাসন কর্ণপাত করছে না। আমরা গৃহহীনদের ঘরের বিপক্ষে না, আমরাও চাই তাঁরা ঘর পাক। মাঠের উত্তর পাশে ঘর করা হোক।’
তবে ইউপি চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান বলেন, ‘এটা অহেতুক আন্দোলন। মাঠটি বেশ কয়েকজন নিজেদের কাজে ব্যবহার করে আসছিলেন। ওই পক্ষটি গুটিকয়েক লোক নিয়ে আন্দোলন করছে। এটা ঠিক না।’
ইউএনও মাহমুদা বেগম বলেন, আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরের জন্য এটি অত্যন্ত উপযোগী জায়গা। স্থানীয় ব্যক্তিদের সঙ্গে নিয়ে প্রশাসন জায়গাটি নির্বাচন করেছে। মাঠের কোনো ক্ষতি হবে না। গুটিকয়েক লোক বিরোধিতা করলেও বেশির ভাগ মানুষ ঘর নির্মাণের পক্ষে। তা ছাড়া আদালতও প্রশাসনের পক্ষে রায় দিয়েছে।
জেলা প্রশাসক অঞ্জনা খান মজলিশ প্রথম আলোকে বলেন, তিনি যোগ দেওয়ার আগে জায়গাটি নির্বাচন করে ঘরের নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। দুর্বৃত্তরা দুটি ঘর ভাঙার পর ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখেন, ঘর নির্মাণে মাঠের কোনো ক্ষতি হচ্ছে না। ঘর নির্মাণের পরও মাঠে প্রায় দেড় একর জায়গা থাকবে। ঘর নিয়ে রাজনীতি হচ্ছে। অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে কিছু মানুষ অপপ্রচার চালাচ্ছেন। তাঁরা সাধারণ মানুষ ও কিশোরদের উসকে দিচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা স্থানীয় ব্যক্তিদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে মাঠে মাটি ভরাট, বেড়া দেওয়াসহ নতুন রাস্তা করে দিচ্ছি।’