ঝিনাইদহ
পিন্টুর ইজিবাইক নিল চোরে
শারীরিক সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও ছয়জনের সংসার একাই সামলাতে হয় পিন্টুকে। ভিটে ছাড়া নিজেদের কোনো জায়গা-জমিও নেই।
রাস্তার ধারে বসে কান্না করছিলেন পিন্টু রহমান (২৬)। একসময় ছিলেন রাজমিস্ত্রির সহকারী। দুর্ঘটনায় হারিয়েছেন দুই পা। জীবিকার তাগিদে কৃত্রিম এক পা আর এক ভাঙা পা নিয়ে শুরু করেছিলেন ইজিবাইক চালানো। বহু কষ্টে তিন মাস আগে কেনা ইজিবাইকটি চুরি হয়ে গেল। উপার্জনের একমাত্র সম্বল হারিয়ে পিন্টু এখন দিশাহারা।
ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর শহর থেকে গত বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে চুরি হয় পিন্টুর ইজিবাইক। রাস্তার পাশে একটি ওষুধের দোকানে ওষুধ কিনতে গিয়েছিলেন। ফিরে এসে ইজিবাইকটি আর পাননি। সেই থেকে কেঁদেই যাচ্ছেন পিন্টু। তাঁর বাড়ি পার্শ্ববর্তী চুয়াডাঙ্গা জেলার জীবননগর উপজেলার কয়া গ্রামে।
মা-বাবা, স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে ছয়জনের সংসার পিন্টুর। এর মধ্যে বাবা কাওছার আলী পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে বিছানায় পড়ে আছেন। লাল মিয়া নামের একজন বড় ভাই আছেন পিন্টুর। ভাইয়ের সংসার পৃথক। তাই শারীরিক সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও ছয়জনের সংসার একাই সামলাতে হয় পিন্টুকে। ভিটে ছাড়া নিজেদের কোনো জায়গা-জমিও নেই। টিনের চালের দুটি ঘরে তাঁদের বসবাস।
পিন্টু কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, বৃহস্পতিবার নিজ গ্রাম থেকে যাত্রী নিয়ে তিনি কোটচাঁদপুর শহরে আসেন। যাত্রীদের নামিয়ে দিয়ে ফিরে যাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন। হঠাৎ মাথায় খুব যন্ত্রণা অনুভব করলে যান হাসপাতাল সড়কের একটি ওষুধের দোকানে। একটি জায়গায় ইজিবাইকটি রেখে ওষুধ কিনতে যাওয়ার সময় একজন এগিয়ে এসে ইজিবাইক দূরে রাখার জন্য বলেন। কথামতো ইজিবাইকটি একটু সরিয়ে চলে যান ওষুধের দোকানে। পাঁচ মিনিটের মধ্যে ফিরে এসে দেখতে পান, ইজিবাইকটি সেখানে নেই। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও পাননি। এরপর কোটচাঁদপুর থানায় গিয়ে বিষয়টি খুলে বলেন পিন্টু। পুলিশের চেষ্টায়ও সেটি পাওয়া যায়নি।
ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন পিন্টু। তিনি জানান, হতদরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়ায় ছোটবেলায় পড়ালেখা করতে পারেননি। ১১ বছর বয়সে কৃষিকাজ শুরু করেন। তিন বছর এই কাজ করে চলে যান রাজমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে কাজে। সেখানে প্রায় তিন বছর কাজ করেন। ৯ বছর আগে একদিন একতলার ছাদে কাঠের কাজ করছিলেন। হঠাৎ ভেঙে নিচে পড়ে যান। ওই দুর্ঘটনায় দুই পা ভেঙে যায়। হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার সময় বাঁ পা হাঁটুর ওপর থেকে কেটে ফেলতে হয়। এই পায়ে কৃত্রিম পা লাগানো আছে। ডান পা কাটতে না হলেও সোজা করে মাটিতে ফেলতে পারেন না। ওই সময় চিকিৎসার পেছনে তাঁর প্রায় এক লাখ টাকা খরচ হয়।
ওই দুর্ঘটনার পর বেকার হয়ে পড়েন পিন্টু। হাঁটতে না পারায় বাড়িতে অচল বসে ছিলেন। একসময় বাড়ির সঙ্গে একটি চায়ের দোকান দেন। কিন্তু ওই আয় দিয়ে ছয়জনের সংসার চলছিল না। তাই দোকান থেকে পাওয়া ৭০ হাজার টাকার সঙ্গে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে তিন মাস আগে পুরোনো একটি ইজিবাইক কেনেন পিন্টু। সেটি হারিয়ে যেন শূন্য হয়ে গেলেন তিনি। বারবার বলছিলেন, এখন কী করবেন, কোথায় যাবেন, কিছুই ভেবে পাচ্ছেন না। অসুস্থ বাবা আর পরিবারের অন্যদের নিয়ে কীভাবে বেঁচে থাকবেন। কীভাবে সংসার চলবে।
কোটচাঁদপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. ফরিদুজ্জামান বলেন, ঘটনার পরপরই তাঁরা চারদিকে অভিযান চালিয়েছেন। কিন্তু ইজিবাইকটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। আশপাশের সিসিটিভি দেখে উদ্ধারের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন তাঁরা।
জীবননগর উপজেলার সীমান্ত ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান ইসাবুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘ছেলেটি হতদরিদ্র, অসহায়। সরকারিভাবে ইউপি থেকে সে প্রতিবন্ধীর ভাতা পায়। সে একটি ইজিবাইক কিনেছে শুনেছি। কিন্তু এটি যে চোরে নিয়ে গেছে, তা কেউ জানায়নি। আমি খোঁজ নেব। কীভাবে সহযোগিতা করা যায়, সেটাও দেখব।’