বন্য হাতি-মানুষের সহাবস্থানে স্থায়ী পদক্ষেপ জরুরি

শেরপুরের নালিতাবাড়ীতে বন্য হাতিকে তাড়াতে ধানখেতে নেমে পড়েছেন এক কৃষক। গত ২২ নভেম্বর পানিহাটা গ্রাম থেকে তোলা
ছবি: সংগৃহীত

বছরের পর বছর ধরে বন্য হাতির আক্রমণ–আতঙ্কে আছে শেরপুরের গারো পাহাড় সীমান্তের তিন উপজেলার মানুষ। গত ২০ বছরে হাতির আক্রমণে অর্ধশতাধিক মানুষ নিহত হয়েছেন। নানা কারণে মারা পড়েছে ৩১টি হাতি। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে হাতির আক্রমণ প্রতিরোধে ও হাতি-মানুষের সহাবস্থানে এলাকাবাসীসহ বিভিন্ন সংগঠন স্থায়ী পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছে।

জেলা প্রশাসন, বন ও কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ সূত্র এবং সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০০১ সালের ১৮ অক্টোবর বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের ওপার মেঘালয় রাজ্যের ডালু গ্রাম থেকে আসা ২০-২৫টি বন্য হাতির একটি দল প্রথমে নালিতাবাড়ী উপজেলার বনগাঁও, দাওধারা, কাটাবাড়ী ও হাতিপাগার গ্রামের পাহাড়ে অবস্থান নেয়। ওই দিন হাতির আক্রমণে দুজন নিহত হন। এর পর থেকে দুই দশক ধরে মাঝেমধ্যেই হাতিগুলো সীমান্তবর্তী লোকালয়ে এসে তাণ্ডব চালিয়ে যাচ্ছে। মানুষ হত্যা করছে; বাড়িঘর, ফসল ও গাছপালা ধ্বংস করছে। পাশাপাশি মানুষের প্রতিরোধসহ নানা কারণে হাতিও মারা পড়ছে। এক মাস ধরে বন্য হাতির একটি দল শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী উপজেলার সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে অবস্থান করছে। হাতির আক্রমণ–আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন মানুষ।

ময়মনসিংহ বন বিভাগ ও জেলা বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০ বছর আগে হাতির সংখ্যা ২০-২৫ হলেও প্রজনন বৃদ্ধির কারণে বর্তমানে হাতির সংখ্যা ৭০ থেকে ৮০টি। দুই দশকে বন্য হাতির আক্রমণে শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ীর পাহাড়ি এলাকায় ৫৮ জন মানুষ নিহত ও পাঁচ শতাধিক আহত হয়েছেন। মানুষের প্রতিরোধসহ নানা কারণে ৩১টি হাতির মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৬ সালে সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ ১৫ জন মানুষ ও ৪টি হাতি মারা যায়।

কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের হিসাবমতে, হাতির তাণ্ডবে ২০ বছরে প্রায় আড়াই হাজার হেক্টর জমির ফসল ও সবজি বিনষ্ট হয়। ক্ষতির পরিমাণ ২৫ কোটি টাকা। সাধারণত আমন ও বোরো ধান পাকার সময় হাতির দল খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে আসে বলে জানান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, শেরপুরের উপপরিচালক মোহিত কুমার দে।

নালিতাবাড়ীতে পানিহাটা গ্রামের ফেকামারী এলাকায় আড়াই বছর বয়সের একটি হাতির মৃত্যু হয়। গত ১৮ নভেম্বর তোলা
ছবি: সংগৃহীত

বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, গত ২৮ মে নালিতাবাড়ীর সীমান্তবর্তী ফেকামারী পাহাড়ি এলাকায় বন্য হাতির আক্রমণে অপূর্ব চাম্বু গং (৪৫) নামে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর এক ব্যক্তি নিহত হন। তিনি ১০ বছর আগে বিয়ে করে নালিতাবাড়ীর পানিহাটা গ্রামের গারো পল্লিতে পরিবার নিয়ে বসবাস করছিলেন।
গত ৯ নভেম্বর শ্রীবরদী উপজেলার রাণীশিমুল ইউনিয়নের সীমান্তঘেঁষা মালাকোচা গ্রামের পাহাড়ের টিলা থেকে একটি মরা হাতি উদ্ধার করেন বন বিভাগের কর্মকর্তারা।

বন বিভাগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে সীমান্তের ওপার থেকে একদল বন্য হাতি খাবারের সন্ধানে শ্রীবরদী উপজেলার মালাকোচা গ্রামের লোকালয়ে আসে। এর পর থেকেই প্রায় অর্ধশত হাতি পাহাড়ি এলাকার কৃষকের কাঁচা-পাকা আমন ধান ও শাকসবজির বাগান খেয়ে নষ্ট করে। তাই সন্ধ্যা হলেই কৃষকেরা হাতির আক্রমণ থেকে তাঁদের ফসল রক্ষা করতে বিভিন্ন স্থানে জেনারেটরের মাধ্যমে জিআই তার দিয়ে বিদ্যুতের সংযোগ দেন। গত ৯ নভেম্বর ভোররাতে বিদ্যুতের তারের সঙ্গে জড়িয়ে ওই হাতি মারা যায় বলে বন বিভাগের কর্মকর্তারা প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হন।

ঝিনাইগাতীতে বন্য হাতির তাণ্ডবে ক্ষতিগ্রস্ত ফসলের খেত। শনিবার দুপুরে উপজেলার রাংটিয়া গ্রামে
ছবি: সংগৃহীত

গত ১৯ নভেম্বর সকালে নালিতাবাড়ী উপজেলার সীমান্তবর্তী ফেকামারি এলাকা থেকে একটি মরা হাতি উদ্ধার করেন বন বিভাগের কর্মকর্তারা। বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, প্রায় এক সপ্তাহ ধরে ছোট–বড় ৪০টি বন্য হাতির দল সীমান্তের পানিহাটা এলাকায় ধানখেতে আসে। ১৮ নভেম্বর রাতের কোনো এক সময় সীমান্তের ৫০০ মিটার ভেতরে ফেকামারির পূর্ব পাশে চাঁন মিয়া নামের এক কৃষকের ধানখেতে এই বন্য হাতিটি মারা যায়।

এর আগে নভেম্বরের মাঝামাঝি নালিতাবাড়ীতে অর্ধশতাধিক কৃষকের খেতের ফসল নষ্ট করে বন্য হাতি। উপজেলার সীমান্তবর্তী পানিহাটা গ্রামে বন্য হাতির একটি দল পাহাড়ের ঢালে প্রায় ১০০ একরের আমনখেত নষ্ট করেছে বলে কৃষকেরা জানিয়েছেন। পানিহাটা গ্রামের কৃষক মোতালেব হোসেন বলেন, ‘হাতির ভয়ে ১৫ দিন ধইরা আমরা খেতের পাশে রাত জাইগা পাহারা দিছি। কিন্তু এত কষ্টের ফসল চোখের সামনে শেষ হইয়া গেল।’

শেরপুরের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন জনউদ্যোগ সূত্রে জানা গেছে, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া থাকলেও হাতি চলাচলের জন্য সুনির্দিষ্ট করিডর আছে। এই করিডর দিয়ে হাতি আসা-যাওয়া করে। সীমান্তের ওপারে ভারতীয় বনাঞ্চলের বেশির ভাগই ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি। সেখানে ব্যক্তি উদ্যোগে কৃষি খামার গড়ে উঠেছে। স্বাভাবিকভাবেই নষ্ট হয়েছে হাতির আবাসন। অন্যদিকে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে সরকারি বনাঞ্চল থাকলেও বনের পরিবেশ ও চরিত্র নষ্ট করা হয়েছে। বনের জমিতে অবৈধ দখলদারেরা মানববসতি গড়ে তুলছে। বিগত সময়ে সামাজিক বনায়নের নামেও এসব বনে মানুষের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। তাতে নষ্ট হয়েছে বনের প্রাকৃতিক পরিবেশ। হাতির আবাসনের পাশাপাশি খাদ্য ও পানির সরবরাহ নিশ্চিত করতে হয়। কিন্তু মানুষের বসতি গড়ে ওঠার পর তা আর পাওয়া যাচ্ছে না। ক্ষুধার তাড়নায় হাতি লোকালয়ে ঢুকে বাধার সম্মুখীন হচ্ছে। হাতির ফেরানোর কৌশলও সাধারণ মানুষের জানা নেই। ফলে মানুষের আচরণেও অনেক সময় ক্ষুব্ধ হচ্ছে বন্য হাতি। এতে সীমান্ত জনপদে হাতি-মানুষের দ্বন্দ্ব বাড়ছে।

গত ১৯ নভেম্বর শ্রীবরদীর সীমান্তঘেঁষা মালাকোচা গ্রামে দেখা যায়, গারো পাহাড়ের সংরক্ষিত বনের জমিতে ঘরবাড়ি তুলে শতাধিক পরিবার বসবাস করছে। কয়েকটি বাড়ির সামনে সবজিখেতও দেখা যায়। বনের জমিতে ঘরবাড়ি করার কথা স্বীকার করেন বসবাসকারীরা। এ সময় মালাকোচা গ্রামের জাহাঙ্গীর আলম (৬১) বলেন, ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে বনের জমিতে ঘর তুলে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন। ২৫ শতাংশ জমিতে সবজি আবাদ করেছিলেন। কিন্তু কিছুদিন আগে হাতির আক্রমণে সব নষ্ট হয়ে গেছে।

মালাকোচা গ্রামের জাহাঙ্গীর, সোহাগ, মনোয়ারাসহ বেশ কয়েকজন প্রথম আলোকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বন্য হাতির অত্যাচারে তাঁরা অতিষ্ঠ। কিন্তু উপায় না থাকায় ঝুঁকি নিয়েই বনের ভেতর বাস করছেন। তবে সরকার থেকে তাঁদের অন্যত্র পুনর্বাসন করা হলে তাঁরা সেখানে চলে যাবেন।

ঝিনাইগাতী উপজেলার কাংশা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সাবেক চেয়ারম্যান ও উপজেলা কমিউনিটি পুলিশিংয়ের সভাপতি মো. আনারউল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, বন্য হাতির অত্যাচার এখন প্রাকৃতিক দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। খাদ্যের সন্ধানে প্রায় প্রতিদিনই হাতির দল পাহাড় থেকে লোকালয়ে নেমে আসছে। হাতির দল পাহাড়ের ঢালে আবাদ করা ধানখেতে হানা দিয়ে ধান খেয়ে ও পায়ে মাড়িয়ে সাবাড় করছে। মাঝেমধ্যে মানুষও মেরে ফেলছে। মানুষ এখন বন্য হাতির আক্রমণ থেকে বাঁচতে চায়।

জনউদ্যোগ, শেরপুর কমিটির আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদ গারো পাহাড়ে ১০ দিনের ব্যবধানে দুটি হাতি মৃত্যুর ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং বনে হাতিদের অভয়ারণ্য গড়ে তুলে হাতি-মানুষের দ্বন্দ্ব নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানান। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, তাঁর সংগঠনের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসক বরাবর চার দফা দাবিসংবলিত একটি স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে আছে লোকালয়ে মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, হাতির চলাচলের জায়গায় বনাঞ্চলে বসবাসকারীদের অন্যত্র পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং বনভূমিতে অবৈধ দখলদারদের অবিলম্বে উচ্ছেদ করা। শেরপুরের বনাঞ্চল বন্য হাতির জন্য সংরক্ষণ করা ও হাতির জন্য অভয়াশ্রম গড়ে তোলা।

জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক মো. মোমিনুর রশীদ প্রথম আলোকে বলেন, হাতি-মানুষের দ্বন্দ্বের বিষয়টি নিয়ে তাঁরা উদ্বিগ্ন। তবে এই দ্বন্দ্ব নিরসন এবং জানমাল ও বন্য হাতি রক্ষায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ময়মনসিংহ বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ কে এম রুহুল আমিন প্রথম আলোকে বলেন, হাতির আক্রমণ থেকে জানমাল রক্ষায় সরকারিভাবে বেশ কয়েকটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এসবের মধ্যে আছে নালিতাবাড়ী ও শ্রীবরদী সীমান্তের ১০ কিলোমিটার এলাকায় বৈদ্যুতিক সংযোগের মাধ্যমে সোলার ফেন্সিং ও বায়োলজিক্যাল ফেন্সিং নির্মাণ এবং কাঁটাযুক্ত বেত ও লেবুবাগান তৈরি করা। বন্য হাতি রক্ষার জন্য এলাকাবাসীকে সচেতন করে তোলার জন্য সভা-সমাবেশ করা হচ্ছে। তবে হাতিকে বিরক্ত না করার জন্য সাধারণ মানুষকে সচেতন হতে তিনি অনুরোধ জানান।