ভাঙ্গা–বরিশাল–কুয়াকাটা মহাসড়ক নিয়ে দুশ্চিন্তা

স্বপ্নের সেতুর ওপর দিয়ে পদ্মা পাড়ি দেওয়ার অপেক্ষা ফুরাচ্ছে ২৫ জুন। সেতুর উদ্বোধন নিয়ে শুরু হয়েছে উচ্ছ্বাস–উদ্দীপনা। যোগাযোগব্যবস্থার মাইলফলক এই সেতুকে কেন্দ্র করে শিল্পোন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ অর্থনৈতিক উন্নয়নের আশায় বুক বাঁধছেন দক্ষিণের মানুষ, দেখছেন নতুন নতুন স্বপ্ন।

পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণাঞ্চলে যানবাহনের চাপের বিষয়টি মাথায় রেখে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত ছয় লেনের এক্সপ্রেসওয়ে করা হয়েছে। কিন্তু ঢাকা-বরিশাল হয়ে সমুদ্রসৈকত কুয়াকাটা পর্যন্ত মহাসড়ক রয়ে গেছে আগের মতোই। সেতু চালুর পর এই পথে যানবাহন চলাচল কয়েক গুণ বেড়ে যাবে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। কিন্তু সেই চাপ সামলাতে এখনো প্রস্তুত নয় এই মহাসড়ক।

জানা গেছে, ২০১৮ সালের অক্টোবরে ভাঙ্গা–বরিশাল–কুয়াকাটা মহাসড়ক প্রকল্প একনেকে পাস হলেও এখনো জমিই অধিগ্রহণ করা যায়নি। ফলে কবে নাগাদ মহাসড়কের নির্মাণকাজ শুরু হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

সড়ক ও জনপথ (সওজ) বলছে, আর ভাঙ্গা থেকে বরিশাল হয়ে কুয়াকাটা পর্যন্ত দূরত্ব প্রায় ২০৫ কিলোমিটার। দীর্ঘ এই সড়ক মাত্র ২৪ ফুট চওড়া। এই সড়কে ঢাকা থেকে বরিশাল বিভাগের ১০ জেলার যানবাহন সামাল দিতে এখনই হিমশিম অবস্থা। পদ্মা সেতু চালুর পর যান চলাচল বেড়ে যাবে কয়েক গুণ।

ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত ছয় লেনের এক্সপ্রেসওয়ে হলেও ঢাকা-বরিশাল হয়ে কুয়াকাটা পর্যন্ত মহাসড়ক রয়ে গেছে আগের মতোই
ছবি: প্রথম আলো

সওজ সূত্র জানায়, ঢাকা থেকে বরিশাল হয়ে কুয়াকাটার দূরত্ব ২৯৩ দশমিক ৭ কিলোমিটার। সেতু চালুর পর যানজট না থাকলে ঢাকা থেকে কুয়াকাটা যেতে লাগবে ছয় ঘণ্টা। কিন্তু বর্ধিত যানবাহনের চাপে সেই সুফল কতটা মিলবে, তা নিয়ে ভাবনায় অঞ্চলের যাত্রী, পরিবহনমালিক ও চালক থেকে শুরু করে ব্যবসায়ীরা।

পদ্মা সেতু ২১ জেলাকে সংযুক্ত করছে। এই সেতু দিয়ে কী পরিমাণে যানবাহন চলাচল করবে, তার একটি ধারণা পাওয়া যায় ২০০৯ সালে করা এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) একটি সমীক্ষা প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়, ২০২২ সালের শুরুতে পদ্মা সেতু উদ্বোধন হলে ওই বছর সেতু দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২৪ হাজার যানবাহন চলাচল করবে। সংখ্যাটি বাড়তে থাকবে। আর ২০৫০ সাল নাগাদ এই সংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ৬৭ হাজার।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ভাঙ্গা থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত প্রায় ২০৫ দশমিক ৪ কিলোমিটার মহাসড়কে এই যান চলাচলের সক্ষমতা একেবারেই নেই। ফলে মাত্র পাঁচ ঘণ্টায় সমুদ্রসৈকতে পৌঁছানোর আশা দুরাশায় পরিণত হতে পারে। বর্ধিত যানবাহনের চাপে ধীরগতির কারণে এ পথ যেতে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা লেগে যেতে পারে।

বরিশাল বাস মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক কিশোর কুমার দে প্রথম আলোকে বলেন, ‘সত্তরের দশকের ১২ ফুট চওড়া বরিশাল-ভাঙ্গা সড়ক গত ৫০ বছরে বেড়ে মাত্র ২৪ ফুট হয়েছে। অথচ এই ৫০ বছরে দেশের জনসংখ্যা আড়াই গুণ বেড়েছে। বেড়েছে যানবাহনও। ফলে যানজট হয়, যানবাহনের গতি ধীর হয়। এতে সময় লাগছে বেশি। পদ্মা সেতু চালুর পর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৬ সালে ভাঙ্গা-বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এরপর প্রাথমিক কাজও শুরু করে সওজ। প্রকল্প প্রস্তাব চূড়ান্ত হওয়ার পর ২০১৮ সালে অনুমোদনের জন্য তা জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (একনেক) সভায় তোলা হয়। ওই বছরের ১১ অক্টোবর ভাঙ্গা থেকে বরিশাল হয়ে কুয়াকাটা পর্যন্ত ১৯৫ কিলোমিটার ছয় লেনবিশিষ্ট এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের অনুমোদন দেয় সরকার। এতে জমি অধিগ্রহণের জন্য ১ হাজার ৮৬৭ কোটি ৮৫ লাখ ৯০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।

সওজ সূত্র জানায়, প্রকল্প অনুযায়ী, বিপরীতমুখী দুই লেনের দুটি সড়কসহ ধীরগতির স্থানীয় যান চলাচলের জন্য আলাদা দুটি সার্ভিস লেন বা সড়ক করার অনুমোদন দেয় একনেক। এর প্রস্থ হবে ১৭০ ফুট।

প্রকল্প প্রস্তাবে ২০২০ সালের জুনের মধ্যে এক্সপ্রেসওয়ের জন্য জমি অধিগ্রহণের কাজ শেষ করতে বলা হয়। কিন্তু ২০২২ সালের জুনেও সেই কাজ শুরু করতে পারেনি সড়ক ও সেতু বিভাগ। এরই মধ্যে পর পর তিনবার ফেরত গেছে প্রকল্পের বরাদ্দ অর্থ। সর্বশেষ অর্থবছরে বরাদ্দ দেওয়া অর্থও ফেরত যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

সওজ সূত্র জানায়, সড়ক নির্মাণে কতটুকু জমি অধিগ্রহণ করতে হবে, তা চিহ্নিত করার দায়িত্ব পাওয়া পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের ভুলের কারণে এই দীর্ঘসূত্রতা। ২০৫ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়ক সম্প্রসারণে তারা ৩০২ একর জমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব করেছে। পরে সওজের নিজস্ব সার্ভেয়ার দিয়ে জরিপ করে দেখা যায়, এতে ১ হাজার ৯১ একর জমি লাগবে। এমন নানা ভুলের কারণে নির্ধারিত সময়ে জমি অধিগ্রহণের কাজ শুরু করা যায়নি।

তবে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এখন দ্রুতগতিতে জমি অধিগ্রহণের কাজ শুরু হয়েছে। প্রয়োজনীয় জমি চিহ্নিত করার পর তা অধিগ্রহণের ব্যবস্থা নিতে ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর ও বরিশালের জেলা প্রশাসনকে চিঠি পাঠানো হয়েছে। পটুয়াখালীতে জমি চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে কিছু জটিলতা আছে। সেটিও নিরসনের চেষ্টা চলছে।

প্রকল্পের সাবেক পরিচালক সড়ক ও সেতু বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী তারেক ইকবাল প্রথম আলোকে বলেন, প্রয়োজনীয় জমি চিহ্নিত করার পর তা অধিগ্রহণ করতে সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোর প্রশাসনকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি বছরের শেষ নাগাদ সড়ক নির্মাণকাজ শুরু হতে পারে।