ভোমরা স্থলবন্দরের শ্রমিক পরিবারগুলো চরম খাদ্যসংকটে

‘করোনার জন্যি বন্দর বন্ধ। তিন সপ্তাহ কোনো কাজ করতি পারতেছি নে। কোনো ত্রাণ–ট্রান দেয়নি কেউ। টাকাপয়সা যা ছেল, চার-পাঁচ দিন বাড়ি বসে বসে খাতি খাতি সব শেষ হয়ে গে। চাইয়েচিন্তে আর ধারদেনা করে দিন চলতে। আর কয় দিন এ রকম চললি ছ্যালেমাইয়ে নে বেঁচে থাকা দুষ্কর হয়ে পড়বে নে।’ করোনা-পরিস্থিতিতে সারা দেশে চলমান ‘অঘোষিত লকডাউনের’ কারণে বন্ধ থাকা সাতক্ষীরার ভোমরা বন্দরের শ্রমিক আবদুর রহমান (৪২) সম্প্রতি এভাবেই তাঁর কষ্টের কথা তুলে ধরেন।
শ্রমিক আবদুর রহমান আরও বলেন, ভোমরা ইউনিয়নের গাজীপাড়ায় চার কাঠা জমিতে খুপরিতে তাঁদের বসবাস। সবকিছু কিনে খেতে হয়। গত ২৬ মার্চ থেকে বন্দরে আমদানি-রপ্তানি বন্ধ। ২১ থেকে ২২ দিন হতে চলল, একটি টাকা উপার্জন করতে পারেননি তিনি। বন্দর চালু থাকলে পণ্য খালাস করে প্রতিদিন ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা আয় করতেন তিনি। তা দিয়ে তিন ছেলেমেয়ে আর স্ত্রী নিয়ে তাঁর পাঁচজনের সংসার কোনোরকমে চলছিল। বড় মেয়ে দশম, ছোট মেয়ে সপ্তম ও ছেলে প্রথম শ্রেণিতে পড়ে। তিনি তাদের মুখের দিকে আর তাকাতে পারছেন না। তিনি বলেন, ‘আপনাদের সাথে অনেকের চেনা–পরিচয় আছে। কাউকে বলে আমাদের কিছু খাবারের ব্যবস্থা করে দেন।’
একই ধরনের কষ্টের কথা জানান ভোমরার ফুলতলা গ্রামের হাফিজুর রহমান (৪০), পদ্মশাখরার আলতাফ গাজী (৬৫), আবদুল আজিজ (৪২), গাংনিয়ার জিয়ারুল ইসলাম (৪৫), গুচ্ছগ্রামের রুহুল আমিন ও লক্ষ্মীদাঁড়ির জহুরুল ইসলাম (৫২)। জহুরুল ইসলাম বলেন, ‘ভাই, শ্রমিকদের দিকে একটু তাকান। সবার একই অবস্থা, চলতে পারছি নে। কোনোরকমে বেঁচে আছি।’
আবদুর রহমান ও জহুরুলের মতো বন্দরে কর্মরত সাড়ে চার হাজার শ্রমিকের একই অবস্থা। এই পরিস্থিতিতে তাঁদের দাবি, ‘হয় কাজ দাও, নাহলে বেঁচে থাকার মতো ত্রাণ দাও।’
এই সংকটের কারণে আরেক সংকটের আভাস দিয়ে নাম না প্রকাশ করার শর্তে দুজন শ্রমিক জানান, অনেক সময় বন্দর নানা কারণে দু–চার দিন বন্ধ থাকে। দিন এনে, দিন খাওয়া শ্রমিকেরা বাধ্য হয়ে চোরাচালানের সঙ্গে যুক্ত হন। এখন সীমান্ত খুব কড়াকড়ি। পণ্য বিক্রি করার মতো বাজার খোলা নেই। শ্রমিকেরা পড়েছেন উভয়সংকটে।
সাতক্ষীরার ভোমরা বন্দরে কাজ করে চারটি হ্যান্ডলিং শ্রমিক ইউনিয়ন। এর মধ্যে ভোমরা গোডাউন স্থলবন্দর হ্যান্ডলিং শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি এরশাদ আলী ও ভোমরা স্থলবন্দর হ্যান্ডলিং শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি আনারুল ইসলাম গাজী জানান, বন্দরে চারটি ইউনিয়নে নিবন্ধনকৃত শ্রমিক সংখ্যা ৩ হাজার ৩০০। এ ছাড়া অনিবন্ধনকৃত শ্রমিক রয়েছেন ১ হাজার ২০০ জনের মতো। সব মিলিয়ে সাড়ে ৪ হাজার শ্রমিকের পরিবারের সদস্যসংখ্যা প্রায় ২০ হাজার। ২৬ মার্চ থেকে করোনাভাইরাসের কারণে বন্দরে আমদানি-রপ্তানি ছাড়া সব ধরনের কাজ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। তিন সপ্তাহ কাজ না থাকায় শ্রমিকদের আয় নেই। ফলে তাঁরা চরম আর্থিক সংকটে পড়ে যারপরনাই কষ্টে রয়েছেন। অবিলম্বে সহায়তা না দিলে তাঁদের জন্য বেঁচে থাকা দুষ্কর হয়ে পড়বে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক এস এম মোস্তফা কামাল জানান, ভোমরা স্থলবন্দরটি ভোমরা ইউনিয়নে অবস্থিত। ইতিমধ্যে তিনি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের নেতাসহ অন্য জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলেছেন। দ্রুততম সময়ের মধ্যে বন্দরের শ্রমিকদের জন্য সহায়তার ব্যবস্থা করা যাবে বলে আশা করছেন তিনি।