সফল উদ্যোক্তা
মাল্টা-চুইঝালে সুব্রতর স্বপ্ন
খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার সুব্রত মণ্ডল ২০১৮ সালে মাল্টা ও চুইঝালের বাগান করেন। চুইঝাল বিক্রি করে তিনি ইতিমধ্যে ১২ লাখ টাকা পেয়েছেন
খুলনা সরকারি ব্রজলাল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ (বিএল কলেজ) থেকে ইংরেজিতে স্নাতক শেষ করেছেন সুব্রত মণ্ডল। চাকরিও করছেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। কিন্তু তাতে আর্থিক নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিলেন। এ কারণে চাকরির পাশাপাশি সংসারে সুদিন ফেরানোর জন্য শুরু করেছেন কৃষিকাজ। এক একর জমিতে সমন্বিতভাবে গড়ে তুলেছেন মাল্টা ও চুইঝালের বাগান। আর তাতেই স্বপ্ন বুনছেন অর্থনৈতিক মুক্তির। আগামী বছর মাল্টা ও চুই বিক্রি করে এক কোটি টাকা আয় করতে পারবেন বলে আশা করছেন তিনি।
সুব্রত মণ্ডলের বাড়ি খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার বটিয়াঘাটা গ্রামে। বয়স ৩৯ বছর। তাঁর বাগানে মাল্টাগাছ রয়েছে ৩০৮টি। আর চুইঝালের গাছ রয়েছে ১ হাজার ৮০০–এর মতো। এর পাশাপাশি সিডলেস (বিচিবিহীন) লেবুর গাছ রয়েছে ১৪০টি। দুই বছর আগে করা বাগানে এ বছর থেকেই মাল্টা ধরতে শুরু করেছে। তবে তা বিক্রি করেননি। প্রথম বছর আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের মধ্যে বিলিয়ে দিয়েছেন। তবে বিক্রি করতে শুরু করেছেন চুইঝাল। দুই বছরেই একেকটি চুইঝালের গাছ থেকে ১০ থেকে ১২ কেজি করে চুই বিক্রি করতে পারছেন। প্রতি কেজি চুই পাইকারি বিক্রি হচ্ছে কমপক্ষে ৫০০ টাকায়।
সুব্রত মণ্ডল বলেন, ‘বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করি। কখন চাকরি চলে যায় সব সময় এমন আতঙ্কে থাকতে হয়। ওই আতঙ্ক থেকেই পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে মাল্টাগাছ লাগানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ নিয়েও দেখা গেছে এর বাণিজ্যিক সাফল্য বেশ। এ কারণেই মাল্টাবাগান করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।’
সুব্রত মণ্ডল আরও বলেন, ইতিমধ্যে ২০০টির মতো চুইগাছ থেকে আড়াই হাজার কেজির মতো চুই বিক্রি করা হয়েছে। সেখান থেকেই সাড়ে ১২ লাখ টাকার মতো পাওয়া গেছে। এখন জমিতে এক হাজারের মতো বিক্রি উপযোগী চুইঝালগাছ রয়েছে। সেটি বিক্রি করেই ৪০ লাখ টাকার বেশি পাওয়া যাবে।
স্বপ্ন বোনার শুরু: ২০১০ সালে স্নাতক শেষ করেন সুব্রত। এরপর নিজের টিউশনি থেকে জমানো টাকা বিনিয়োগ শুরু করেন শেয়ারবাজারে। শেয়ারবাজার তখন বেশ রমরমা। প্রথম বছর বেশ লাভও আসে সেখান থেকে। পরে শেয়ারবাজার ধসে যা লাভ হয়েছিল, তাসহ ১১ লাখ টাকার মতো গচ্চা যায়। এরপর ২০১২ সালে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি শুরু করেন। ২০১৫ সালে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলে তাঁর চাকরি নিয়ে টানাটানি শুরু হয়। বিকল্প কিছু করার চিন্তা শুরু করেন সুব্রত। সম্বল বলতে আছে শুধু বাবার ১০ বিঘা জমি। সেটিকেই কীভাবে কাজে লাগানো যায়, সেটিই ছিল তাঁর মাথায়। কিন্তু ছেলের কথায় সন্তুষ্ট হতে পারেন না বাবা, তাই জমিও ছেলের কাছে ছাড়তে নারাজ। এভাবে চলে যায় আরও তিন বছর।
২০১৭ সালে বিয়ে করেন সুব্রত। বিয়ের পর ছেলেবউয়ের পীড়াপীড়িতে ২০১৮ সালে এক একর জমি দিতে রাজি হন বাবা নীহাররঞ্জন। এরপর সুব্রত ওই জমিতে কী লাগানো যায়, তা নিয়ে ভাবতে শুরু করেন। ওই বছর খুলনা সার্কিট হাউস মাঠে অনুষ্ঠিত বৃক্ষমেলা থেকে মাল্টা চাষের ধারণা নেন। এরপর কয়েকজন কৃষি কর্মকর্তা ও খুলনা নগরের দৌলতপুরে অবস্থিত হর্টিকালচার সেন্টার থেকে মাল্টা চাষের খোঁজখবর নিতে শুরু করেন। সে অনুযায়ী ২০১৯ সালের শুরুতে ধানের জমিতে মাটি তুলে উঁচু করে মাল্টা চাষের উপযোগী করা হয়। বর্ষা মৌসুমের শুরুতে জুন মাসের দিকে হর্টিকালচার সেন্টার থেকে বারি-১ জাতের মাল্টা চারা সংগ্রহ করে রোপণ করেন। দুই গাছের ফাঁকে লাগান চুইয়ের চারা। আর জমির সীমানা বরাবর রোপণ করেন বিচিবিহীন লেবুর চারা। বর্তমানে ওই বাগানের বয়স মাত্র আড়াই বছর।
সুব্রতর হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে তাঁর বাগানে ৭০ থেকে ৮০ লাখ টাকার চুইঝাল রয়েছে। আর আগামী বছর কমপক্ষে ১৫ লাখ টাকার মাল্টা বিক্রি করতে পারবেন। প্রতিবছর মাল্টার উৎপাদন বাড়বে। বর্তমানে সার্বক্ষণিক একজন শ্রমিক রেখেছেন। তাঁর বেতন লেবু বিক্রির টাকা থেকেই দেওয়া হচ্ছে।
জমিকে মাটি দিয়ে উঁচু করাসহ নানা কাজে গত আড়াই বছরে সুব্রতর খরচ হয়েছে ১০ লাখ টাকার মতো। দুই বছর সেখানে শুধু টাকা খরচ করেছেন। আর তার সুফল পাচ্ছেন এখন। শুরুর দিকে আশপাশের লোকজন প্রকল্পটি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা করলেও এখন তাঁরাই প্রকল্পটি দেখতে আসছেন। অনেকে ছোট আকারে হলেও সুব্রতর মতো এমন প্রকল্প গড়ে তুলছেন।
বটিয়াঘাটা কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয়ের কর্মকর্তারা এখন সুব্রতকে সার্বক্ষণিক পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করছেন। এ বিষয়ে বটিয়াঘাটা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রবিউল ইসলাম বলেন, সুব্রত ওই বাগান থেকে আগামী বছর প্রায় এক কোটি টাকার মাল্টা ও চুই বিক্রি করতে পারবেন। তাঁর ওই সফলতার কাহিনি এখন বটিয়াঘাটার বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।