মায়ের কোলে বসে খেলছিল, হঠাৎ গুলিতে ছটফট করছে ছোট্ট লামিছা

ইউপি নির্বাচন
প্রতীকী ছবি

১ বছর ১০ মাস বয়সের লামিছা মায়ের কোলে বসে খেলছিল। হঠাৎ শটগানের গুলি লাগে তার শরীরে। মা রুবিনা আক্তার কিছু বুঝে ওঠার আগেই রক্তাক্ত হয়ে যায় আদরের সন্তানের শরীর। তাঁর নিজের শরীরেও লাগে গুলি। মা-মেয়ের চিৎকারে স্বজনেরা এসে তাঁদের হাসপাতালে নিয়ে যান। এখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গুলির ক্ষত নিয়ে ছটফট করছে ছোট্ট লামিছা।

গতকাল বুধবার শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার বিলাশপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) নির্বাচনে ৮ নম্বর ওয়ার্ডের রহিম উদ্দিন মালাই মৃধা কান্দি একতা যুব সংঘ কেন্দ্রে দুই সদস্য প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। তাঁদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ শটগানের ১২টি গুলি ছোড়ে। সেই গুলিতেই লামিছা, তার মা রুবিনা আক্তার ও প্রতিবেশী ইমরান হোসেন গুলিবিদ্ধ হন বলে অভিযোগ।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রুবিনা মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি ওই কেন্দ্রের ভোটার। ভোট দেওয়ার জন্য দুপুরে বাবার বাড়িতে যাই। কেন্দ্রের কাছেই আমাদের বসতঘর। বিকেলে মেয়েকে কোলে নিয়ে ঘরের ঘাটে বসেছিলাম। হঠাৎ জানালা ও টিনের বেড়া ভেদ করে গুলি লাগে। আমরা মা-মেয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে লুটিয়ে পড়ি।’

পুলিশ বলছে, নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর ওই কেন্দ্রে বিজয়ী প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলম ও পরাজিত প্রার্থী মতিউর রহমান সিকদারের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ শটগানের ১২টি গুলি ছোড়ে। তারা কোনো ব্যক্তি বা ঘর উদ্দেশ্য করে গুলি ছোড়েনি। কীভাবে, কোথা থেকে মা-মেয়ে ও আরেক ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ হয়েছেন, তা তারা বুঝতে পারছেন না। ওই ঘটনায় প্রিসাইডিং কর্মকর্তা শেখ দেলোয়ার হোসেন বাদী হয়ে একটি মামলা করেছেন। মামলায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে। বিস্ফোরক আইন ও সরকারি কাজে বাধা সৃষ্টির অভিযোগ এনে মামলাটি করা হয়েছে।

লামিছার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গতকাল রাতেই মা-মেয়েকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসক কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা দিয়েছেন। ওই পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলাফল পাওয়ার পর বোঝা যাবে লামিছার শরীরের অবস্থা কেমন।

লামিছার বাবা শফিউল ইসলামের বাড়ি সিরাজগঞ্জে। তিনি ও তাঁর স্ত্রী স্থানীয় বেসরকারি সংস্থা নড়িয়া উন্নয়ন সমিতিতে কাজ করেন। জাজিরা উপজেলা সদরে থাকেন। শফিউল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘পুলিশের গুলিতে আমার স্ত্রী–মেয়ে গুলিবিদ্ধ। আমরা কার কাছে বিচার চাইব? কে আমাদের পাশে থাকবে? চোখের সামনে মেয়েটি ছটফট করছে। বাবা হয়ে মুখ বুজে তা সহ্য করছি।’

জানতে চাইলে পরাজিত প্রার্থী মতিউর রহমান সিকদার বলেন, ‘গুলিবিদ্ধ রুবিনা আমার চাচাতো বোন। আমার সমর্থকেরা কোনো হামলা করেনি। তারপরও পুলিশ উদ্দেশ্যমূলকভাবে আমাদের বাড়ি-ঘর লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। ঘরের মধ্যে থাকা অবস্থায় আমার বোন ও ভাগনি গুলিবিদ্ধ হয়।’

তবে বিজয়ী প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলম এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

জাজিরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘দুই সদস্য প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। ককটেল ফাটিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে কেন্দ্রে হামলার ঘটনা ঘটে। তখন ভোটের সরঞ্জাম ও কর্মকর্তাদের নিরাপদে রাখতে ফাঁকা গুলি ছোড়া হয়। কিন্তু ওই শিশু ও তার মা কীভাবে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন, তা বুঝতে পারছি না। বিষয়টি আমরা তদন্ত করছি।’