রাউজানে ‘বিনা ভোট’ রীতিতে জনপ্রতিনিধি

উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সাড়ে ছয় বছর ধরে ভোটের প্রয়োজন হচ্ছে না চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলায়।

পৌরসভা নির্বাচন
প্রতীকী ছবি

ভোটের জন্য প্রার্থীর পক্ষে মাইকিং, পোস্টার ছাপানো, লিফলেট বিতরণ, পথসভা বা বাড়ি বাড়ি গিয়ে গণসংযোগ—এসবের দরকার হয় না চট্টগ্রামের রাউজানে। বিরোধী প্রার্থীদের প্রচারে বাধা, হুমকি, সংঘর্ষের মতো ঘটনাও এই উপজেলায় নেই। এর কারণ, সাড়ে ছয় বছর ধরে এখানকার ছয় লাখের বেশি মানুষ ভোট দিয়ে পছন্দের প্রার্থীকে জনপ্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচনের সুযোগই পাচ্ছেন না।

উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়’ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের জয়ী হওয়ার রীতি প্রায় প্রতিষ্ঠিত হতে চলেছে এখানে। রাউজান পৌরসভায় নির্বাচন ২৮ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু ভোট গ্রহণের আগেই মেয়র ও সাধারণ ওয়ার্ডের ১২ জন এবং সংরক্ষিত ওয়ার্ডের ৩ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কাউন্সিলর নির্বাচিত হতে চলেছেন।

এটা নির্বাচনী ব্যবস্থাকে প্রহসনে পরিণত করা ছাড়া আর কিছুই নয়।
বদিউল আলম মজুমদার, সম্পাদক, সুশাসনের জন্য নাগরিক

নির্বাচনে প্রভাব খাটানো, কারচুপি, হামলা, সংঘর্ষসহ নানা অভিযোগ থাকলেও রাউজানের মতো একেবারে বিনা ভোটে স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন নির্বাচনে জয়ী হওয়ার নজির চট্টগ্রামের অন্য উপজেলায় খুব একটা নেই। চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া, মিরসরাই ও বারইয়ারহাট পৌরসভাতেও ২৮ ফেব্রুয়ারি ভোট গ্রহণ হবে। সেখানে প্রতিটি পদে একাধিক প্রার্থী রয়েছে। তবে রাউজানে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ-মনোনীত প্রার্থীর বাইরে বিএনপি কিংবা অন্য দল, এমনকি আওয়ামী লীগের বিদ্রোহীরাও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সাহস পান না।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাউজানের সংসদীয় আসন থেকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সাংসদ নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের প্রার্থী এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরী। ওই নির্বাচনে সারা দেশে ১৫৩ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সাংসদ হন। এর পর থেকে রাউজানে স্থানীয় সরকারের প্রায় সব পর্যায়ের নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার জয়ী হওয়ার প্রচলন শুরু হয়।

অবশ্য ২০১৫ সালে রাউজান পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র পদে ভোট হয়। কিন্তু নির্বাচিত মেয়র দেবাশীষ পালিত দায়িত্ব গ্রহণের পর পাঁচ বছর পৌরসভা কার্যালয়েই যেতে পারেননি। চট্টগ্রাম শহরে থেকেই মেয়রের দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে মেয়াদের পুরোটা সময়। এর কারণ, স্থানীয় রাজনীতিতে তিনি সাংসদ ফজলে করিম চৌধুরীর বিরোধী ধারার নেতা হিসেবে পরিচিত।

রাউজান উপজেলায় ইউনিয়ন ১৪টি। ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত ১৪টি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মধ্যে ১১টিতেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হন আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা। এরপর ২০১৯ সালের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনেও চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান ও সংরক্ষিত নারী চেয়ারম্যান পদে সবাই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।

দেবাশীষ পালিত চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক। রাউজান পৌরসভা কার্যালয়ে যেতে না পারার বিষয়ে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি রাজনৈতিক কারণে চেয়ারে বসতে পারিনি।’ এর বেশি কিছু তিনি বলতে চাননি। এবার আর মেয়র পদে দলীয় মনোনয়ন পাননি তিনি।

রাউজান উপজেলায় ইউনিয়ন ১৪টি। ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত ১৪টি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মধ্যে ১১টিতেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হন আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা। এরপর ২০১৯ সালের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনেও চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান ও সংরক্ষিত নারী চেয়ারম্যান পদে সবাই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।

অবশ্য ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাউজানে একাধিক প্রার্থী ছিলেন। ফজলে করিম চৌধুরী ২০০১ সাল থেকে টানা চারবার এই আসনের সাংসদ। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ফাঁসি কার্যকর হওয়া বিএনপির নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর চাচাতো ভাই ফজলে করিম চৌধুরী।

রাউজানে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিনা ভোটের বিষয়ে সাংসদ এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

তবে এবার বিনা ভোটে পৌর মেয়র নির্বাচিত হতে চলা রাউজান উপজেলা যুবলীগের সভাপতি জমির উদ্দিন বলেন, ‘রাউজানের অভিভাবক হিসেবে সাংসদ ফজলে করিম চৌধুরী আমাদের মুরব্বি। তাঁর নির্দেশনা এবং পরামর্শে সবার সহযোগিতায় একটি নান্দনিক পৌরসভা গঠনে কাজ করব।’

মনোনয়নপত্র জমা না দিতে পাহারার ব্যবস্থা

এবার রাউজান পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র পদে বিএনপি থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয় পৌর বিএনপির সাবেক সভাপতি আবু জাফর চৌধুরীকে। হুমকি এবং নানামুখী চাপে তিনি শেষ পর্যন্ত মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারেননি।

আবু জাফর চৌধুরী বলেন, ‘সারা বাংলাদেশে এক নিয়ম আর রাউজানে আরেক নিয়ম। ভয়ভীতি, চাপ থাকা সত্ত্বেও আমি ডিসি সাহেবের কাছে ফরম জমা দিতে গিয়েছিলাম। কিন্তু সেখান থেকে জানানো হলো, উপজেলায় জমা দিতে হবে। কিন্তু দিতে পারিনি। আমার আইনজীবীকে দিয়ে মনোনয়নপত্র পাঠিয়েছিলাম। তাঁকে উপজেলায় ঢোকার মুখে তল্লাশি করা হয়। পরে কোনোরকমে প্রাণ নিয়ে তিনি পালিয়ে আসেন।’

কাউকে মনোনয়ন জমাদানে বাধা দেওয়া হয়নি। এখানে অন্য কোনো দলের কর্মকাণ্ড নেই। আওয়ামী লীগের যাঁরা মনোনয়ন চেয়েছেন, আমরা বসে তাঁদের মধ্যে একজনকে সমর্থন করেছি। তাই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচন হচ্ছে
কাজী আবদুল ওহাব ,রাউজান উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি

একইভাবে কাউন্সিলর প্রার্থীরাও কেউ মনোনয়ন জমা দেওয়ার সাহস করেননি। আওয়ামী লীগের লোকজন রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে পাহারা বসাতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডে বিকাশ দাশগুপ্ত নামের একজন স্বতন্ত্র কাউন্সিলর প্রার্থী ২ ফেব্রুয়ারি সকালে সবার অগোচরে গিয়ে মনোনয়নপত্র জমা দিতে পেরেছিলেন। অবশ্য মনোনয়ন জমা দিয়েই তিনি আত্মগোপনে চলে যান।

এ বিষয়ে রাউজান উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি কাজী আবদুল ওহাব প্রথম আলোকে বলেন, ‘কাউকে মনোনয়ন জমাদানে বাধা দেওয়া হয়নি। এখানে অন্য কোনো দলের কর্মকাণ্ড নেই। আওয়ামী লীগের যাঁরা মনোনয়ন চেয়েছেন, আমরা বসে তাঁদের মধ্যে একজনকে সমর্থন করেছি। তাই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচন হচ্ছে।’
আর পৌরসভা নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা জোনায়েদ কবিরের বক্তব্য হচ্ছে, হুমকি-ধমকি দেওয়া কিংবা মনোনয়নপত্র জমা দিতে না পারার বিষয়ে কেউ তাঁদের কাছে কোনো অভিযোগ করেনি।

মনোনয়ন বাতিলের কৌশল

এবার পৌর ভোটে মেয়র, তিনটি সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদ এবং নয়টি সাধারণ কাউন্সিলর পদের মধ্যে একমাত্র ৬ নম্বর ওয়ার্ডে একাধিক প্রার্থী ছিলেন। এই ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থী সমীর দাশগুপ্ত। অপরজন বিকাশ দাশগুপ্ত। তাঁর (বিকাশ) মনোনয়নপত্র ৪ ফেব্রুয়ারি যাচাই-বাছাইয়ের সময় বাদ দেওয়া হয়। বাছাইয়ের সময় বিকাশের প্রস্তাবকারী দীপক দত্ত ও সমর্থনকারী শুভ দাশগুপ্ত রিটার্নিং কর্মকর্তাকে জানান, তাঁরা প্রস্তাব করেননি, সমর্থনও দেননি।

উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ও নির্বাচনের সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা অরুণোদয় চাকমা বলেন, দুই প্রস্তাব ও সমর্থনকারী লিখিত আবেদন দিয়ে জানান তাঁরা স্বাক্ষর করেননি। এর বিরুদ্ধে প্রার্থী আপিলও করেননি।

বিকাশ দাশগুপ্ত মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি এখন পালিয়ে ঢাকায় আছি। আমার প্রস্তাবকারী ও সমর্থনকারীকে নির্যাতন করে জোরপূর্বক স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে। পরে নানামুখী চাপে আমিও প্রত্যাহারের চিঠি দিয়ে দিয়েছি। রাউজানের অবস্থা তো আপনারা জানেন। আর কী বলব?’

এর আগে ২০১৫ সালের পৌর নির্বাচনেও প্রতিপক্ষের প্রার্থীকে হয় মনোনয়নপত্র জমাদানে বাধা দেওয়ার অভিযোগ ছিল। অনেক ক্ষেত্রে প্রস্তাবকারী ও সমর্থনকারীর কাছ থেকে জোরপূর্বক স্বাক্ষর আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। আর ১৪টি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ১৩টিতে বিএনপির প্রার্থীর মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের সময় বাতিল করা হয়। তখনো প্রস্তাবকারী ও সমর্থনকারীদের হুমকি দিয়ে সই নেওয়া হয়েছিল বলে স্থানীয় বিএনপির নেতারা জানান। পরে মনোনয়নপত্র বাতিল হয়ে যায়।

ভোটের ‘রাউজান মডেল’-এর বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, এখন অনেক জায়গায় এই পদ্ধতি চলছে। এটা নির্বাচনী ব্যবস্থাকে প্রহসনে পরিণত করা ছাড়া আর কিছুই নয়।