রাজশাহীতে বন্ধ হলো ১২৬ জনের মুক্তিযোদ্ধা ভাতা
রাজশাহী মহানগরের মুক্তিযোদ্ধা ভাতাভোগী ১২৬ জনের ভাতা বন্ধ হয়ে গেল। সর্বশেষ গত ফেব্রুয়ারি থেকে তাঁদের ভাতা বন্ধ করে দেওয়া হয়। তাঁদের ছাড়া অন্য বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ফেব্রুয়ারি মাসের ভাতা দুই দিন আগে এসেছে। এর সঙ্গে বন্ধ হলো কবি ও অধ্যাপক রুহুল আমিন প্রামাণিক এবং জাতীয় শ্রমিক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি নূর কুতুবুল আলমের ভাতাও। তাঁদের দাবি, স্থানীয় রাজনীতির শিকার তাঁরা।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গেজেটভুক্তির জন্য ৩৩ ধরনের প্রমাণ প্রয়োজন পড়ে। এর মধ্যে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) সুপারিশও প্রয়োজন। কিন্তু রাজশাহী মহানগরের ৫৫২ জন ভাতাভোগীর মধ্যে ১৬০ জনের ব্যাপারে জামুকার সুপারিশ ছিল না। পরবর্তী সময়ে সেটি ধরা পড়লে যাচাই-বাছাইয়ের নির্দেশনা দেওয়া হয়। গত বছর ফেব্রুয়ারিতে তালিকা অনুযায়ী রাজশাহী মহানগরের ১৬০ জন বিতর্কিত বীর মুক্তিযোদ্ধার মধ্যে ৩৪ জনকে যাচাই-বাছাই শেষে বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গেজেটে নিয়মিতকরণের জন্য সরাসরি সুপারিশ করা হয়। বাদ পড়েন বাকি ১২৬ জন।
সরাসরি যাচাই-বাছাই শেষে তাঁদের মধ্যে ৮৩ জনের আবেদন নামঞ্জুর করা হয় এবং আবেদন জমা না দেওয়া ও কমিটির সামনে হাজির না হওয়ায় ২৭ জনকে গেজেটে নিয়মিতকরণে সুপারিশ করা হয়নি। বাকিদের মধ্যে সাতজন অন্য এলাকার হওয়ায় এবং একজন বিজিবি সদস্যের বিষয়ে আদালতে রিট আবেদন থাকায় জামুকা ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের জন্য পাঠানো হয়।
গত বছর ১৬ ফেব্রুয়ারি রাতে যাচাই-বাছাই করা বীর মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা জামুকায় পাঠানো হয়। রাজশাহীতে বীর মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাইয়ের জন্য চার সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। এ কমিটির সদস্যসচিব ছিলেন রাজশাহীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ শরিফুল হক। সদস্য ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. শফিকুর রহমান, মীর ইকবাল ও চৌধুরী এস মনিরুল ইসলাম।
১২৬ জন ভাতাভোগীর নাম বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সুপারিশ না করার প্রতিবাদে গত বছর ২০ ফেব্রুয়ারি তাঁদের পক্ষ থেকে রাজশাহীতে সংবাদ সম্মেলন করা হয়েছিল। সেখানে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র-২ রজব আলী বক্তব্য দিয়েছিলেন। যাচাই-বাছাইয়ে তাঁর বাবার নাম সুপারিশ না করার বিষয়টি তিনি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছিলেন। এর এক বছর পর বিতর্কিত ১২৬ জনের ভাতা বন্ধ করে দেওয়া হলো।
এ বিষয়ে রাজশাহী জেলা প্রশাসক মো. আবদুল জলিল প্রথম আলোকে বলেন, যাচাই-বাছাই কমিটিতে তাঁদের একজন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক শুধু সাচিবিক দায়িত্ব পালন করেছেন। মূল যাচাই-বাছাইয়ের কাজ করেছেন বীর মুক্তিযোদ্ধারা। ১২৬ জনের ভাতা বন্ধ হওয়ার বিষয়টি তিনি শুনেছেন। সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে ভাতা আসে। ওই ব্যাংকের একজন ব্যবস্থাপক তাঁকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
ভাতা বন্ধ হওয়া কবি ও অধ্যাপক রুহুল আমিন প্রামাণিক প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা স্থানীয় রাজনীতির শিকার। তিনি যদি বীর মুক্তিযোদ্ধার তালিকা থেকে বাদ পড়েন, তাহলে তো মুক্তিযুদ্ধই থাকে না। তিনি বলেন, ভাতা কেড়ে নিলেও তাঁদের কাছ থেকে কেউ মুক্তিযুদ্ধ কেড়ে নিতে পারবে না। সার্বিক মুক্তির জন্য তাঁরা এখনো মুক্তিযুদ্ধই করে যাচ্ছেন। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম এ যুদ্ধ চলতেই থাকবে বলে জানান তিনি।
গত বছর ১৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় শ্রমিক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি নূর কুতুবুল আলম মান্নান তাঁর প্রতিক্রিয়ায় বলেছিলেন, ২০১২ সাল থেকে তিনি ভাতা পান। এটা যদি না দেয়, না দেবে। মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে তিনি শহীদ এ এইচ এম কামারুজ্জামানের সঙ্গে ছিলেন। ভাতা বন্ধ হওয়ার পরে আর তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
বাবার ভাতা বন্ধ হওয়ার পর রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র-২ রজব আলীর মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।