আইনজীবী বীরেন্দ্রনাথ সরকার কৃতী ফুটবলার ও রেফারি ছিলেন। সাংবাদিকতাও করেছেন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে বিপ্লবী অনুশীলন দলের সদস্য ছিলেন। ১৯৭১ সালের ২ এপ্রিল রাজশাহী নগরের বোয়ালিয়াপাড়া এলাকায় নিজ বাড়িতে পাকিস্তানি সেনারা তাঁকে গুলি করে হত্যা করে। সেই বাড়িই এখন বেদখল হয়ে রয়েছে। স্বাধীনতার পরপর তাঁর নামে নগরের একটি সড়কের নামকরণ করা হয়েছিল। সেই নামফলকও এখন আর নেই।
বীরেন্দ্রনাথ সরকারের বয়স হয়েছিল ৫৬ বছর। নিজের ভাই ও বোনের দুই মেয়ে তাঁর সঙ্গে থাকতেন। সেই উত্তরাধিকারীরাই এখন বাড়িটির দখল নিতে পারছেন না। এ জন্য তাঁরা মামলা করেছেন। শহীদ পরিবারের সদস্য হিসেবে তাঁরা সরকারি কোনো সুবিধাও পাননি।
বীরেন্দ্রনাথ সরকারের বাবা ছিলেন যোগেন্দ্রনাথ সরকার। তাঁরই নামানুসারে বাড়িটির নাম দেওয়া হয়েছিল ‘যোগেন স্মৃতি’। ১৯৭১ সালের ২ এপ্রিল সকাল সাড়ে ১০টার দিকে পাকিস্তানি সেনারা দোতলায় উঠে তাঁকে গুলি করে। হাত ওপরে তোলা অবস্থায় তিনি খাটের ওপরে পড়ে যান। তাঁর শরীরের অর্ধেকটা খাটের ওপরে ও বাকি অর্ধেকটা নিচে ঝুলে ছিল। সেদিন ওই বাড়িতে ছিলেন তাঁর ভাগনি চন্দনা চৌধুরীর ছেলে প্রদীপ চৌধুরী ওরফে পার্থ। তিনি তখন সপ্তম শ্রেণির ছাত্র ছিলেন। ঘটনার সময় পাশের কক্ষে লুকিয়ে ছিলেন। তাঁর কাছ থেকেই সেদিনের বর্ণনা পাওয়া যায়।
প্রদীপ চৌধুরী বলেন, ঘটনার দিন ছিল শুক্রবার। এক বিহারি ওই বাসায় লাকড়ি (জ্বালানি কাঠ) দিয়ে যেতেন। আগের দিন বৃহস্পতিবার তিনি লাকড়ি দিতে এসেছিলেন। পরের দিনই তিনি মিলিটারি নিয়ে আসেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মুক্তিযোদ্ধারা ওই বিহারিকে ধরে ট্রাকের পেছনে বেঁধে সারা শহর টেনে নিয়ে বেরিয়েছিলেন। এতেই তাঁর মৃত্যু হয়।
প্রদীপ চৌধুরী জানান, ৯ কাঠা জমির ওপর দোতলা বাড়ি ছিল। তিনি (বীরেন্দ্রনাথ সরকার) বিয়ে করেননি। তাই বাড়িটি আগেই ভাইয়ের মেয়ে রুবি শিকদার ও বোনের মেয়ে চন্দনা চৌধুরীকে উইল করে দিয়েছিলেন। সেই দলিল এখনো আছে। বাড়ি উদ্ধারের জন্য তাঁর ছোট বোন শ্রাবণী বাদী হয়ে উচ্ছেদ মামলা করেছেন। মামলা এখনো চলছে। দখলদারদের উচ্ছেদ করা যাচ্ছে না।
গতকাল রোববার সকালে ওই বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তিনটি পরিবার সেখানে বসবাস করছে। চেম্বারের ঘরটা বাদল সরকারের দখলে। তিনি বলেন, বীরেন্দ্রনাথ সরকার সম্পর্কে তাঁর মামা হতেন। সেই সূত্রে তিনি থাকেন। মাঝখানের ঘরটায় রতন মজুমদার নামের এক ব্যক্তি দখলে নিয়েছেন। তিনি কোনো কথা বলতে চাননি। আর পেছনের একতলা ঘরটি প্রদীপ দাস নামের এক ব্যক্তির দখলে। জানতে চাইলে তিনি বলেন, আগে একজন ভাড়া থাকতেন। ২০ বছর আগে তিনি তাঁকে দিয়ে গেছেন।
নগরের অলকার মোড় থেকে থেকে বেলদারপাড়া মহল্লার সড়কের নামকরণ করা হয়েছিল ‘শহীদ বীরেন্দ্রনাথ সড়ক’। সেখানে গিয়ে দেখা গেল, স্মৃতিফলকটি আর নেই।
রাজশাহী মহানগর মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার আবদুল মান্নান বলেন, স্মৃতিফলকটি হারিয়ে গেছে। নগরের তালাইমারীর মোড়ের শহীদ বাবর আলী সড়কের ফলকটিও নেই। সিটি করপোরেশনের সঙ্গে আলাপ করে একই সঙ্গে ফলক দুটি আবার স্থাপন করা হবে।