সবজিতে সেরা রাজশাহী
কৃষক তোফাজ্জল হোসেনের বাড়ি রাজশাহীর পবা উপজেলার পাইকপাড়া গ্রামে। তিনি আগে সব জমিতেই বোরোর আবাদ করতেন। কয়েক বছর ধরে সবজি চাষ করছেন। এবার তিন বিঘা জমিতে পাতাকপি, এক বিঘায় টমেটো, ১৫ কাঠা জমিতে ঢ্যাঁড়স এবং এক বিঘা জমিতে মরিচ চাষ করছেন। তিনি একা নন, ওই গ্রামের সব চাষিই বোরো বাদ দিয়ে সবজি চাষ করছেন। কারণ, বোরো আবাদ করে কৃষকের খরচের টাকাই ওঠে না। আর সবজি চাষে তাঁরা বেশ লাভবান হচ্ছেন।
এদিকে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাতে আট বছর ধরে রাজশাহীতে বোরো ধান ছেড়ে অন্য ফসল চাষে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। কৃষিবিদেরা বলছেন, পানিসাশ্রয়ী ফসলের চাষ বাড়াতে গিয়ে এবার রাজশাহী সবজি উৎপাদনে দেশসেরা হয়েছে। গত মাসের শেষ সপ্তাহে রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শামছুল হক দেশসেরা পুরস্কার পেয়েছেন। সবজি উৎপাদনে দ্বিতীয় হয়েছে সাতক্ষীরা এবং তৃতীয় হয়েছে কক্সবাজার জেলা।
শামছুল হক জানান, গত ২৬ জানুয়ারি ঢাকায় খামারবাড়িতে অধিদপ্তরের হর্টিকালচার শাখা আয়োজিত অনুষ্ঠানে শাকসবজি উৎপাদনে বিশেষ অবদানের জন্য তাঁদের একটি ক্রেস্ট এবং একটি সনদ দেওয়া হয়। তিনি বলেন, পানিসাশ্রয়ী ফসল খুঁজতে গিয়ে একদিকে বোরোর বদলে সবজির চাষ বেড়েছে, অন্যদিকে উন্নত জাতের প্রচলন, সারের সুষম ব্যবহার এবং সময়মতো রোগবালাই দমনে সফলতার কারণে সবজি চাষে সাফল্য এসেছে।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে রাজশাহীতে ২২ হাজার ২৩৫ হেক্টর জমিতে সবজি চাষ করা হয়েছে। হেক্টরপ্রতি গড় উৎপাদন হয়েছে ১৮ দশমিক ১২ মেট্রিক টন। মোট উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ২ হাজার ৭৯০ মেট্রিক টন। আট বছরে রাজশাহী জেলায় ২ হাজার ৮২৭ হেক্টর জমিতে সবজি চাষ বেড়েছে। ২০০৯-১০ অর্থবছরে এখানে সবজি চাষ হয়েছে ১৯ হাজার ৪০৮ হেক্টর জমিতে। তখন গড় উৎপাদন ছিল ১৭ দশমিক ৪২ মেট্রিক টন। মোট উৎপাদন ছিল ৩ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭ মেট্রিক টন। আট বছরে সবজির গড় উৎপাদন বেড়েছে শূন্য দশমিক ৭০ মেট্রিক টন।
বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) সূত্রে জানা গেছে, বরেন্দ্র এলাকায় বোরো মৌসুমে ১ কেজি চাল উৎপাদনে ২ থেকে ৩ হাজার লিটার পানির প্রয়োজন পড়ে। ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করেই বোরো ধান করা হয়। ‘বরেন্দ্র অঞ্চলে পানি শাসন ব্যবস্থা ও টেকসই উন্নয়ন’ বিষয় নিয়ে গবেষণা করেছেন নাটোরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক(সার্বিক) রাজ্জাকুল ইসলাম। তাঁর গবেষণায় উঠে এসেছে, বরেন্দ্র অঞ্চলে পানির স্তর প্রতিবছর প্রায় দেড় ফুট করে নিচে নেমে যাচ্ছে। ২০০৪ সালের পর থেকে নেমে যাওয়া পানির স্তর আর আগের জায়গায় উঠে আসছে না।
বিএমডিএর নির্বাহী পরিচালক আবদুর রশিদ প্রথম আলোকে বলেন, প্রায় আট বছর আগেই বোরো থেকে সরে আসার জন্য ‘ক্রপস ডাইভারসিফিকেশন’ বা শস্য বহুমুখীকরণ নিয়ে তাঁরা কাজ করছেন। ফলে বরেন্দ্র অঞ্চলে এখন বোরোর আবেদন কমছে। চাষিরা পানিসাশ্রয়ী ফসলের দিকে ঝুঁকছেন।
২০১৭-১৮ অর্থবছরে রাজশাহীতে টমেটোর মোট উৎপাদন হয়েছে ৭ হাজার ৬২৪ মেট্রিক টন। বেগুন হয়েছে ৭১ হাজার ৭০৫ মেট্রিক টন, ফুলকপি হয়েছে ১৭ হাজার ৪০৪ মেট্রিক টন, বাঁধাকপি হয়েছে ১৬ হাজার ৮০৬ মেট্রিক টন। রাজশাহীতে বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা না হলেও ব্যাপকভাবে শজনে চাষ হয়। এই মৌসুমে শজনে হয়েছে ২ হাজার ৬১৮ মেট্রিক টন।
রাজশাহী পবা উপজেলার পদ্মা নদীর দক্ষিণ পাড়ে চরখিদিরপুর গ্রাম। ছোট্ট এই গ্রামজুড়ে চাষিরা এখন শুধুই সবজি চাষ করে থাকেন। সবজির মধ্যে বেগুনই বেশি। কয়েক দিন আগে ওই গ্রামে গিয়ে মাঠজুড়ে শুধু বেগুনখেত দেখা গেল। বাড়ির আনাচে–কানাচেও বেগুনের গাছ। গ্রামের মিন্টু শেখ এবার চার বিঘা জমিতে বেগুন চাষ করেছেন। তিনি বলেন, বেগুন চাষ এখন লাভজনক। প্রথম দুই সপ্তাহেই উৎপাদন খরচ উঠে আসে। তবে এবার দাম কম। ৬০ থেকে ৬৫ কেজি ওজনের এক ডালি বেগুন আগে খেতেই ৮০০ টাকায় বিক্রি করেছেন, এখন ৩০০ টাকা।