সবুজের আড়ালে কষ্টের গল্প
সিলেট শহরের ঠিক পাশেই হিলুয়াছড়া চা-বাগানের অবস্থান। সেখানকারই একজন চা-শ্রমিক আকাশ মণি সবর (৩৫)। তাঁর জীবনের গল্পও বাগানের অন্যান্য শ্রমিকের মতোই সাদামাটা ও কষ্টের ছিল। তবে হঠাৎ স্বামী মারা যাওয়ার পর দুই সন্তান নিয়ে তাঁর কষ্টের জীবন আরও দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। অভাবের সংসারে দেখা দেয় আরও অভাব। এখনো নিরন্তর সংগ্রাম করেই চলছেন তিনি।
২০০৯ সালে আকাশ মণির স্বামী রাজীব সবর (৩৭) হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। স্বামীর মৃত্যুতে দুই বছরের ছেলে সজীব সবর ও কোলের মেয়ে তুলসী সবরকে নিয়ে ঘোর বিপদে পড়েন তিনি। শুরু হয় তাঁর নতুন সংগ্রাম। দিনভর বাগানে হাড়ভাঙা পরিশ্রম শেষে রাতে দুই সন্তানকে বুকে আগলে চোখের পানি ফেলতেন। সন্তানেরা একটু বড় হলে তাদের বিদ্যালয়ে পাঠান। এখন বড় ছেলে দশম শ্রেণিতে এবং ছোট মেয়ে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ছে।
‘চা দিবসের সংকল্প সমৃদ্ধ চা–শিল্প’ স্লোগানে আজ শনিবার ৪ জুন জাতীয় চা দিবস পালিত হচ্ছে।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, বাগানে উঁচু-নিচু টিলার পুরোটা জুড়েই সারি সারি চা–গাছ। যত দূর চোখ যায় শুধু সবুজ আর সবুজ। যেন একটির সঙ্গে আরেকটি গাছ শরীর লেপ্টে দাঁড়িয়ে আছে। এসব টিলার ঘন সবুজ বুকে দাঁড়িয়ে কয়েকজন নারী চা-শ্রমিক আপনমনে চা-পাতা তুলছেন। তাঁদের মাথার ওপর তপ্ত রোদ। সে রোদ মাথায় নিয়ে অন্য শ্রমিকদের পাশাপাশি আকাশ মণি কাজ করছেন। তাঁর দৃষ্টি কেবল চা-গাছেই বন্দী। আপনমনে তিনি দুই হাতে তুলে চলেছেন চা-গাছের দুটি কুঁড়ি একটি পাতা।
বাগানে কর্মরত কয়েকজন শ্রমিক বলেন, প্রতিদিন ২০ কেজি চা-পাতা উত্তোলন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ফলে সাতসকাল থেকে বিকেল অবধি তাঁদের কাজ করতে হয়। পাতা তোলা শেষ হলে শ্রমিকেরা উত্তোলিত পাতা ওজন করে জমা দেওয়ার জন্য পাতার গাঁটরি পিঠে করে গুদামে নিয়ে যান। ওজন করিয়ে সেসব পাতা বাগান কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিয়ে তবেই ঘরে ফেরেন। পরে সেসব পাতা প্রক্রিয়াজাত করে পানীয়ের জন্য উপযোগী করা হয়।
আকাশ মণি জানান, পরিবারে তিনিই একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। প্রতি সপ্তাহে তাঁর আয় ৮১০ টাকা। তা দিয়েই সন্তানদের লেখাপড়াসহ সংসারের যাবতীয় খরচ মেটে। রেশনের চাল আর চা-বাগানের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত ছড়া (প্রাকৃতিক খাল) থেকে ধরা মাছ বা আলু-ডাল আর রাস্তার পাশে বেড়ে উঠা কচু-লতা দিয়েই প্রতিদিনকার রান্নাবান্না সারেন। টিনশেডের ঘরে বিদ্যুৎ থাকলেও টাকার অভাবে ফ্যান কিনতে পারছেন না। ফলে এই গরমে হাতপাখাই একমাত্র ভরসা।
প্রতিদিনের রুটিন সম্পর্কে আকাশ মণি জানান, ভোরে রান্নাবান্না শেষে সন্তানদের খাইয়ে নিজে খাবার খান। এরপর দুপুরের খাবার সঙ্গে নিয়ে সকাল সাতটার মধ্যে বাগানের ভেতরে চলে যান চা-পাতা তুলতে। কাজ শেষে পাতার ওজন মেপে গুদামে জমা দিয়ে ঘরে ফিরতে বেলা চারটা বেজে যায়। কখনো আবার ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যাও হয়।
তবে হাজারো কষ্টে থেকেও আকাশ মণির কোনো খেদ নেই। তাঁর জীবনে লেপ্টে থাকা কষ্টের গল্পগুলো সন্তানেরা বদলে দেবে, কেবল এটাই স্বপ্ন দেখেন তিনি। আকাশ মণি জানান, সন্তানদের বাবার কোনো স্মৃতি মনে পড়ে না। কারণ, যখন তিনি (রাজীব) মারা যান, তখন সন্তানদের বয়স খুবই কম ছিল। তবে কখনোই সন্তানদের বাবার অভাব বুঝতে দেননি। ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে শত কষ্ট সত্ত্বেও সন্তানদের পড়ালেখা চালিয়ে নিচ্ছেন। সন্তানেরা পড়াশোনা শেষে চাকরিবাকরি করে অভাবের সংসার সুখ-আহ্লাদে ভরিয়ে দেবে, এটাই তাঁর এখন একমাত্র স্বপ্ন।