সিকি শতাব্দী ধরে ঢাকা–বাগেরহাট পথে চলাচল করা এক যাত্রীর গল্প
‘আজ আমি আপনাদের জন্য নিয়ে আসছি মিষ্টি দধি। আমার নানি বানাইছে।’ এই বলে বছর ২২–২৩–এর হ্যাংলা–পাতলা ছেলেটি দই বিক্রি করত ফেরিতে ঘুরে ঘুরে, বাসে উঠে। অন্তত সাত–আট বছর ছেলেটিকে দই বেচতে দেখেছি, একইভাবে, একই বেশভূষায়। ছেলেটির গলার স্বর ছিল ভাঙা, আর ‘আমার নানি বানাইছে’ কথাটি বলে ছেলেটি হেসে দিত। ওর হাসি দেখে আমারও হাসি পেয়ে যেত। ভাবতাম, এত পচা স্বাদের দই, এতে আবার ‘নানি বানাইছে’ কথাটা জুড়ে দেওয়ার মর্মার্থ কী!
ছেলেটিকে এখনো ভুলতে পারি না। ভুলতে পারি না শার্ট গুঁজে পরা আবদুল মোতালেবকে, যিনি ফেরি ও লঞ্চে মজমা বসাতেন, বানাতেন একপ্রকার আঠালো শরবত, নানা পদের গাছগাছড়া দিয়ে। যে শরবত তাঁর ভাষায়, ‘শারীরিক দুর্বলতা, ঘুম না হওয়া, কষাসহ সর্বরোগের মহৌষধ’। এক গ্লাস শরবত বানানোর পর দুজন যাত্রীকে তিনি খাওয়াতেন। বলতেন, পদ্মার এপারে, ওপারে অনেকেই শরবত বিক্রি করেন, কিন্তু তাঁর ওস্তাদের রয়েছে ৫০ বছরের অভিজ্ঞতা, যাঁর বাড়ি গোসাইরহাট, কে সেরা, যাত্রীরাই যেন বিবেচনা করেন। এত কিছু বলার পরও গুঁড়ো প্যাকেট বেচতে বহু মেহনত করতে দেখেছি তাঁকে।
এ রকম হরেক ব্যক্তির চেহারা, বাদাম বিক্রেতা, শসা বিক্রেতা, সেদ্ধ ডিম বিক্রেতা, পাকা পেঁপে, সফেদা বিক্রেতা, তাঁদের কথাবার্তা, আজ মনে পড়ছে। মনে পড়ছে আমিসহ এ পথের সব যাত্রীর কষ্টের, দুর্ভোগের, ত্যাগ স্বীকারের নানা টুকরো দৃশ্য, যে দৃশ্যগুলো আমি দেখেছি গত ২৫ বছরে। পদ্মা সেতু উদ্বোধনের এই আনন্দক্ষণে আজ সেসব কথা বলতে এলাম।
২.
প্রথমবারের মতো রাজধানী ঢাকায় এসেছিলাম ১৯৯৭ সালের মাঝামাঝি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে, দুরু দুরু বুকে। সুন্দরবন পরিবহনে ১০০ টাকা ভাড়ায় ১০ শতাংশ ডিসকাউন্ট পেয়েছিলাম। সেবার বাগেরহাটের ফকিরহাট থেকে ঢাকা আসতে পাঁচটি ফেরি পার হতে হয়েছিল। আর সৃষ্টিকর্তা চাইলে আসন্ন কোরবানি ঈদে বাড়ি যাব, একটি ফেরিও পার হতে হবে না। অবশ্য এর মধ্যে কেটে গেছে সিকি শতাব্দী।
পদ্মা সেতু যে দক্ষিণবঙ্গের মানুষের জন্য কতটা আকাঙ্ক্ষিত ছিল, তা এই পথে যাঁরা যাওয়া–আসা করেন, তাঁরা ছাড়া অন্য কারও পক্ষে বোঝা সহজ নয়। তাঁদের আবেগ অন্য কাউকে ছুঁতে পারবে না!
কোনটা রেখে কোনটা বলব! ফেরি পারাপারের কারণে এই রুটে কোনো ভালো, প্রতিষ্ঠিত কোম্পানির বাস ছিল না বললেই চলে। বেশির ভাগ বাসমালিকই স্থানীয়, অর্থাৎ খুলনা, বাগেরহাট বা পিরোজপুরের। চিংড়ি, সাদা মাছ, পানের আঁটি সব বাসের মধ্যে ও ছাদে গাদিয়ে তোলা হয়। পথে দেরি হলে বা নির্ধারিত সময়ে ফেরি পাওয়া না গেলে মাছের ঝুড়ি থেকে পানি গলে পুরো বাসে ছড়িয়ে পড়ত। যাত্রীদের তখন রুমালে নাক চেপে বসে থাকাই দস্তুর। যাত্রীরা বিব্রত হলেও বাসের চালক ও তাঁর সহকারীদের কোনো ভ্রুক্ষেপ হতো না। কারণ, তাঁরাই–বা কী করবেন! এটাই তো এ পথের রীতি।
লম্বা পথ হলেও দাঁড়িয়ে যাত্রী নেওয়া এই পথের খুবই সাধারণ বৈশিষ্ট্য। মনে আছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া অবস্থায় আমি একবার পুরো পথ, মানে ফকিরহাট থেকে সায়েদাবাদ, ২৪৩ কিলোমিটার দাঁড়িয়ে এসেছিলাম। আমাকে বলা হয়েছিল, গোপালগঞ্জ পুলিশ লাইনস গিয়ে সিট দেওয়া হবে। সেখানে পৌঁছানোর পর দুজন যাত্রী নেমে যাবেন। কিন্তু বাস কর্তৃপক্ষ তাদের কথা রাখেনি। গোপালগঞ্জ থেকে দুজন যাত্রী উঠলেন এবং তাঁরা ফাঁকা সিট দুটিতে বসে পড়লেন। কারণ, তাঁদের আগেই টিকিট কাটা ছিল। আমি সায়েদাবাদ নেমে মালিক সমিতির অফিসে মৌখিক অভিযোগ দিলাম। কিন্তু যিনি শুনলেন, তিনি নির্বিকার! মানে এটা তো হতে পারে, অভিযোগ দেওয়ার কী আছে! আমিও বুঝলাম, যা হয়েছে ভুলে গিয়ে এখন নিজ ডেরায় ফিরে যাওয়াই উত্তম।
ঈদের সময় বাসের মধ্যে চলাচলের পথে টুল বসিয়ে বসিয়ে ব্যবসা করা খুবই সাধারণ ব্যাপার এ পথে। এই টুলের যাত্রীদের কারণে পা গুঁজে বসে থাকতে হয় সিটের যাত্রীদের। আমি নিজেও একবার ঈদের আগে টুলের যাত্রী হয়ে বাড়ি গিয়েছি।
চলতে চলতে বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কত যে ভুগতে হয়েছে, তার হিসাব নেই। বিশেষ করে ঈদের আগে এটা যেন অবধারিত ছিল। অন্য সময়েও হতো। একবার গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরের এমন একটা জায়গায় ফরফর করে টায়ার ফেটে বাস থেমে গেল, খাদে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকিও ছিল। কিন্তু সমস্যা হলো, জায়গাটা জনমানবহীন। গাড়ি সারানোর কোনো মিস্ত্রির দোকান আশপাশে কোথাও নেই। তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছিল সেদিন। এক প্যাকেট বিস্কুট আর এক বোতল পানির জন্য সেদিন দেখেছি বাসযাত্রী নারীদের, একটু বয়স্ক মানুষদের সে কী প্রাণপাত!
ঢাকা থেকে সকালে রওনা দিয়েও সন্ধ্যার আগে ফকিরহাট পৌঁছাতে পারিনি। রাস্তায় পানি খেয়ে ইফতার সেরেছি একাধিকবার। একবার ঢাকা থেকে সকালে রওনা হয়ে বাড়ি পৌঁছালাম রাত তিনটায়!
এই পথে যাত্রীদের, বাসচালকদের সাধারণ টেনশন হলো ফেরি পাওয়া যাবে কি না। ফেরি পেলেই কিছুটা স্বস্তি। লাগুক দুই, আড়াই ঘণ্টা। কিন্তু ফেরি না পেলে ঘাটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা, এ যেন জীবন থেমে যাওয়া। আবার এমনও হয়েছে বাস ফেরিতে উঠে বসে আছে, কিন্তু ছাড়ছে না। কারণ, কোনো ভিআইপি আসবেন হয়তো! মন্ত্রী, এমপি কিংবা সরকারি কর্মকর্তাই সাধারণত ভিআইপি হয়!
৩.
প্রায় এক–দেড় দশক ধরে এই পথে দিনের বেলায় বেশির ভাগ পরিবহন লঞ্চ পারাপার করে। অর্থাৎ নিয়মটা এ রকম, ঢাকা থেকে যাত্রী নিয়ে বাস যাবে মাওয়া ফেরিঘাটে। এরপর লঞ্চে পদ্মা পার হয়ে ওপারে যাবেন যাত্রীরা। ওপারে ওই কোম্পানির আরেকটি বাস অপেক্ষায় থাকবে। সেই বাসে উঠবেন যাত্রীরা। এরপর গন্তব্যে যাবে। একই নিয়ম দক্ষিণাঞ্চল থেকে ঢাকায় আসার ক্ষেত্রেও।
লঞ্চে যাত্রী ওঠানোর ব্যবস্থাপনাটুকু বাস কোম্পানির তত্ত্বাবধানেই হয়ে থাকে। কিন্তু সমস্যা হলো, লঞ্চ কর্তৃপক্ষ কোনো নিয়মই মানতে চায় না। তারা লঞ্চের ওপরে, নিচে ইচ্ছেমতো যাত্রী তুলতে থাকে। বর্ষাকালে এমন অবস্থা হয় যে পানি বুঝি লঞ্চে ঢুকে পড়বে। আর পদ্মার যে বড় বড় ঢেউ, তীব্র তার স্রোত। স্ত্রী ও দুই পুত্র নিয়ে বাড়ি যাওয়ার সময় মনে হয়েছে যেন নিজের প্রাণটাকে হাতের মুঠোয় নিয়ে পদ্মা পার হচ্ছি।
আবার ওপারে কাঁঠালবাড়ি ঘাটে, আগে যার নাম ছিল কাওড়াকান্দি, গিয়ে ভিন্ন অভিজ্ঞতা। বিশেষ করে ঈদের সময় বাস দাঁড়িয়ে থাকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরত্বে। একবার টিপটিপ বৃষ্টির মধ্যে ব্যাগবোঁচকা নিয়ে স্ত্রী, দুই সন্তানসহ হেঁটে বাসের কাছে পৌঁছানোর স্মৃতি এই মুহূর্তে চোখে ভাসছে।
আমি একা নই, এ পথের বহু মানুষ আছেন, যাঁরা কেবল পথের কষ্টের কথা ভেবে ঈদে গ্রামের বাড়িতে যাওয়া থেকে বিরত থেকেছেন। এবার তাঁরা নিয়মিত যেতে পারবেন। মাদারীপুর, শরীয়তপুরের অনেকে বাড়ি থেকেই ঢাকায় অফিস করতে পারবেন।
তবে পুরোটাই যে কষ্টের স্মৃতি, তা বলা অন্যায় হবে। যেমন পৌষের সকালে খুব আনন্দ নিয়ে ফেরি পার হয়েছি। শীতকালে লঞ্চ ভ্রমণটাও উপভোগ্য ছিল, বিশেষ করে লঞ্চের বারান্দায় দাঁড়িয়ে পদ্মার বাতাসে অবগাহনে রয়েছে অনির্বচনীয় সুখ। আর লঞ্চে ১০০ টাকায় ইলিশভাজা কিংবা ইলিশের ডিম আর মাখা মাখা ডাল দিয়ে ভাত খাওয়া মিস করব!
পদ্মা সেতু উদ্বোধন হয়েছে। আজ আমাদের গর্বের দিন, প্রাপ্তির দিন। আজ আমরা পুরোনো স্মৃতিগুলো ভুলে থাকতে চাই। ভাসতে চাই স্বপ্নপূরণের আনন্দে।
শেষ করি মিষ্টি দইওয়ালা ছেলেটিকে দিয়ে। বছর আট–দশ আগের কথা। ছেলেটি দইয়ের ট্রে হাতে বাসে উঠেছে। সেদিন আর কিছু বলছে না। কৌতূহলবশত জিজ্ঞেস করি, এই দই কে বানিয়েছে! বলল, ‘আমার মা বানাইছে।’ তোমার নানি বানায়নি কেন।
উত্তর না দিয়ে ছেলেটি বাস থেকে নেমে গেল। এরপরে ওকে আর দেখেছি বলে মনে করতে পারি না।
• কাজী আলিম-উজ-জামান, প্রথম আলোর উপবার্তা সম্পাদক
ই-মেইল: [email protected]