সু্ইয়ের গুঁতায় অভাব দূর
রোজ ঘুম থেকে উঠেই এখন আর খাবারের চিন্তায় অস্থির হতে হয় না রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার পাইকারপাড়া গ্রামের মজিতন খাতুন (৩০) ও হিমারা বেগমকে (৩৩)। একটু স্বাচ্ছন্দ্যে বেঁচে থাকার উপায়টুকু পেয়ে গেছেন তাঁরা। তাঁদের বাড়িতে এখন টিনের ঘর আছে, আছে নলকূপ ও স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা। ছেলেমেয়েরা স্কুলে যাচ্ছে।
মজিতন খাতুন দুটি গাভি, পাঁচটি ছাগল ও ৪০ শতাংশ জমি কিনেছেন। হিমারাও কিনেছেন একটি গাভি, সাতটি ছাগল ও ২৪ শতাংশ জমি। তাঁদের মতো গ্রামটির দেড় শতাধিক নারী শাড়িতে নকশা তোলার কাজ করে সংসারে উন্নতি ঘটিয়েছেন। ঈদুল ফিতর সামনে হওয়ায় শাড়ির চাহিদা বেড়েছে। শাড়ির জোগান দিতে দিন–রাত নারীরা নকশার কাজ করছেন।
উপজেলা সদর থেকে ৯ কিলোমিটার দূরে পাইকারপাড়া গ্রাম। গ্রামটির বেশির ভাগ বাড়িতে চকচক করছে টিনের চালা। খড়ের কুঁড়েঘর নেই বললেই চলে। গ্রামের কয়েকজন জানান, ৯ বছর আগে পাইকারপাড়া গ্রামের রোমানা বেগমের হাত ধরে পাঁচজন নারী শাড়িতে কারচুপি ও নকশার কাজ শুরু করেন। এখন শুধু ওই গ্রামেই দেড় শতাধিক নারী শাড়িতে কারচুপি ও নকশার কাজ করছেন। তাঁদের সাফল্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে পাশের কাংলাচড়া, ফরিদাবাদ, কুর্শা, জিগারতলা, ময়দানপাড়া, মুন্সিপাড়া গ্রামের নারীরা শাড়িতে কারচুপি ও নকশার কাজ করে নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছেন।
বৃহস্পতিবার সকালে পাইকারপাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা গেল সুন্দর দৃশ্য। গ্রামটির নারীরা শাড়িতে নকশা তোলার কাজ করছেন। একটি সাধারণ জর্জেট শাড়িতে নকশার কাজের পর কতটা অসাধারণ হয়ে ওঠে, তা না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। নারীরা শাড়িতে সুই দিয়ে চুমকি, জরি, পুঁতি বসানোর কাজে ব্যস্ত।
ওই গ্রামের আছমা খাতুন বলেন, আট বছর আগে তাঁর বিয়ে হয় নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার বাহাগিলি গ্রামের মাইদুল ইসলামের সঙ্গে। দিনমজুর স্বামীকে নিয়ে অভাবের তাড়নায় বাবার বাড়িতে আশ্রয় নেন। পাঁচ বছর আগে শুরু করেন শাড়িতে নকশা তোলার কাজ। এখন নিজের বাড়ি ও আবাদি জমি আছে। শাড়িতে নকশার কাজ করে মাসে ছয় হাজার টাকা আয় করছেন।
ওই গ্রামের সাদিয়া বেগমের ভিটামাটি ছাড়া কিছুই ছিল না। এখন টিনের বাড়ি ও ২৮ শতাংশ নিজের জমি আছে। গাছগাছালিঘেরা বাড়িতে হাঁস-মুরগি, ছাগল, গাভি পালন ও শাড়ির নকশার কাজ করে মাসে আট হাজার টাকা আয় করছেন। সন্তানদের বিদ্যালয়ে দিয়েছেন। তাঁদের সংসারে সাদিয়ার সিদ্ধান্তে এখন সবাই মত দেয়। একই ভাবে অন্য নারীরাও তাঁদের অর্থনৈতিক মুক্তির বিবরণ তুলে ধরেন।
শাড়িতে নকশা তোলার কারিগর সিদ্দিকা বেগম বলেন, উজ্জ্বল রঙের ওপর নকশাগুলো ফোটে ভালো। একটি জর্জেট বা টিস্যু শাড়িকে নকশার কাজে সাজাতে একজন কারিগরের পাঁচ-ছয় দিন সময় লাগে। বিভিন্ন জেলা-উপজেলার পাইকারেরা অর্ডার দিয়ে শাড়িতে নকশার কাজ করে নেন। তাঁরাই এখন শাড়িতে কাজ করতে প্রয়োজনীয় সুই, সুতা, চুমকি, জরি ও পাথর দেন। প্রতিটি শাড়ির মজুরি বাবদ কারিগরদের দেওয়া হয় ৮০০-৯০০ টাকা। একজন নারী কারিগর মাসে ৬-৭টি শাড়িতে নকশার কাজ করতে পারেন। গড়ে মাসে তাঁদের ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা আয় হয়।
সয়ার ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন আজম বলেন, ওই গ্রামের নারীদের স্বাবলম্বী হওয়ার প্রচেষ্টার তুলনা হয় না। শাড়িতে নকশার কাজ করে বাড়তি আয় করায় শ্বশুরবাড়ির সবার ভালোবাসা পাচ্ছেন।
উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা ফারহানা আফরোজা বলেন, ‘ওই গ্রামের কিছু নারীকে আমাদের অধিদপ্তরের অধীনে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। প্রশিক্ষণ নিয়ে শাড়িতে কারচুপি ও নকশার কাজ করে অভাব দূর করেছেন। এঁদের দেখে অন্য গ্রামের নারীরাও এ কাজ করছেন।’