আবদুল মালেক মিয়ার বয়স ৬৫। এ বয়সে অবসর কাটানোর কথা। কিন্তু জীবিকার তাগিদে তিনি এখন ভাসমান শ্রমিক। দিন কাটে কমলাপুর, বিমানবন্দর কিংবা গাজীপুরের জয়দেবপুর রেল জংশনে, কখনো আবার রাস্তায়। পরিবারের সঙ্গে অবসর কাটানো দূরের কথা, তিন বেলার খাবারের ব্যবস্থা করতেই বিভিন্ন স্থানে তাঁর ছুটে চলা।
গাজীপুর নগরের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিন আবদুল মালেকের মতো এমন অনেক ভাসমান শ্রমিক চোখে পড়ে, যাঁদের বয়স ৬০ থেকে ৭০ বছরের মধ্যে। পরিবারের খরচ, সন্তানের লেখাপড়া, চিকিৎসা বা বাঁচার তাগিদে এখনো কাজ করতে হচ্ছে তাঁদের। থাকার কোনো নির্দিষ্ট জায়গা নেই। শীত, গ্রীষ্ম বা বর্ষায় কাজের জন্য ছুটে বেড়ান স্টেশন থেকে স্টেশনে।
প্রকৃতিতে মাঘ পেরিয়ে এখন ফাল্গুন মাস। তবে হঠাৎ শীতের তীব্রতা কিছু বেড়েছে। গত শনিবার রাত ১১টার দিকে নগরের জয়দেবপুর রেল জংশন, পৌর মার্কেট ও শিববাড়ী মোড়ে গেলে দেখা হয় আবদুল মালেকের মতো ভাসমান শ্রমিকদের সঙ্গে। তাঁদের কেউ রেল জংশনের বারান্দায়, সামনের খালি জায়গায়, কেউবা শুয়ে ছিলেন ফুটপাতে।
জয়দেবপুর রেল জংশনের সামনেই পাওয়া গেল আবদুল মালেককে। তিনি সড়কের পাশে শুয়ে ছিলেন ব্যানার বিছিয়ে। গায়ে একটি ছেঁড়া কাঁথা। মশারি নেই। আলাপের সময় বললেন, তাঁর বাড়ি গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলায়। পরিবারে তিন মেয়ে ও এক ছেলে। বড় মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। বাকি তিনজন লেখাপড়া করছে গ্রামের বিভিন্ন বিদ্যালয়ে। সন্তানদের লেখাপড়া ও সংসারের খরচ জোগাতেই গাজীপুরে এসেছেন। স্টেশনে স্টেশনে কুলি, দিনমজুরের কাজ করেন।
আবদুল মালেকের ভাষ্য, কাজ করে যা আয় করেন, তা বাড়িতে পাঠালে নিজের তিন বেলা খাবারের টাকা থাকে না। তাই কষ্ট হলেও ফুটপাতে থাকেন। ব্যস্ত রাস্তার ধারে রাতের বেশির ভাগ সময় কাটে জেগে থেকে।
একই অবস্থা আক্কাস আলীর (৬০)। তিনি একটা পাতলা কম্বল বিছিয়ে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন পৌর মার্কেটের সামনে। পরিবারের খরচ জোগাতে ৩০ বছর ধরে এভাবেই বাড়ির বাইরে। আক্কাস বলেন, ‘পরিবারের সাথে সময় কাটানোর সুযোগ আমাগোর নাই। কাজ বাদ দিলে পুরো পরিবার বইসা যাইব।’
আবদুল মালেক, আক্কাস আলীসহ আরও কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, দিনে তাঁদের আয় ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। দিন এনে দিন খেতে হয়। তাই সব টাকা হাতে থাকে না। আছে রোগ, শোক, নিরাপত্তার ঝুঁকি। কিন্তু তাঁদের এ ছুটে চলা কিছুটা হলেও স্থির জীবন দেয় স্বজনদের।