হাসপাতালে রোগীদের ঈদ উদ্যাপনে একজন নার্সের উদ্যোগ
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রতিদিন দুই হাজারের বেশি রোগী ভর্তি থাকেন। প্রতিটি ওয়ার্ডেই প্রচুর রোগীর চাপ থাকে। বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের ছয় জেলা ছাড়াও সুনামগঞ্জ, কুড়িগ্রাম ও গাজীপুর জেলার বেশ কিছু এলাকা থেকেও এই হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নিতে আসেন রোগীরা। এত রোগীকে চিকিৎসা দিতে হিমশিম অবস্থা চিকিৎসক-নার্সদের। তারপরও তাঁদের নিরলস প্রচেষ্টায় অধিকাংশ রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যান।
ঈদেও চিকিৎসাসেবায় কোনো বিঘ্ন ঘটে না। মেডিকেল কর্তৃপক্ষের আন্তরিক প্রচেষ্টায় প্রতিবছর ঈদের দিনেও চিকিৎসাসেবা পেয়ে থাকেন রোগীরা। তবে ঈদের সময় অধিকাংশ রোগীই ছুটি নিয়ে বাড়ি চলে যেতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। তুলনামূলক যেসব রোগীর অবস্থা গুরুতর, তাঁরাই শুধু হাসপাতালে ভর্তি থাকেন। ঈদের দিন তাঁদের হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে-বসে সময় কাটানো ছাড়া কিছু করার থাকে না। রোগীদের মন পড়ে থাকে তাঁর বাড়িতে, যেখানে স্বজন-প্রতিবেশীদের নিয়ে ঈদ উদ্যাপন করেছেন জীবনভর।
তবে এবারের ঈদে হৃদ্রোগ বিভাগের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডে কিছুটা ব্যতিক্রমীভাবে ঈদ উদ্যাপন করবেন এখানে ভর্তি থাকা রোগীরা। এই ওয়ার্ডে প্রায় ৫০ জন রোগী ভর্তি আছেন যাঁরা প্রত্যেকেই ঈদের দিন নতুন পাঞ্জাবি, টুপি পরবেন। শরীরে আঁতর, চোখে সুরমা মাখবেন। নতুন জায়নামাজে নামাজ পড়বেন। এ ছাড়া তাঁরা ঈদের দিন ভালো মানের খাবার খাবেন। তবে এর কোনোটাই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কিংবা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ব্যবস্থা করেনি। এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের সিনিয়র স্টাফ নার্স দেলোয়ারা বেগমের।
নার্স দেলোয়ারা যেই ট্রলিতে করে প্রতিদিন রোগীদের ওষুধপত্র, চিকিৎসা সরঞ্জামাদি নিয়ে যান, সেই ট্রলিতে করেই রোগীদের কাছে গিয়ে গিয়ে গতকাল বুধবার ঈদ উপহার পৌঁছে দিয়েছেন। এভাবে তিনি প্রায় ৫০ জন রোগীকে ঈদ উপহার দিয়েছেন। এসবের পাশাপাশি মাস্ক ও হ্যান্ড স্যানিটাইজারও উপহার দিয়েছেন সবাইকে।
করোনাকালে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে রোগীরা ঈদ উপহার পেয়ে বেশ উচ্ছ্বসিত। আবদুল আজিজ, আঁখি আক্তার, আবদুল মতিন, গোলাম মোস্তফা, আবুল গফুর, কাশেম মিয়া—তাঁরা প্রত্যেকেই তাঁদের খুশির কথা জানান প্রথম আলোকে। তাঁরা প্রত্যেকেই হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি। উপহার পাওয়ার অনুভূতি বলতে গিয়ে সবাই আনন্দে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। কারও কারও চোখ ছলছল করছিল।
সিনিয়র স্টাফ নার্স দেলোয়ারা বেগম বলেন, হৃদ্রোগ বিভাগের সিসিইউতে (করোনারি কেয়ার ইউনিটে) যেসব রোগী ভর্তি থাকেন, তাঁদের অধিকাংশই প্রবীণ। তাঁদের দেখে তিনি তাঁর পল্লী চিকিৎসক বাবাকে খোঁজেন। বাবাকে কৈশোর বয়সেই হারিয়েছেন তিনি। সর্বশেষ ২০১৯ সালে মাকেও হারিয়েছেন। এরপর থেকে তিনি মনস্থির করেন, প্রতি ঈদে রোগীদের উপহার প্রদান করবেন।
গত বছর স্বল্প পরিসরে রোগীদের উপহার প্রদান করেছিলেন দেলোয়ারা। সেবার রোগীদের সময় জানার সুবিধার্থে ওয়ার্ডে দেয়ালঘড়ি টানিয়েছিলেন নিজ উদ্যোগে। এবারের ঈদে তিনি তাঁর সহকর্মীদের তাঁর সঙ্গে যোগ দিতে আহ্বান জানিয়েছিলেন। তবে কেউ তাঁর আহ্বানে সাড়া না দিলেও তিনি দমে যাননি। নিজের ঈদ বোনাস আর জমানো টাকা দিয়ে রোগীদের জন্য কেনাকাটা করে ঈদ উপহার দিয়েছেন। এ কাজে তাঁর স্বামীও তাঁকে সহযোগিতা করেছেন। তাঁর এক ছেলে ও এক মেয়ে, তারাও অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে তাদের মাকে।
মহানগরীর কাচিঝুলি মসজিদ রোড এলাকার বাসিন্দা দেলোয়ারার চাকরির বয়স প্রায় ২১ বছর। এর মধ্যে প্রায় ১৯ বছরই কাটিয়েছেন ময়মনসিংহ মেডিকেলের ২৪ নম্বর সিসিইউ ওয়ার্ডে। দীর্ঘ সময় এক ওয়ার্ডে কাজ করতে গিয়ে রোগীদের প্রতি তিনি গভীর মায়া অনুভব করেন। তাই স্ব-উদ্যোগে রোগীদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার চেষ্টা করছেন বলে জানান তিনি।
স্কুলে ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলের জীবনকাহিনি পড়ে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। বাবাও যেহেতু পল্লী চিকিৎসক ছিলেন, তাই ছোটবেলা থেকেই চিকিৎসাশাস্ত্রের প্রতি আগ্রহ ছিল দেলোয়ারার। পরবর্তী সময়ে তাই নার্সের পেশাকেই বেছে নিয়েছেন মানবসেবার কথা চিন্তা করে। নিত্যদিন রোগীদের আর্তনাদ কিংবা ছটফট করার দৃশ্য কোনো কিছুতেই এ পেশা ছাড়ার কথা কখনো মনে আনেননি। সব সময় রোগীর পাশে থেকে সেবা দিয়ে গেছেন। গরিব রোগীদের অর্থ সহায়তাসহ বিভিন্ন ধরনের সহায়তা করেন নিয়মিত। এবার ১২ মে আন্তর্জাতিক নার্সেস দিবসে রোগীদের পাশে ঈদ উপহার নিয়ে হাজির হতে পেরে নিজেকে বেশ ভাগ্যবান মনে করেন তিনি।
রোগীদের ঈদ উপহার দেওয়ার মুহূর্তের কথা বলতে গিয়ে দেলোয়ারা বলেন, যে মুহূর্তে রোগীদের সামনে ট্রলিতে করে ওষুধপত্রের বদলে ঈদ উপহার নিয়ে হাজির হয়েছেন, তাঁদের সবার চোখে আনন্দে পানি চলে এসেছিল। খুশিতে প্রবীণ রোগীদের অনেকেই শিশুর মতো আচরণ করছিলেন। কয়েকজন তাঁর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছেন। দেলোয়ারা বলেন, এ যেন আত্মার আনন্দ। টাকার মায়া ত্যাগ করে সবাইকে তিনি খুশি করতে পেরেছেন। এতে তিনি বেজায় খুশি। এ দৃশ্য দেখে তাঁর সহকর্মীরাও তাঁকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন এবং ভবিষ্যতে তাঁর পাশে থেকে সহায়তা করারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হৃদ্রোগ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান গণপতি আদিত্য বলেন, ‘পেশাগত দায়িত্ব পালন ছাড়াও স্ব-উদ্যোগে দেলোয়ারা সবাইকে ঈদ উপহার দিয়ে অনন্য নজির স্থাপন করেছেন। এতে করে তিনি তাঁর মহানুভবতার পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই।’