নেত্রকোনার ছেলে কামরুল হাসান বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে থাকার সময় প্রায় সময়ই বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটে গিয়ে বসে থাকতাম। ছাত্রছাত্রীদের চিত্রকর্ম দেখতাম। ভাবতাম, আমিও যদি এমন রংতুলি দিয়ে ক্যানভাসে আঁকতে পারতাম। কিন্তু ছবি আঁকার সামগ্রীর তো অনেক দাম। নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে বড় হওয়া আমার কাছে তখন তা এক রকম অপচয় বলেই মনে হতো।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে কামরুল হাসান বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দেন। ২০১৬ সালে রংপুর সরকারি কলেজে বদলি হওয়ায় পরিবার ছেড়ে থাকতে হয়। একাকিত্ব ভর করে। সময় কাটানোর জন্য রংতুলি আর ক্যানভাসের কথা মাথায় আসে। ঢাকা থেকে ছবি আঁকার বিভিন্ন সামগ্রী কিনে শুরু করেন ছবি আঁকা। সেই শুরু, এখন তা নিয়মিত চর্চায় পরিণত হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে বন্ধু–স্বজনেরা কামরুল হাসানের শিল্পকর্ম পছন্দ করছেন, উৎসাহ দিচ্ছেন। কামরুল হাসান বলেন, ‘আমি পেশাদার শিল্পী নই। বন্ধু–স্বজনদের ছবি উপহার দিই। আগে বন্ধু–স্বজনদের কোনো ছবি পছন্দ হলে এমনিতেই দিয়ে দিতাম। তবে মনে হলো, এতে ঠিক শিল্প ও শিল্পের মূল্যায়ন হচ্ছে না। তাই এখন ছবি নিলে তার সম্মানী রাখছি।’

এ পর্যন্ত প্রায় ৭০০টি ছবি এঁকেছেন দাবি করে কামরুল হাসান বলেন, ছবি বিক্রির টাকা দিয়ে আঁকার সামগ্রী কেনার খরচ অনেকটাই সামাল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। বন্ধুদের বাসা ও অফিসে প্রায় ১৫০টি ছবি আছে। বন্ধুরা দেশে বা বিদেশে অফিস বা বাসায় দেয়ালে ছবি টাঙিয়ে সেই ছবি ফেসবুকে পোস্ট করেন। আর ফেসবুকে কামরুল হাসানের পেজে একেকটি ছবি নিয়ে মানুষ যে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন, তা দেখে নতুন ছবি আঁকার অনুপ্রেরণা পান এই শিক্ষক ও শিল্পী। ভারতের বাংলা ভাষাভাষী মানুষও কামরুল হাসানের ছবি ফেসবুকে পোস্ট দেন বলে জানালেন কামরুল হাসান। তাঁর পেজে সেই নজিরও পাওয়া গেল।

কামরুল হাসানের স্ত্রী তাহমিনা খান নেত্রকোনায় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। এ দম্পতির দুই ছেলের একজন পড়ছে সপ্তম শ্রেণিতে, অন্যজন দ্বিতীয় শ্রেণিতে। কামরুল হাসান বলেন, ‘যেকোনো সৃষ্টিশীল কাজের পেছনে সবচেয়ে বড় ত্যাগ স্বীকার করে পরিবার। আমার এ শিল্পচর্চার পেছনে আমার স্ত্রী, দুই সন্তানের ভূমিকা অপরিসীম। আমি যে সময়টা শিল্পচর্চার পেছনে ব্যয় করি, সে সময়টুকুতে ওরা বঞ্চিত হয়। তারা আমাকে সুযোগ দিচ্ছে বলেই আমি আমার শিল্পচর্চা চালিয়ে যেতে পারছি।’

ছবি আঁকার প্রস্তুতি কীভাবে নেন, জানতে চাইলে বলেন, ‘আমি বিভিন্ন শিল্পীর আঁকা ছবি দেখি। তা দেখে শিখি। যে জিনিসটা আঁকতে চাই, তা নিয়ে যত দূর সম্ভব জানার চেষ্টা করি। তাই বলতে গেলে আমি আঁকি কম, অন্যদের আঁকা ছবি দেখি বেশি।’

২০১৬ সালে রংপুর সরকারি কলেজে বদলি হওয়ায় পরিবার ছেড়ে থাকতে হয়। একাকিত্ব ভর করে। সময় কাটানোর জন্য রংতুলি আর ক্যানভাসের কথা মাথায় আসে। ঢাকা থেকে ছবি আঁকার বিভিন্ন সামগ্রী কিনে শুরু করেন ছবি আঁকা। সেই শুরু, এখন তা নিয়মিত চর্চায় পরিণত হয়েছে।

শিক্ষকের পাশাপাশি শিল্পী পরিচিতিটার পরিসর বাড়ছে তাঁর। হাসতে হাসতে বলেন, ‘সেদিন কুরিয়ারের অফিসে গেলাম। একজন আমার নাম করে “ওই শিক্ষককে (আমাকে) আমি চিনি কি না” জানতে চাইলেন। তখন হেসে বললাম, “আমিই সেই শিক্ষক।” বন্ধুরা মাঝেমধ্যে বলেন, তাঁদের কাছেও অনেকে আমার কথা জানতে চান। আর ফেসবুকে একেকটি ছবিতে হাজার হাজার প্রতিক্রিয়ার পাশাপাশি চেনা–অচেনা মানুষের মন্তব্য তো আছেই।’

এই শিক্ষকের সাবেক এক সহকর্মী তামান্না সুলতানা। এখন ঢাকায় কর্মরত। তিনি এই শিল্পীর কাছ থেকে অনেকগুলো ছবি নিয়েছেন। তামান্না বলেন, ‘শেষবারের নেওয়া ছবির খরচ বাবদ টাকা দিতে গেলে স্যার (কামরুল) তখনকার সুনামগঞ্জে বন্যার্তদের সহায়তায় এ অর্থ পাঠিয়ে দিতে অনুরোধ করেন। স্যার অনেক সময়ই ছবি আঁকার অর্থ দুর্গত মানুষের কল্যাণে ব্যয় করেন।’

নেত্রকোনা সাহিত্য সমাজের সদস্য ও নেত্রকোনা সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কবি সরোজ মোস্তফা বলেন, কামরুল হাসানের আঁকা ছবির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো প্রকৃতি। তাঁর প্রতিটি ছবিতেই একধরনের সরলতা আছে। ছবিগুলো মাটির কথা বলে, জীবনের কথা বলে। জলের গান গায়। যে গল্পের কখনো শেষ নেই।

এই গল্প আমৃত্যু চালিয়ে যেতে চান কামরুল ইসলাম। ভবিষ্যতে কোনো এক দিন হয়তো নিজের চিত্রকর্মের প্রদর্শনী হবে, এমন স্বপ্ন দেখেন তিনি। শিশুদের শেখানোর জন্য একটি ইনস্টিটিউট গড়ে তুলবেন, যেখানে শিশুরা মনের আনন্দে বিনা মূল্যে ছবি আঁকবে। আত্মার শান্তির জন্যই জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত রংতুলির সঙ্গেই থাকতে চান কামরুল হাসান।