ইস্পাহানি পার্বণ নবান্ন উৎসব: ফুল, গান আর পিঠার স্বাদে মুখর কালীগঙ্গার তীর
কালিগঙ্গা নদীর পূর্ব পাড় শর্ষে ফুলের হলুদে ছেয়ে আছে। নদীর পশ্চিম পাশে মৌসুমি ফুলের সারোহ। মাঝা মাঝে আমগাছের সারি। তার ডালে ঝুলছে দোলনা। শীতের তীব্রতাও কয়েক দিন থেকে কমেছে। আর সকালের মিষ্টি রোদ পরিবেশ করে তুলেছে নাতিশীতোষ্ণ। উপভোগ্য এই পরিবেশেই শুরু হয়েছে ‘পার্বণ নবান্ন উৎসব’।
মানিকগঞ্জ পৌরসভার চর বেউথা এলাকাসংলগ্ন কালীগঙ্গা নদীর পাড়ে দ্য গার্ডেন টি হাব নামের আমবাগানে দেশের অন্যতম প্রধান ব্র্যান্ড পার্বণের উদ্যোগে এই উৎসবের আয়োজন করেছে প্রথম আলো ডটকম। এবার তৃতীয়বারের মতো অনুষ্ঠিত হচ্ছে এই পার্বণ নবান্ন উৎসব।
সকালে উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মানিকগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) ফারজানা প্রিয়াঙ্কা। তিনি বলেন, ‘আজ আনন্দমুখর পরিবেশে এই নবান্ন উৎসব অনুষ্ঠিত হচ্ছে। নবান্ন আমাদের দেশের ঐতিহ্যবাহী কৃষিভিত্তিক উৎসব। আবহমানকাল থেকে ধর্ম–জাতিনির্বিশেষে সব শ্রেণি–পেশার মানুষ এই উৎসবে অংগ্রগ্রহণ করেন। আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে এ ধরনের আয়োজন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।’
জনপ্রিয় অভিনয়শিল্পী ফজলুর রহমান বাবু বলেন, ‘শীতের সকালে নদীর পাড়ের প্রাকৃতিক পরিবেশে এমন আয়োজন অত্যন্ত আনন্দময়। আমাদের জীবন থেকে অনেক কিছুই ক্রমে ক্রমে হারিয়ে যাচ্ছে। আবার অনেক কিছু মুছে দেওয়ার চেষ্টাও চলছে। কিন্তু আমরা আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার ধারণ করে সবাই মিলে সুন্দরভাবে, আনন্দের সঙ্গে বেঁচে থাকতে চাই।’
মানিকগঞ্জ পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কমিশনার আবু হেনা মো. নাহিদ বলেন, মানিকগঞ্জে এবার তৃতীয়বারের মতো ইস্পাহানি পার্বণ নবান্ন উৎসব হচ্ছে, এটা খুবই আনন্দের। বিশেষ করে এবার উৎসব তাঁর নিজের নির্বাচনী এলাকা পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডে হওয়ার কারণে তিনি আয়োজকদের ধন্যবাদ জানান।
ইস্পাহানি গ্রুপের উপমহাব্যবস্থাপক এইচ এম ফজলে রাব্বি বলেন, ইস্পাহানি দেশের একটি জনপ্রিয় ও দীর্ঘকালের আস্থার প্রতিষ্ঠান। ইস্পাহানির অ্যাগ্রো প্রোডাক্ট পাবর্ণ চাল নিয়ে এবার গান–খেলা–পিঠাপুলির অঞ্চল মানিকগঞ্জে নবান্ন উৎসব আয়োজিত হচ্ছে। তিনি উৎসবে অংশগ্রহণের জন্য সবাইকে শুভেচ্ছা জানান।
প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আনিসুল হক বলেন, আজ সারা দিন এখানে গান, খেলাধুলা, পিঠাপুলিসহ অনেক রকম আয়োজন থাকবে। সবাই মিলে উৎসবখুর পরিবেশে একটি দিন কাটাব।
আনুষ্ঠানিকতার পর শুরু হয় গানের পালা। মানিকগঞ্জের লোকসংগীতশিল্পী আবুল বাসার আব্বাসী নিজের লেখা গান ‘ভাসাইলাম দেহতরি দয়াল তোমার নাম লইয়া/ কিনারায় ভিড়াইও তরি নিজে মাঝি হইয়া’ পরিবেশন করে গানের আসর শুরু করেন। সঙ্গে ছিলেন তাঁর দলের সহশিল্পীরা। এরপর তিনি গেয়েছেন ‘গ্রামের নওজোয়ান, হিন্দু–মুসলমান’, ‘আমারে পিরিত কইরাছে বৈরাগিনী’সহ বেশ কয়েকটি গান।
এরপর মঞ্চে আসেন মানিকগঞ্জের প্রবীণ লোকসংগীতশিল্পী সাইদুর রহমান বয়াতি ও তাঁর দলের শিল্পীরা। তাঁরা পরিবেশেন করেন ‘আমার মনন আছে আমার প্রাণন আছে’। এরপর দুপুরের বিরতিতে যায় মঞ্চের কার্যক্রম। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন জোনাকি জ্যোতি।
বিকেলে শিশুদের জন্য আছে ক্রীড়া ও কুইজ প্রতিযোগিতা। সাংস্কৃতিক পর্বে অংশ নেবেন ফজলুর রহমান বাবু। গানে থাকছে ব্যান্ডদল ‘প্রখর’ ও শিল্পী জিনিয়া জাফরিন লুইপা। এ ছাড়া অংশ নেবেন চিত্রনায়িকা প্রার্থনা ফারদিন দীঘি, স্ট্যান্ডআপ কমেডিয়ান শাওন মজুমদার ও ফুড ভ্লগার নুসরাত ইসলাম।
পার্বণ উৎসবে বরাবরের মতো এবারও গ্রামীণ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির আলোকে সাজানো হয়েছে মঞ্চ। মাঠের এক পাশ দিয়ে বসেছে স্টলের সারি। সেখানে পাওয়া যাচ্ছে গ্রামীণ মিষ্টান্ন, মৃৎশিল্প, বাঁশ–বেতের সামগ্রী, উপস্থাপন করা হয়েছে হরেক রকমের ধান, সবজি ও ঔষধি গাছের নমুনা। এ পাশে আছে ইস্পাহানি চায়ের স্টল। সেখান থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে গরম–গরম চা। পার্বণের স্টলে রয়েছে তাদের বিখ্যাত চালের সমাহার।
ইস্পাহানি অ্যাগ্রোর ব্যবস্থাপক আসাদুজ্জামান বলেন, তাঁরা নিজেদের সরবরাহ করা বীজ থেকে তালিকাভুক্ত চাষিদের মাধ্যমে ধান উৎপাদন করেন বলে তাঁদের চালের মান ঠিক থাকে। তাঁদের সুগন্ধি পোলাও চালের মধ্যে আছে দিনাজপুরের ‘চিনিগুঁড়া’, ময়মনসিংহ শেরপুরের ‘কালিজিরা’ ও ‘তুলসীমালা’ চাল। এগুলো ১৭০ থেকে ১৬৫ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়।
আসাদুজ্জামান আরও বলেন, তাঁদের ভাতের চালের মধ্যে রয়েছে দিনাজপুরের ‘কাটারিভোগ’, ‘জিরাশাইল’, ‘নাজিরশাইল’, ‘পাইজাম’, ‘বিআর-২৮’ ও ‘বাংলামতি’। এসব চাল ৫ কেজির প্যাকেটে পাওয়া যায় ৪৫০ থেকে ৪৭৫ টাকায়। এবার অনেক লোকসমাগম হয়েছে। দুপুরে তাঁদের আপ্যায়িত করা হচ্ছে পার্বণ চালের খিচুরি পরিবেশন করে।