তরুণ-তরুণীদের এইচআইভি সংক্রমণ বাড়ছে, কারণ কী
ভোরবেলায় ঘুম ভাঙার পর প্রথম যে কাজটি তিনি করেন, সেটি আর মুঠোফোন দেখা নয়, টেবিলের ওপর রাখা ছোট সাদা বোতল থেকে কয়েকটি ওষুধ খাওয়া। বয়স মাত্র ২৪; কিন্তু প্রতিদিনের এই রুটিন তাঁর জীবনে ঢুকে পড়েছে গত বছরের ডিসেম্বর থেকে। রাজধানীর উত্তর–পূর্ব এলাকার ওই তরুণ এখন নিজের পরিচয় দিতে ভয় পান বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়দের কাছেও। অথচ কয়েক মাস আগেও তিনি ছিলেন পাঁচ বন্ধুর দলের সবচেয়ে প্রাণচঞ্চল সদস্য।
শরীরের ওজন যখন অস্বাভাবিকভাবে কমতে শুরু করল, দুর্বলতা বাড়ল, তখনই সন্দেহ। বন্ধুদের পরামর্শে এইচআইভি (এইডসের ভাইরাস) পরীক্ষা করান। রিপোর্ট পজিটিভ আসে। পরে জানা যায়, বন্ধুদের সঙ্গে ইনজেক্টেবল ড্রাগ নেওয়ার সময় ব্যবহৃত সুচের মাধ্যমেই সংক্রমণ ছড়িয়েছে তাঁর শরীরে।
এখন ওই যুবক রাজধানীর একটি হাসপাতালে নিয়মিত এআরটি (অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপি-এইচআইভি ভাইরাসের চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত ওষুধপত্র) নিচ্ছেন। চিকিৎসা চলছে, শরীর কিছুটা ভালোও; কিন্তু মানসিক চাপ কাটে না। তিনি বলেন, ‘আমি জানতাম না একটা সুচ শেয়ার করা এত বড় ঝুঁকি। জানলে কখনোই করতাম না।’
এ গল্পটি একক নয়; বরং এটি বাংলাদেশে তরুণ বয়সীদের মধ্যে বাড়তে থাকা এইচআইভি সংক্রমণের একটি বাস্তব প্রতিচ্ছবি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জাতীয় এইডস ও এসটিডি নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে (২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত) বাংলাদেশে ১ হাজার ৮৯১ জন এইডস রোগের ভাইরাস এইচআইভিতে সংক্রমিত হয়েছেন। একই সময়ে দেশে এইডসে মারা গেছেন ২১৯ জন।
আরেকটি গল্প
রাজধানীর দক্ষিণ–পূর্ব এলাকায় থাকেন আরেক তরুণ। গত বছরের নভেম্বরে তিনিও জানতে পারেন, তিনি এইচআইভি পজিটিভ। একাধিক সমলিঙ্গীয় সঙ্গীর সঙ্গে যৌন আচরণের মাধ্যমেই সংক্রমিত হয়েছেন বলে চিকিৎসকদের ধারণা।
বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের এআরটি সেন্টার থেকে নিয়মিত চিকিৎসা ও পরামর্শসেবা নিচ্ছেন।
ওই তরুণের কথা, ‘আমাদের নিয়ে কথা বললেই সবাই শুধু নৈতিকতার কথা তোলে; কিন্তু নিরাপত্তার কথা খুব কমই বলে।’
এই দুই তরুণের অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, এইচআইভি এখন আর কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর রোগ নয়। এটি ধীরে ধীরে তরুণ সমাজের ভেতর ঢুকে পড়ছে, অনেক সময় অজান্তেই।
সরকারের হিসাব বলছে, গত বছর (২০২৫) সালে অবিবাহিতদের মধ্যে এইচআইভি শনাক্তের হার ১০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। দিন দিন অবিবাহিত কিশোর বা তরুণদের মধ্যে বাড়ছে এইচআইভি শনাক্তের হার।
জনস্বাস্থ্যবিদ, চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৌতূহল বা যৌনতা নিয়ে ভ্রান্ত ধারণা, অসচেতনতা, সুরক্ষা সামগ্রী সম্পর্কে ধারণা না থাকা ইত্যাদি কারণে তরুণদের মধ্যে এইচআইভির সংক্রমণ বাড়ছে। মারাত্মক এ ব্যাধি সম্পর্কে সচেতনতামূলক ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ, শিক্ষায় যৌনশিক্ষার প্রসার এবং সার্বিকভাবে সচেতনতা বাড়ানোয় এ প্রবণতা কমাতে পারে বলে ধারণা করেন তাঁরা।
পরিসংখ্যানে যে বার্তা
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে নতুন শনাক্ত এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ৪২ শতাংশ অবিবাহিত তরুণ-তরুণী। আগের বছর ২০২৪ সালে এই হার ছিল ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তরুণ বয়সীদের মধ্যে সংক্রমণের হার উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
রাজধানীর বাইরের চিত্রও উদ্বেগজনক। যশোরে ২০২৫ সালে ৫০ জনের বেশি মানুষ এইচআইভিতে আক্রান্ত হয়েছেন। যশোরের সিভিল সার্জন মো. মাসুদ রানা প্রথম আলোকে জানান, আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে স্কুল ও কলেজগামী শিক্ষার্থীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি।
সিভিল সার্জন বলেন, ‘এই বয়সের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতা কম; কিন্তু কৌতূহল অনেক বেশি। সেই কৌতূহল থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ শুরু হয়।’ তিনি জানান, এসব শিক্ষার্থীর মধ্যে সমকামী তরুণের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য।
ঝুঁকি বাড়ছে কেন
জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা বলছেন, তরুণদের মধ্যে এইচআইভি সংক্রমণ বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। সেগুলো হলো ইনজেক্টেবল ড্রাগের ব্যবহার। এতে একই সুচ একাধিকজন ব্যবহার করায় রক্তের মাধ্যমে সংক্রমণ দ্রুত ছড়ায়। আছে ঝুঁকিপূর্ণ যৌন আচরণ। অর্থাৎ কনডম ব্যবহার না করা, একাধিক সঙ্গী কিংবা সঙ্গীর স্বাস্থ্য অবস্থা সম্পর্কে না জানা। যৌন স্বাস্থ্য নিয়ে নীরবতাও এইচআইভি সংক্রমণ বৃদ্ধির পেছনে কাজ করছে বলে মনে করা হচ্ছে। এর কারণ হলো পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌনতা ও যৌন স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা আলোচনা না হওয়া।
জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠান ইউএনএইডসের বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর সায়মা খান প্রথম আলোকে বলেন, অবিবাহিতদের মধ্যে যে সংক্রমণ, তাঁদের বয়স মোটামুটিভাবে ২৫ বছরের মধ্যে ধরে নেওয়া যায়। এই বয়সটাতে অনেকেরই একধরনের রোমাঞ্চ থাকে। তাঁরা জীবনকে উপভোগ করতে চান। এই যে চাওয়া, সেখান থেকেই তাঁরা কোনো কিছু না ভেবেই বেপরোয়া যৌনাচারে লিপ্ত হয়ে পড়েন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তাঁরা এর ঝুঁকির বিষয়টা জানেন না। এই না জানাটা তৈরি হয়েছে অসচেতনতা থেকে। এই যে অল্প বয়সী তরুণদের মধ্যে এইচআইভি ছড়িয়ে যাচ্ছে, এর মূল কারণটাই তো সচেতনতার অভাব।
এইচআইভি শনাক্ত হওয়া ব্যক্তিদের শারীরিক সুস্থতা ও কাউন্সেলিং নিয়ে কাজ করেন একটি এনজিওর প্রতিনিধি রাসেল আহমেদ (ছদ্মনাম)। তিনি বলছিলেন, ‘ অল্প বয়সী ছেলে–মেয়েদের ক্ষতিটা সম্পর্কে অনেক ক্ষেত্রে ধারণা থাকে না। আরেকটি বিষয় হলো—যে সুরক্ষার ব্যবস্থাগুলো নেওয়া হবে, সেসব সম্পর্কে একধরনের সামাজিক ট্যাবু আছে। যেমন কনডম শব্দটা শুনলেই কিন্তু মানুষ আড়ষ্ট হয়ে যায়। এই ট্যাবুগুলো আসলে ভাঙতে হবে এবং বিষয়গুলোকে সম্পর্কে সাধারণ ধারণা থাকতে হবে।
চিকিৎসা আছে, দেরি বিপজ্জনক
এইচআইভি নিরাময়যোগ্য নয়। তবে নিয়মিত ওষুধ নিলে একজন এইচআইভি–আক্রান্ত ব্যক্তি স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন এবং অন্যের মধ্যে সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসে বলে জানান দেশের বিশিষ্ট ভাইরাসবিদ অধ্যাপক নজরুল ইসলাম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এইচআইভি–আক্রান্ত নারী ও পুরুষ নিয়মিত ওষুধ নিলে প্রায় স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।
তবু বাস্তবতা হলো, অনেক তরুণ আক্রান্ত হওয়ার পরও দীর্ঘদিন পরীক্ষা করান না। কেউ কেউ আবার সামাজিক ভয় ও লজ্জার কারণে চিকিৎসা শুরু করতেও দেরি করেন।
বাড্ডার ওই তরুণ বলেন, ‘আমি এখন নিয়মিত ওষুধ নিচ্ছি; কিন্তু চাই, আমার মতো ভুল আর কেউ না করুক।‘
অল্প বয়সে যৌনতার প্রতি ঔৎসুক্য বা কৌতূহল সব সময়ই ছিল ও আছে; কিন্তু এখন এর ভিন্ন ধরনের প্রকাশ দেখা যাচ্ছে বলে মনে করেন সমাজতত্ত্ব ও মনস্তত্ত্ববিদেরা। সমাজের পরিবর্তনগুলো খুব দ্রুত ঘটছে। প্রযুক্তির ব্যাপক বিকাশ এখানে ভূমিকা রাখছে। শিথিল হচ্ছে সামাজিক বন্ধন। নগরে আসছে নতুন নতুন মানুষ দ্রুত বিকশিত নগরায়ণের সঙ্গে। প্রযুক্তির হাত ধরেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। আর এসবই আমাদের মূল্যবোধের ওপর একধরনের প্রভাব ফেলছে বলে মনে করেন মনস্তত্ত্ববিদ অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন আহমেদ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, প্রযুক্তির প্রসারের ফলে এতে অভিগম্যতা বাড়ছে তরুণদের। বলা যায়, অনেকটা বাধাহীন হয়ে গেছে। আবার এই জনগোষ্ঠীর ভেতরে আছে সচেতনতার অভাব, যৌনতা সম্পর্কে সঠিক ধারণারও অভাব।
শিক্ষা ও কার্যক্রমের দিকে দৃষ্টি দরকার
অল্প বয়সী বা তরুণ–তরুণীদের মধ্যে এইচআইভি বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি উদ্বেগের বলে মনে করেন অধ্যাপক নজরুল ইসলাম। তিনি বলছিলেন, এ বয়সটা ঝুঁকিপূর্ণ। এই ঝুঁকি কমাতে স্কুল পর্যায়ে প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ে শিক্ষাদান কতটা হচ্ছে তার দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। এইচআইভি সংক্রমণ রোধে একাধিক প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। সে কাজ কতটা ফলপ্রসূ হচ্ছে, সে ব্যাপারে খোঁজ–খবর ও পর্যবেক্ষণ করার দায়িত্ব সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের।